আদিপর্ব: ২৩। অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শন

একদিন ব্যাস কৃষ্ণ ভীষ্ম বিদুর প্রভৃতির সমক্ষে দ্রোণাচার্য ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, মহারাজ, কুমারদের অস্ত্রাভ্যাস সম্পূর্ণ হয়েছে, আপনি অনুমতি দিলে তাঁরা নিজ নিজ শিক্ষা প্রদর্শন করবেন। ধৃতরাষ্ট্র হৃষ্ট হ'য়ে বললেন, আপনি মহৎ কর্ম সম্পন্ন করেছেন, আমার ইচ্ছা হচ্ছে চক্ষুষ্মান লোকের ন্যায় আমিও কুমারগণের পরাক্রম দেখি।

ধৃতরাষ্ট্রের আজ্ঞায় এবং দ্রোণের নির্দেশ অনুসারে বিদুর সমতল স্থানে বিশাল রঙ্গভূমি নির্মাণ করালেন এবং ঘোষণা ক'রে সাধারণকে জানিয়ে শুভ তিথিনক্ষত্রযোগে দেবপূজা করলেন। নির্দিষ্ট দিনে ভীষ্ম ও কৃপাচার্যকে অগ্রবর্তী ক'রে ধৃতরাষ্ট্র সুসজ্জিত প্রেক্ষাগারে এলেন। গান্ধারী কুন্তী প্রভৃতি রাজপুরনারীগণ উত্তম পরিচ্ছদে ভূষিত হ'য়ে মঞ্চে গিয়ে বসলেন। নানা দেশ থেকে আগত দর্শকদের কোলাহলে ও বাদ্যধ্বনিতে সেই সভা মহাসমুদ্রের ন্যায় ক্ষুব্ধ হ'ল।

অনন্তর শুক্লকেশ দ্রোণাচার্য্য শুক্ল বসন ও মাল্য ধারণ ক'রে পুত্র অশ্বত্থামার সঙ্গে রঙ্গভূমিতে এলেন এবং মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণদের দিয়ে মঙ্গলাচরণ করালেন। দ্রোণ ও কৃপকে ধৃতরাষ্ট্র সুবর্ণরত্নাদি দক্ষিণা দিলেন। তার পর কুমারগণ রঙ্গভূমিতে অশ্ব চালনার, বাহুযুদ্ধের এবং খড়্গ-চর্ম (১) প্রয়োগের বিবিধ প্রণালী দেখালেন। তার পর পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষদৃপ্ত দুর্যোধন ও ভীম গদাহস্তে এসে মত্ত হস্তীর ন্যায় সগর্জনে পরস্পরের সম্মুখীন হলেন। কুমারগণ রঙ্গভূমিতে কি করছেন তার বিবরণ বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে এবং কুন্তী গান্ধারীকে জানাতে লাগলেন। দর্শকদের একদল ভীমের এবং আর একদল দুর্যোধনের পক্ষপাতী হওয়ায় জনমণ্ডলী যেন দ্বিধাভক্ত হয়ে গেল, সভায় কুরুরাজের জয়, ভীমের জয়, এইরূপ কোলাহল উঠল। তখন দ্রোণ তাঁর পুত্র অশ্বত্থামাকে বললেন, তুমি ওই দুই মহাবীরকে নিবারণ কর, যেন রঙ্গস্থলে ক্রোধের উৎপত্তি না হয়। অশ্বত্থামা গদাযুদ্ধে উদ্যত ভীম আর দুর্যোধনকে নিরস্ত করলেন।

