ভূমিকা
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের মহাভারত প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের বৃহত্তম গ্রন্থ এবং জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের অন্যতম। প্রচুর আগ্রহ থাকলেও এই বিশাল গ্রন্থ বা তার অনুবাদ আদ্যোপান্ত পড়া সাধারণ লোকের পক্ষে কষ্টসাধ্য। যাঁরা অনুসন্ধিৎসু, তাঁদের দৃষ্টিতে সমগ্র মহাভারতই পুরাবৃত্ত ঐতিহ্য ও প্রাচীন সংস্কৃতির অমূল্য ভাণ্ডার, এর কোনও অংশই উপেক্ষণীয় নয়। কিন্তু সাধারণ পাঠক মহাভারতের আখ্যানভাগই প্রধানত পড়তে চান, আনুষঙ্গিক বহু সন্দর্ভ তাঁদের পক্ষে নীরস ও বাধাস্বরূপ।
এই পুস্তক ব্যাসকৃত মহাভারতের সারাংশের অনুবাদ। এতে মূল গ্রন্থের সমগ্র আখ্যান এবং প্রায় সমস্ত উপাখ্যান আছে, কেবল সাধারণ পাঠকের যা মনোরঞ্জক নয় সেই সকল অংশ সংক্ষেপে দেওয়া হয়েছে, যেমন বিস্তারিত বংশতালিকা, যুদ্ধবিগ্রহের বাহুল্য, রাজনীতি ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিষয়ক প্রসঙ্গ, দেবতাদের স্তুতি, এবং পুনরুক্ত বিষয়। স্থলবিশেষে নিতান্ত নীরস অংশ পরিত্যক্ত হয়েছে। এই সারাংশবাদের উদ্দেশ্য — মূল রচনার ধারা ও বৈশিষ্ট্য যথাসম্ভব বজায় রেখে সমগ্র মহাভারতকে উপন্যাসের ন্যায় সুখপাঠ্য করা।
মহাভারতকে সংহিতা অর্থাৎ সংগ্রহগ্রন্থ এবং পঞ্চম বেদ স্বরূপ ধর্মগ্রন্থ বলা হয়। যেসব খণ্ড খণ্ড আখ্যান ও ঐতিহ্য পুরাকালে প্রচলিত ছিল তাই সংগ্রহ করে মহাভারত সংকলিত হয়েছে। এতে ভগবদ্গীতা প্রভৃতি যেসব দার্শনিক সন্দর্ভ আছে তা অধ্যাত্মবিদ্যার্থীর অধ্যয়নের বিষয়। প্রত্নান্বেষীর কাছে মহাভারত অতি প্রাচীন সমাজ ও নীতি বিষয়ক তথ্যের অনন্ত ভান্ডার। ভূগোল জীবতত্ত্ব পরলোক প্রভৃতি সম্বন্ধে প্রাচীন ধারণা কি ছিল তাও এই গ্রন্থ থেকে জানা যায়। প্রচুর কাব্যরস থাকলেও মহাভারতকে মহাকাব্য বলা হয় না, ইতিহাস নামেই এই গ্রন্থ প্রসিদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন — 'ইহা কোনও ব্যক্তিবিশেষের রচিত ইতিহাস নহে, ইহা একটি জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস।'
মহাভারতে সত্য ঘটনার বিবরণ কতটা আছে, কুরুপাণ্ডবযুদ্ধ মূলত কুরুপাঞ্চালযুদ্ধ কিনা, পাণ্ডু albino ছিলেন কিনা, কুন্তীর বহুদেবভজনা এবং একই কন্যার সহিত পঞ্চ পাণ্ডব ভ্রাতার বিবাহ কোনও বহুবর্তৃক (polyandrous) জাতির সূচনা করে কিনা, যুধিষ্ঠিরাদির পিতামহ কৃষ্ণদ্বৈপায়নই আদি মহাভারতের রচয়িতা কিনা, ইত্যাদি আলোচনা এই ভূমিকার অধিকারবহির্ভূত। মহাভারতে আছে, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস এই গ্রন্থের রচয়িতা; তিনি তাঁর পৌত্রন প্রপৌত্র জনমেজজয়ের সর্পযজ্ঞে উপস্থিত ছিলেন এবং নিজের শিষ্য বৈশম্পায়নকে মহাভারত পাঠের আদেশ দেন। শাস্ত্রবিশ্বাসী প্রাচীনপন্থী পণ্ডিতগণের মতে কুরুক্ষেএযুদ্ধের কাল খ্রী-পূ ৩০০০ অব্দের কাছাকাছি, এবং তার কিছুকাল পরে মহাভারত রচিত হয়। ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের মতে আদিগ্রন্থের রচনাকাল খ্রী-পূ চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে, খ্রীষ্টজন্মের পরেও তাতে অনেক অংশ যোজিত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের মতে কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের কাল খ্রী-পূ ১৫০০ বা ১৪৩০, তিলক ও অধিকাংশ আধুনিক পণ্ডিতগণের মতে প্রায় ১৪০০। ‘কৃষ্ণচরিত্র’ গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, ‘যুদ্ধের অনতি পরেই আদি মহাভারত প্রণীত হইয়াছিল বলিয়া যে প্রসিদ্ধি আছে তাহার উচ্ছেদ করিবার কোনও কারণ দেখা যায় না।’ বর্তমান মহাভারতের সমস্তটা এক কালে রচিত না হলেও এবং তাতে বহু লোকের হাত থাকলেও সমগ্র রচনাই এখন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসের নামে চলে।
মহাভারতকথা স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক ব্যাপারের বিচিত্র সংমিশ্রণ। পড়তে পড়তে মনে হয় আমরা এক অদ্ভুত স্বপ্নদৃষ্ট লোকে উপস্থিত হয়েছি। সেখানে দেবতা আর মানুষের মধ্যে অবাধে মেলামেশা চলে, ঋষিরা কয়েক হাজার বৎসর তপস্যা করেন এবং মাঝে মাঝে অপ্সরার পাল্লায় প’ড়ে নাকাল হন; তাঁদের তুলনায় মানবেতর মেঘগুলো আলপায়ু শিশুমাত্র। যজ্ঞ করাই রাজাদের সব চেয়ে বড় কাজ। বিখ্যাত বীরগণ যেসকল অস্ত্র নিয়ে লড়েন তার কাছে আধুনিক অস্ত্র তুচ্ছ। লোকে কথায় কথায় শাপ দেয়, সে শাপ ইচ্ছা করলেও প্রত্যাহার করা যায় না; আশীর্বাদে অসঙ্কোচে তাদের কামনা ব্যক্ত করে। পুণ্যের এতই প্রয়োজন যে ক্ষেত্রবিশেষে পড়ে পেলেও লোকে কৃতার্থ হয়। কিছুই অসম্ভব গণ্য হয় না; গরুড় গজকচ্ছপ খান, এমন সরোবর আছে যাতে অবগাহন করলে পুরুষ স্ত্রী হয়ে যায়; কুরুক্ষেত্রের জন্য নারীগর্ভ অনাবশ্যক, মাছের পেট, শরৈর ঝোপ বা কলসীতেও সন্তানের জন্ম হয়।
সৌভাগ্যের বিষয়, অতিপ্রাচীন ইতিহাস ও রূপকথার সংযোগে উৎপন্ন এই পরিবেশে আমরা যে নরনারীর সাক্ষাৎ পাই তাদের দোষগুণ সুখদুঃখ আমাদেরই সমান। মহাভারতে যে মধ্য অংশ, কুরুপাণ্ডবীয় আখ্যান, তার মনোহাবিতা ও প্রাকৃত ব্যাপারের চাপে নষ্ট হয় নি। স্বাভাবিক মানবচরিত্রের ঘাতপ্রতিঘাত, নানা স্তর ঘটনাসংস্থান, সরলতা ও চক্রান্ত, করুণা ও নিষ্ঠুরতা, ক্ষমা ও প্রতিহিংসা, মহত্ত্ব ও নীচতা, নিষ্কাম কর্ম ও ভোগের আকাঙ্ক্ষা, সবই প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়; আজকাল যাকে ‘মনস্তত্ত্ব’ বলা হয়, অর্থাৎ গল্পবর্ণিত নরনারীর আচরণের আকস্মিকতা এবং জটিল প্রণয়ব্যাপার, তারও অভাব নেই। অতিপ্রাচীন ব্যাস ঋষি যেকোনও অর্বাচীন গল্পকারকে এই বিদ্যায় পরাস্ত করতে পারেন।
জীবন্ত মানুষের চরিত্রে যত জটিলতা আর অসঙ্গতি দেখা যায় গল্পবর্ণিত চরিত্রে ততটা দেখালে চলে না। নিপুণ রচয়িতা যখন বিরুদ্ধ গুণাবলীর সমাবেশ করেন তখন তাঁকে সাবধান হ'তে হয় যেন পাঠকের কাছে তা নিতান্ত অসম্ভব না ঠেকে। বাস্তব মানবচরিত্র যত বিপরীতধর্মী, কল্পিত মানবচরিত্র ততটা হ'তে পারে না, বেশী টানাটানি করলে রসভঙ্গ হয়, কারণ, পাঠকসাধারণের প্রত্যয়ের একটা সীমা আছে। প্রাচীন কথাকারগণ এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। মহাকাব্যের লেখকরা বরং অতিরিক্ত সরলতার দিকে গেছেন, তাঁদের অধিকাংশ নায়ক-নায়িকা ছাঁচে ঢালা পালিশ করা প্রাণী, তাঁদের চরিত্রে কোথাও খোঁচ বা আঁচড় নেই। রঘুবংশের দিলীপ রঘু অজ প্রভৃতি একই