মেঘমন্দ্রতুল্য বাদ্যধ্বনি থামিয়ে দিয়ে দ্রোণ বললেন, যিনি আমার পুত্রের চেয়ে প্রিয়, সর্ব্বশাস্ত্রবিশারদ, উপেন্দ্রতুল্য, সেই অর্জ্জুনের শিক্ষা আপনারা দেখুন। দর্শকগণ উৎসুক হ'য়ে অর্জ্জুনের নানাপ্রকার প্রশংসা করতে লাগল। ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন, ক্ষুব্ধ সমুদ্রের ন্যায় হঠাৎ এই মহাশব্দ হচ্ছে কেন? বিদুর বললেন, পাণ্ডুনন্দন অর্জ্জুন অবতীর্ণ হয়েছেন। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, কুন্তীর তিন পুত্রের গৌরবে আমি ধন্য হয়েছি, অনুগৃহীত হয়েছি, রক্ষিত হয়েছি। অর্জ্জুন আগ্নেয় বারুণ বায়ব্য প্রভৃতি বিবিধ অস্ত্রের প্রয়োগ দেখালেন। তার পর একটি ঘূর্ণমান লৌহবরাহের মুখে এককালে পাঁচটি বাণ নিক্ষেপ করলেন, বৃষভশৃঙ্গের ভেতরে একুশটি বাণ প্রविष्ट করলেন, খড়্গ আর গদা হস্তে বিবিধ কৌশল দেখালেন।

অর্জ্জুনের কৌশলপ্রদর্শন শেষ হয়ে এসেছে এবং বাদ্যরবও মন্দীভূত হয়েছে এমন সময় দ্বারদেশে সহসা বজ্রধ্বনির ন্যায় বাহাস্ফোট (তাল ঠোকার শব্দ) শোনা গেল। দ্বারপালরা পথ ছেড়ে দিলে কবচকুন্ডলশোভিত মহাবিক্রমশালী কর্ণ পাদচারী পর্বতের ন্যায় রণভূমিতে এলেন এবং অধিক সম্মান না দেখিয়ে দ্রোণ ও কৃপকে প্রণাম করলেন। অর্জ্জুন যে তাঁর ভ্রাতা তা না জেনে কর্ণ বললেন, পার্থ, তুমি যা দেখিয়েছ তার সবই আমি দেখাব। এই ব’লে তিনি দ্রোণের অনুমতি নিয়ে অর্জ্জুন যা যা করেছিলেন তাই ক’রে দেখালেন। দুৰ্যোধন আনন্দিত হয়ে কর্ণকে আলিঙ্গন ক’রে বললেন, মহাবাহু, তোমাকে স্বাগত জানাচ্ছি, তুমি এই কুরুরাজ্য ইচ্ছামত ভোগ কর। কর্ণ বললেন, আমি তোমার সখা চাই, আর অর্জ্জুনের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করতে চাই। দুৰ্যোধন বললেন, তুমি সখা হয়ে আমার সঙ্গে সমস্ত ভোগ কর আর শত্রুদের মাথায় পা রাখ।

অর্জ্জুন নিজেকে অপমানিত জ্ঞান ক’রে বললেন, কর্ণ, যারা অনাহূত হয়ে আসে আর অনাহূত হয়ে কথা বলে, তারা যে নরকে যায় আমি তোমাকে সেখানে পাঠাব। কর্ণ বললেন, এই রঙ্গভূমিতে সকলেরই আসবার অধিকার আছে। দুৰ্ব্বলের ন্যায় আমার নিন্দা করছ কেন, যা বলবার শর দিয়েই বল। আজ গুরুর সমক্ষেই শরাঘাতে তোমার শিরচ্ছেদ করব। তার পর দ্রোণের অনুমতি নিয়ে অর্জ্জুন তাঁর ভ্রাতাদের সঙ্গে কর্ণের সম্মুখীন হলেন, দুৰ্যোধন ও তাঁর ভ্রাতারা কর্ণের পক্ষে গেলেন। ইন্দ্র ও সূর্য্য নিজ নিজ পুত্রকে দেখতে এলেন, অর্জ্জুনের উপর মেঘের ছায়া এবং কর্ণের উপর সূর্য্যের কিরণ পড়ল। দ্রোণ কৃপ ও ভীষ্ম অর্জ্জুনের কাছে গেলেন। রঙ্গভূমি দুই পক্ষে বিভক্ত হওয়ায় স্ত্রীলোকদের মধ্যেও বৈরভাব উৎপন্ন হ’ল।