আদর্শে কল্পিত। মহাভারত অতি প্রাচীন গ্রন্থ, কিন্তু এতে বহু চরিত্রের যে বৈচিত্র্য দেখা যায় পরবর্তী ভারতীয় সাহিত্যে তা দুর্লভ। অবশ্য এ কথা বলা যায় না যে মহাভারতে গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক চরিত্রের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ আছে। মহাভারত সংহিতা গ্রন্থ, এতে বহু রচয়িতার হাত আছে এবং একই ঘটনার বিভিন্ন কিংবদন্তী গ্রথিত হয়েছে। মূল আখ্যান সম্ভবত একজনেরই রচনা, কিন্তু পরে বহু লেখক তাতে যোগ করেছেন। এমন আশা করা যায় না যে তাঁরা প্রত্যেকে সতর্ক হয়ে একটি পূর্বনির্ধারিত বিরাট পরিকল্পনার বিভিন্ন অংশ গড়বেন, মূল প্ল্যান থেকে কোথাও বিচ্যুত হবেন না। মহাভারত তাজমহল নয়, বারোয়ারী উপন্যাসও নয়।
সকল দেশেই কুম্ভীলক বা plagiarist আছেন যাঁরা পরের রচনা চুরি ক'রে নিজের নামে চালান। কিন্তু ভারতবর্ষে কুম্ভীলকের বিপরীতই বেশী দেখা যায়। এঁরা কবিযশঃপ্রার্থী নন, বিখ্যাত প্রাচীন গ্রন্থের মধ্যে নিজের রচনা গুঁজে দিয়েই কৃতার্থ হন। এইপ্রকার বহু রচয়িতা ব্যাসের সহিত একাত্মা হবার ইচ্ছায় মহাভারতসমুদ্রে তাঁদের ভাল মন্দ অর্ঘ্য প্রক্ষেপ করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র যাকে মহাভারতের বিভিন্ন স্তর বলেছেন তা এইভাবে উৎপন্ন হয়েছে। কেউ কেউ কৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব পাকা করবার জন্য স্থানে স্থানে তাঁকে দিয়ে অনর্থক অলৌকিক লীলা দেখিয়েছেন, কিম্বা কুটিল বা বালকোচিত অপকর্ম করিয়াছেন। কেউ সুবিধা পেলেই মহাদেবের মহিমা কীর্তন ক'রে তাঁকে কৃষ্ণের উপরে স্থান দিয়েছেন; কেউ বা গো-ব্রাহ্মণের মাহাত্ম্য, ব্রত-উপবাসাদির ফল বা স্ত্রীজাতির কুৎসা প্রচার করেছেন, কেউ বা আষাঢ়ে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র উত্তপ্ত হয়ে 'কৃষ্ণচরিত্র' গ্রন্থে লিখেছেন, 'এ ছাই ভস্ম মাথামুণ্ডের সমালোচনা বিড়ম্বনা মাত্র। তবে এ হতভাগ্য দেশের লোকের বিশ্বাস যে যাহা কিছু পুঁথির ভিতর পাওয়া যায় তাহাই ঋষিবাক্য, অভ্রান্ত, শিরোধার্য। কাজেই এ বিড়ম্বনা আমাকে স্বীকার করিতে হইয়াছে।'
বঙ্কিমচন্দ্র কৃষ্ণচরিত্রের জন্য তথ্য খুঁজেছিলেন তাই তাঁকে বিড়ম্বনা স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু যিনি কথাগ্রন্থ হিসেবেই মহাভারত পড়বেন তাঁর ধৈর্যচ্যুতি হবার কারণ নেই। তিনি প্রথমেই মেনে নেবেন যে এই গ্রন্থে বহু লোকের হাত আছে, তার ফলে উত্তম মধ্যম ও অধম রচনা মিশে গেছে, এবং সবই একসঙ্গে পড়তে হবে। কিন্তু জঞ্জাল যতই থাকুক, মহাভারতের মহত্ত্ব উপলব্ধি করতে কোনও বাধা হয় না। সহৃদয় পাঠক এই জগৎবিখ্যাত প্রাচীন গ্রন্থের আখ্যানভাগ সমস্তই সাগ্রহে পড়তে পারবেন। তিনি এর শ্রেষ্ঠ প্রসঙ্গসমূহ মুগ্ধচিত্তে উপভোগ করবেন এবং রুচিচ্যুত বা উৎকট যা পাবেন তা সকৌতুক উপেক্ষা করবেন।
মহাভারতে যে ঘটনাগত অসংগতি দেখা যায় তার কারণ — বিভিন্ন কিংবদন্তীর যোজনা। চরিত্রগত অসংগতির একটি কারণ — বহু রচয়িতার হস্তক্ষেপ, অন্য কারণ — প্রাচীন ও আধুনিক আদর্শের পার্থক্য। সেকালের আদর্শ এবং ন্যায়-অন্যায়ের বিচারপদ্ধতি সকল ক্ষেত্রে একালের সমান বা আমাদের বোধগম্য হ'তে পারে না। মহামতি দ্রোণাচার্য একলব্যকে তার আঙুল কেটে দক্ষিণা দিতে বললেন, অর্জুনও তাতে খুশী। জতুগৃহ থেকে পালাবার সময় পাণ্ডবরা বিনা দ্বিধায় এক নিষাদী ও তার পাঁচ পুত্রকে পুড়ে মরতে দিলেন। দুঃশাসন যখন চুল ধ'রে দ্রৌপদীকে দ্যুতসভায় টেনে নিয়ে এল তখন দ্রৌপদী আকুল হয়ে বললেন, 'ভীষ্ম দ্রোণ বিদুর আর রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কি প্রাণ নেই? কুরুবৃদ্ধগণ এই দারুণ অধর্ম কি দেখতে পাচ্ছেন না?' দ্রৌপদী বহুবার প্রশ্ন করলেন, 'আমি ধর্মানুসারে বিজিত হয়েছি কি না আপনারা বলুন।' ভীষ্ম বললেন, 'ধর্মের তত্ত্ব অতি সূক্ষ্ম, আমি তোমার প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে পারছি না।' বীরশ্রেষ্ঠ শিভলারস কর্ণ অম্লানবদনে দুঃশাসনকে বললেন, 'পাণ্ডবদের আর দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ কর।' মহাপ্ৰাজ্ঞ ভীষ্ম আর মহাতেজস্বী দ্রোণ চুপ ক'রে ব'সে ধর্মের সূক্ষ্ম তত্ত্ব ভাবতে লাগলেন। ভীষ্ম-দ্রোণ দুর্যোধনাদির অন্নদাস এবং কৌরবদের হিতসাধনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, কিন্তু দুর্যোধনের উৎকট দুষ্কর্ম সত্ত্বেও কি তাঁরা বাধ্য ছিলেন? তাঁদের কি স্বতন্ত্র হয়ে কিম্বা যুদ্ধে কোনও পক্ষে যোগ না দিয়ে থাকবার উপায় ছিল না? এ প্রশ্নের আমরা বিশদ উত্তর পাই না। যুদ্ধারম্ভের পূর্বক্ষণে যখন যুধিষ্ঠির ভীষ্মের পাদস্পর্শ ক'রে আশীর্বাদ ভিক্ষা করলেন তখন ভীষ্ম এই ব'লে আত্মগ্লানি জানালেন — 'কৌরবগণ অর্থ দিয়ে আমাকে বেঁধে রেখেছে, তাই ক্লীবের ন্যায় তোমাকে বলছি, আমি পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করতে পারি না।' দ্রোণ ও কৃপও অনুরূপ বাক্য বলেছেন। এদের মর্যাদাবুদ্ধি বা code of honour আমাদের পক্ষে বোঝা কঠিন। এঁরা পাণ্ডবদের প্রতি পক্ষপাত গোপন করেন না, অথচ যুদ্ধকালে পাণ্ডবদের বহু নিকট আত্মীয় ও বন্ধুকে অসঙ্কোচে বধ করেছেন।
ভাগ্যক্রমে মহাভারতে চরিত্রগত অসংগতি খুব বেশী নেই। অধিকাংশ স্থলে মহাভারতীয় নরনারী স্বাভাবিক রূপেই চিত্রিত হয়েছে, তাদের আচরণ আমাদের অবোধ্য নয়। যেটুকু জটিলতা পাওয়া যায় তাতে আমাদের আগ্রহ ও কৌতূহল বেড়ে ওঠে, আমরা যেন জীবন্ত মানুষকে চোখের সামনে দেখতে পাই। মূল আখ্যানের ব্যাস শান্তনু ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী কুন্তী বিদুর দ্রোণ অশ্বত্থামা পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদী দুর্যোধন কর্ণ শকুনি কৃষ্ণ সত্যভামা বলরাম শিশুপাল শল্য অম্বা-শিখণ্ডী প্রভৃতি, এবং উপাখ্যানবর্ণিত কচ দেবযানী শর্মিষ্ঠা বিদুলা নল দময়ন্তী ঋষ্যশৃঙ্গ সাবিত্রী প্রভৃতি, প্রত্যেকেরই বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে কেবল কয়েকজনের সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা করছি। —