কর্ণকে চিনতে পেরে কুন্তী মূর্ছিত হলেন, বিদুরের আজ্ঞায় দাসীরা চন্দন-জল সেচন ক’রে তাঁকে প্রবুদ্ধ করলে। দুই পুত্রকে সশস্ত্র দেখে কুন্তী বিভ্রান্ত হয়ে গেলেন। এই সময়ে কৃপাচার্য্য কর্ণকে বললেন, এই অর্জ্জুন কুরুবংশজাত, পাণ্ডু ও কুন্তীর পুত্র, ইনি তোমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করবেন। মহাবাহু কর্ণ, তুমি তোমার মাতা পিতার কুল বল, কোন্ রাজবংশের তুমি ভূষণ? তোমার পরিচয় পেলে অর্জ্জুন যুদ্ধ করা বা না করা স্থির করবেন; রাজপুত্রেরা তুচ্ছকুলশীল প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে যুদ্ধ করেন না। কৃপের কথায় কর্ণ বর্ষাজলসিক্ত পদ্মের ন্যায় লজ্জায় মস্তক নত করলেন। দুৰ্যোধন বললেন, আচার্য্য, অর্জ্জুন যদি রাজা ভিন্ন অন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে না চান তবে আমি কর্ণকে অঙ্গরাজ্যে অভিষিক্ত করছি।

দুর্যোধন তখনই কর্ণকে স্বর্ণময় পীঠে বসালেন, মন্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ লাজ পুষ্প স্বর্ণ- ঘটের জল প্রভৃতি উপকরণে তাঁকে অভিষিক্ত করলেন।

এমন সময় কর্ণের পালকপিতা অধিরথ ঘর্মাক্ত ও কম্পিত দেহে যষ্টিহস্তে প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে কর্ণ ধনু ত্যাগ করে নতমস্তকে প্রণাম করলেন, অধিরথ সসম্ভ্রমে তাঁর চরণ আবৃত (১) ক'রে পুত্রকে সস্নেহে আলিঙ্গন এবং তাঁর মস্তক অশ্রুজলে অভিষিক্ত করলেন। ভীম সহাস্যে বললেন, সূতপুত্র, তুমি অর্জুনের হাতে মরবার যোগ্য নও, তুমি কশা হাতে নিয়ে কুলধর্ম পালন কর। কুকুর যজ্ঞের পুরোডাশ খেতে পারে না, তুমিও অঙ্গরাজ্য ভোগ করতে পার না। ক্রোধে কর্ণের ওষ্ঠ কাঁপতে লাগল। দুর্যোধন বললেন, ভীম, এমন কথা বলা তোমার উচিত হয় নি। দ্রোণাচার্য কলস থেকে এবং কৃপাচার্য শরস্তম্ভ থেকে জন্মেছিলেন, আর তোমাদের জন্ম-বৃত্তান্তও আমার জানা আছে। কবচকুন্তলধারী সর্বলক্ষণযুক্ত কর্ণ নীচ বংশে জন্মাতে পারেন না। কেবল অঙ্গরাজ্য নয়, সমস্ত পৃথিবীই ইনি ভোগ করবার যোগ্য। যারা অন্যরূপ মনে করে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হ'ক।

(১) কর্ণ উচ্চজাতীয় এই সম্ভাবনায়।

এই সময়ে সূর্যাস্ত হ'ল। দুর্যোধন কর্ণের হাত ধরে রঙ্গভূমি থেকে প্রস্থান করলেন। পাণ্ডবগণ, দ্রোণ, কৃপ, ভীষ্ম প্রভৃতিও নিজ নিজ ভবনে চ'লে গেলেন। কর্ণ অঙ্গরাজ্য পেলেন দেখে কুন্তী আনন্দিত হলেন। যুধিষ্ঠিরের এই বিশ্বাস হ'ল যে কর্ণের তুল্য ধনুর্ধর পৃথিবীতে নেই।