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস বিচিত্রবীর্য্যের বৈমাত্র ভ্রাতা, তাঁকে আমরা শান্তনু থেকে আরম্ভ ক'রে জনমেজয় পর্য্যন্ত সাতপুরুষের সমকালবর্ত্তী রূপে দেখতে পাই। ইনি মহাজ্ঞানী সিদ্ধপুরুষ, কিন্তু সদৃশ মোটেই নন। শাশুড়ী সত্যবতীর অনুরোধে অম্বিকা ও অম্বালিকা অত্যন্ত বিতৃষ্ণায় ব্যাসের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন; অম্বিকা চোখ বুজে ভীষ্মাদিকে ভেবেছিলেন, অম্বালিকা ভয়ে পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। ব্যাস ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডু-বিদুরের জন্মদাতা, কিন্তু প্রাচীন রীতি অনুসারে অপরের ক্ষেত্রে উৎপাদিত এই সন্তানদের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। উদাসীন হলেও তিনি কুরুপাণ্ডবের হিতকামী, deus ex machina-র ন্যায় মাঝে মাঝে আবির্ভূত হয়ে সংকটমোচন এবং সমস্যার সমাধান করেন।
ভীষ্মচরিত্রের মহত্ত্ব আমাদের অভিভূত করে। তিনি দ্যুতসভায় দ্রৌপদীকে রক্ষা করেন নি — এ আমরা ভুলতে পারি না; কিন্তু অনুমান করতে পারি যে তৎকালে তাঁর নিশ্চেষ্টতা, যুদ্ধে দুর্য্যোধনের পক্ষে যোগদান, এবং পরিশেষে পাণ্ডবদের হিতার্থে মৃত্যু বরণ — এই সমস্তের কারণ তাঁর প্রাচীন আদর্শ অনুযায়ী কর্ত্তব্যবুদ্ধি। তিনি তাঁর কামকে পিতার জন্য কুরুরাজ্যের উত্তরাধিকার ত্যাগ করলেন, চিরকুমারব্রত নিয়ে দুই অপদার্থ বৈমাত্র ভ্রাতা চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য্যের অভিভাবক হলেন, এবং আজীবন নিষ্কামভাবে ভ্রাতার বংশধরদের সেবা করলেন। তাঁর পিতৃ- ভক্তিতে আমরা চমৎকৃত হই, কিন্তু আমাদের খেদ থাকে যে অনুপযুক্ত কারণে তিনি এই অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ভীষ্ম তাঁর ভ্রাতার জন্য ক্ষত্রিয় রীতি অনুসারে কাশীরাজের তিন কন্যাকে স্বয়ংবরসভা থেকে হরণ করেছিলেন, কিন্তু জ্যেষ্ঠা অম্বা শাল্বরাজের অনুরাগিণী জেনে তাঁকে সসম্মানে শাল্বের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। অভাগিনী অম্বা সেখানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সংকল্প করলেন যে ভীষ্মের বধসাধন করবেন। অম্বার এই ভীষণ আক্রোশের উপযুক্ত কারণ আমরা খুঁজে পাই না। উদ্যোগপর্বে আছে, পরশুরাম ভীষ্মকে বলেছিলেন, ‘তুমি একে গ্রহণ ক'রে বংশরক্ষা কর।’ ভীষ্ম সম্মত হন নি। অম্বার মনে কি ভীষ্মের প্রতি প্রচ্ছন্ন অনুরাগ জন্মেছিল? ভীষ্ম-অম্বার প্রণয় কল্পনা ক'রে বাংলায় একাধিক নাটক রচিত হয়েছে।
দ্রোণ দ্রুপদের বাল্যসখা, কিন্তু পরে অপমানিত হওয়ায় দ্রুপদের উপর তাঁর ক্রোধ হয়েছিল। কুরুপাণ্ডব রাজকুমারদের সাহায্যে দ্রুপদকে পরাস্ত ক'রে দ্রোণ পাঞ্চালরাজ্যের কতক অংশ কেড়ে নিয়েছিলেন। তার পরে দ্রুপদের উপর তাঁর আর ক্রোধ ছিল না, কিন্তু দ্রুপদ প্রতিশোধের জন্য উদ্যোগী হলেন। উদারস্বভাব দ্রোণ তা জেনেও দ্রুপদপুত্র ধৃষ্টদ্যুম্ন ও শিখণ্ডীকে অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্র- যুদ্ধে দ্রোণের হস্তেই দ্রুপদের মৃত্যু হ'ল, ধৃষ্টদ্যুম্নও পিতৃহন্তার শিরচ্ছেদ করলেন। কৌরবপক্ষে থাকলেও দ্রোণ অর্জুনের প্রতি তাঁর পক্ষপাত গোপন করেন নি, এজন্য তাঁকে দুর্যোধনের বহু কটু-বাক্য শুনতে হয়েছে।
ধৃতরাষ্ট্র অবাবস্থিতচিত্ত, তাঁর নীচতা আছে উদারতাও আছে, দুর্যোধন তাঁকে সম্মোহিত ক'রে রেখেছিলেন। দ্যূতসভায় বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছেন, 'মহারাজ, দুর্যোধনের জয়ে আপনার খুব আনন্দ হচ্ছে, কিন্তু এ থেকেই যুদ্ধ আর লোকক্ষয় হবে। ধর্মের প্রতি আপনার আকর্ষণ আছে এবং তার জন্য আপনি মন্ত্রণা করেছেন তা আমি জানি।' এই অস্থিরমতি হতভাগ্য অন্ধ বৃদ্ধের ধর্মবুদ্ধি মাঝে মাঝে জেগে ওঠে, তখন তিনি দুর্যোধনকে ধমক দেন। সংকটে পড়লে তিনি বিদুরের কাছে মন্ত্রণা চান, কিন্তু স্বার্থত্যাগ করতে হবে শুনলেই চ'টে ওঠেন। ধৃতরাষ্ট্রের আন্তরিক ইচ্ছা যুদ্ধ না হয় এবং দুর্যোধন যা অন্যায় উপায়ে দখল করেছেন তা বজায় থাকে। কৃষ্ণ যখন পাণ্ডবদূত হয়ে হস্তিনাপুরে আসেন তখন ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে ঘুষ দিয়ে বশে আনবার ইচ্ছা করেছিলেন। দারুণ শোক পেয়ে শেষ দশায় তাঁর স্বভাব পরিবর্তিত হ'ল, যুধিষ্ঠিরকে তিনি পুত্রতুল্য জ্ঞান করলেন। আশ্রমবাসিক- পর্বে বনগমনের পূর্বে প্রজাদের নিকট বিদায় নেবার সময় ধৃতরাষ্ট্র যা বলেছেন তা সদাশয়তার পরিচায়ক।
গান্ধারী মনস্বিনী, তিনি পুত্রের দুর্বৃত্ততা ও স্বামীর দুর্বলতা দেখে শঙ্কিত হন, ভর্ৎসনা করেন, কিন্তু প্রতিকার করতে পারেন না। শতপুত্রের মৃত্যুর পর কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের উপর তাঁর অতি স্বাভাবিক বিদ্বেষ হয়েছিল, কিন্তু তা দীর্ঘকাল রইল না। পরিশেষে তিনিও পাণ্ডবগণকে পুত্রতুল্য জ্ঞান করলেন।
কুন্তী দৃঢ়চরিত্রা তেজস্বিনী বীরনারী, দ্রৌপদীর যোগ্য শাশুড়ী। তিনি যখনই মনে করেছেন যে পুত্রেরা নিরূদ্যম হয়ে আছে তখনই শাণিত বাক্যে তাঁদের উৎসাহিত করেছেন। উদ্যোগপর্বে কুন্তী যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন, 'পুত্র, তুমি মন্দমতি, শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণের ন্যায় কেবল শাস্ত্র আলোচনা ক'রে তোমার বুদ্ধি বিকৃত হয়েছে, তুমি কেবল ধর্মেরই চিন্তা করেছ।'
যুধিষ্ঠির অর্জুনের তুল্য কীর্তিমান নন, কিন্তু তিনিই মহাভারতের নায়ক ও কেন্দ্রস্থ পুরুষ। তাঁকে নির্বোধ বললে অবিচার হবে, কিন্তু অতিপ্রয়তা উদারতা ও ধর্মভীরুতার জন্য সময়ে সময়ে তিনি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সাধারণত তাঁর ক্রোধ অল্প সেজন্য প্রতিশোধের প্রবৃত্তি তীক্ষ্ণ নয়; কিন্তু কদাচিৎ তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন, যেমন কর্ণপর্বে অর্জুনের উপর। তিনি বিশেষ যুদ্ধপটু নন, সেজন্য তাঁর ভ্রাতারা তাঁকে একটু আড়ালে রাখেন, তথাপি মাঝে মাঝে তিনি বীরত্ব দেখিয়েছেন। দ্রোণবধের উদ্দেশ্যে কৃষ্ণের প্ররোচনায় নিতান্ত অনিচ্ছায় তিনি মিথ্যা বলেছেন, কিন্তু সাধারণতঃ পাপপুণ্যের সূক্ষ্ম বিচার না করে তিনি কোনও কৰ্ম্ম করেন না, এজন্য দ্রৌপদী আর ভীমের কাছে তাঁকে বহু ভর্ৎসনা শুনতে হয়েছে। যুধিষ্ঠিরের অহংবুদ্ধি বড় বেশী, তার ফলে কেবলই নিজেকে পাপী মনে ক'রে মনস্তাপ ভোগ করেন। বার বার তাঁর মুখে বৈরাগ্যের কথা শুনে ব্যাসদেবও বিরক্ত হয়ে তাঁকে ভর্ৎসনা করেছেন। যুধিষ্ঠির ভালমানুষ হলেও দৃঢ়চিত্ত, যা সঙ্কল্প করেন তা থেকে টলেন না। অবস্থাবিশেষে তিনি realist ও হতে পারেন। কপট উপায়ে দ্রোণবধের জন্য অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে তিরস্কার করেছিলেন, কিন্তু যুধিষ্ঠির বিশেষ অনুতপ্ত হন নি। অশ্বত্থামা যখন নারায়ণাস্ত্রে পাণ্ডবসৈন্য বধ করছিলেন তখন অর্জুনকে নিশ্চেষ্ট দেখে যুধিষ্ঠির দ্রোণের অন্যায় কার্যাবলীর উল্লেখ ক'রে ব্যঙ্গ ক'রে বললেন, ‘আমাদের সেই পরম সুহৃৎ নিহত হয়েছেন, অতএব আমরাও সবান্ধবে প্রাণত্যাগ করব।’ ভীম নাভির নিম্নে গদা প্রহার ক'রে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করলেন দেখে বলরাম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ভর্ৎসনা ক'রে চ'লে গেলেন। তখন যুধিষ্ঠির বিষণ্ন হয়ে কৃষ্ণকে বললেন, ‘ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রেরা আমাদের উপর বহু অত্যাচার করেছে, সেই দারুণ দুঃখ ভীমের হৃদয়ে রয়েছে, এই চিন্তা করে আমি ভীমের আচরণ উপেক্ষা করলাম।’ যুধিষ্ঠিরের মহত্ত্ব সব চেয়ে প্রকাশ পেয়েছে শেষ পর্বে। তিনি স্বর্গে এলে ইন্দ্র তাঁকে ছলক্রমে নরকদর্শন করতে পাঠালেন। যুধিষ্ঠির মনে করলেন তাঁর ভ্রাতারা ও দ্রৌপদী সেখানেই যন্ত্রণাভোগ করছেন। তখন তিনি স্বর্গের প্রলোভন ও দেবতাদের অনুরোধ পরম অবজ্ঞায় উপেক্ষা করে বললেন, ‘আমি ফিরে যাব না, এখানেই থাকব।’
ভীমকে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন, ‘রক্তপ রাক্ষস।’ যুধিষ্ঠিরের মুখে অশ্বত্থামার মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ শুনে দ্রোণ যখন অবসন্ন হয়েছেন তখন ভীম নির্ম্মম ভাষায় দ্রোণকে তিরস্কার করলেন। ভীম কর্তৃক দুঃশাসনের রক্তপানের বিবরণ ভীষণ ও বীভৎস। তথাপি সাধারণ লোকে এই স্থূলবুদ্ধি হঠকারী প্রতিহিংসাপরায়ণ নির্দয় লোকটিকে স্নেহ করে। ভীম তাঁর বৈমাত্র ভ্রাতা হনুমানের মত আরাধ্য হতে না পারলেও জনপ্রিয় হয়েছেন, কারণ তিনি উৎকট অপরাধের উৎকট শাস্তি দিতে পারেন। সেকালের যাত্রার ভীম, যিনি ‘দাদা আর গদা’ ভিন্ন কিছুই জানতেন না, যখন অয়েলক্লথের গদা নিয়ে আসরে নামতেন তখন আবালবৃদ্ধবনিতা উৎফুল্ল হ'ত। ভীম চমৎকার কুতর্ক দিতে পারেন। বনবাসে তের মাস যেতে না যেতে তিনি অধীর হয়ে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ‘কৃষক যেমন অল্পপরিমাণ বীজের পরিবর্তে বহু শস্য পায়, বুদ্ধিমান সেইরূপ অল্প ধর্ম বিসর্জন দিয়ে বৃহৎ ধর্ম লাভ করেন। ... সোমলতার প্রতিনিধি যেমন পৃতিকা, সেইরূপ বৎসরের প্রতিনিধি মাস। আপনি তের মাসকেই তের বৎসর গণ্য করুন। যদি এইরূপ গণনা অন্যায় মনে করেন তবে একটা সাদৃশ্য-স্বভাব ষণ্ডকে প্রচুর আহার দিয়ে তৃপ্ত করুন, তাতেই পাপমুক্ত হবেন।’ ভীম মাংসলোভী পেটুক ছিলেন এবং তাঁর গোঁফদাড়ির অভাব ছিল; কর্ণ তাঁকে ঔদরিক আর তব্বরক (মাকুন্দ) ব'লে ক্ষ্যাপাতেন। শান্তিপর্বে যুধিষ্ঠির বলেছেন, ‘ভীম, অজ্ঞ লোকে উদরের জন্যই প্রাণিহিংসা করে, অতএব সেই উদরকে জয় কর, অল্পাহারে জঠরাগ্নি প্রশমিত কর।’ ধৃতরাষ্ট্রের অপরাধ ভীম কখনই ভুলতে পারেন নি, যুধিষ্ঠিরের আশ্রিত পুত্রহীন জ্যেষ্ঠতাতকে কিঞ্চিৎ অর্থ দিতেও তিনি আপত্তি করেছেন। তাঁর গঞ্জনা সইতে না পেরেই ধৃতরাষ্ট্র বনে যেতে বাধ্য হলেন।
অর্জুন সর্বগুণান্বিত এবং মহাভারতের বীরগণের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি কৃষ্ণের সখা ও মন্ত্রশিষ্য, প্রদ্যুম্ন ও সাত্যকির অস্ত্রশিক্ষক, নানা বিদ্যায় বিশারদ এবং অতিশয় রূপবান। মহাকাব্যের নায়কোচিত সমস্ত লক্ষণ তাঁর আছে, এই কারণে এবং অত্যধিক প্রশংসার ফলে তিনি কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছেন। অর্জুন ধীরপ্রকৃতি, কিন্তু মাঝে মাঝে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। কর্ণপর্বে যুধিষ্ঠির তাঁকে তিরস্কার ক'রে বলেছিলেন, ‘তোমার গাণ্ডীব ধনু অন্যকে দাও।’ তাতে অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে কাটতে গেলেন, অবশেষে কৃষ্ণ তাঁকে শান্ত করলেন। কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের পূর্বক্ষণে কৃষ্ণ অর্জুনকে যে গীতার উপদেশ দিয়েছিলেন তা পেয়ে জগতের লোক ধন্য হয়েছে। অর্জুনের ‘ক্ষুদ্র হৃদয়দৌর্বল্য’ দূর হয়েছিল, কিন্তু কোনও স্থায়ী উপকার হয়েছিল কিনা সন্দেহ। আশ্বমেধিকপর্বে অর্জুন কৃষ্ণের কাছে স্বীকার করেছেন যে বুদ্ধি দোষে তিনি পূর্বের উপদেশ ভুলে গেছেন।
নকুল-সহদেবের চরিত্রে অসামান্যতা বেশী কিছু পাওয়া যায় না। উদ্যোগপর্বে কৃষ্ণ যখন পাণ্ডবদূত হয়ে হস্তিনাপুরে যাচ্ছিলেন তখন নকুল তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি যা কালোচিত মনে কর তাই করবে।’ কিন্তু সহদেব বললেন, ‘যাতে যুদ্ধ হয় তুমি তাই করবে, কৌরবরা শান্তি চাইলেও তুমি যুদ্ধ ঘটাবে।’ মহাপ্রস্থানিকপর্বে যুধিষ্ঠির বলেছেন, ‘সহদেব মনে করতেন তাঁর চেয়ে বিজ্ঞ কেউ নেই। নকুল মনে করতেন তাঁর চেয়ে রূপবান কেউ নেই।’
মহাভারতে সকল পাণ্ডবেরই দ্রৌপদী ভিন্ন অন্য পত্নীর উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু ভীমের পত্নী হিড়িম্বা এবং অর্জুনের পত্নী উলুপী চিত্রাঙ্গদা ও সুভদ্রা ছাড়া আর সকলের স্থান আখ্যানমধ্যে নগণ্য।
দ্রৌপদী সীতা-সাবিত্রীর শ্রেণীতে স্থান পান নি, তিনি নিত্যস্মরণীয়া পঞ্চকন্যার একজন। দ্রৌপদী সর্ব বিষয়ে অসামান্য, প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে অন্য কোনও নারী তাঁর তুল্য জীবন্ত রূপে চিত্রিত হন নি। তিনি অতি রূপবতী, কিন্তু শ্যামবর্ণা, সেজন্য তাঁর নাম কৃষ্ণা। বার বৎসর বনবাস প্রায় শেষ হয়ে এলে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ তাঁকে হরণ করতে আসেন। তখন বয়সের হিসাবে দ্রৌপদী যৌবনের শেষ প্রান্তে এসেছেন, তিনি পঞ্চ বীর পুত্রের জননী, তারা দ্বারকায় অস্ত্রশিক্ষা করছে। তথাপি জয়দ্রথ তাঁকে দেখে বলছেন, ‘একে পেলে আমার আর বিবাহের প্রয়োজন নেই, এই নারীকে দেখে মনে হচ্ছে অন্য নারীরা বানরী।’ দ্রৌপদী যখন বিরাট- ভবনে সৈরিন্ধ্রী রূপে এলেন তখন রাজমহিষী সুদেষ্ণা তাঁকে দেখে বললেন, ‘তোমার করতল পদতল ও ওষ্ঠ রক্তবর্ণ, তুমি হংসগদগদভাষিণী, সুকেশী, সুদন্তী, ... কাশ্মীরী তুরঙ্গমীর ন্যায় সুদর্শনা। ... রাজা যদি তোমার উপর লুব্ধ না হন তবে তোমাকে মাথায় ক’রে রাখব। এই রাজভবনে যেসব নারী আছে তারা একদৃষ্টিতে তোমাকে দেখছে, পুরুষরা মোহিত হবে না কেন? ... সুন্দরী, তোমার অলৌকিক রূপে দেখে বিরাট রাজা আমাকে ত্যাগ করে সর্বান্তঃকরণে তোমাতেই আসক্ত হবেন।’ এই আশঙ্কাতেই সুদেষ্ণা দ্রৌপদীকে কীচকের কবলে ফেলতে সম্মত হয়েছিলেন। দ্রৌপদী অবলা নন, জয়দ্রথ ও কীচককে ধাক্কা দিয়ে ভূমশায়ী করেছিলেন। তিনি অসহিষ্ণু তেজস্বিনী স্পষ্টবাদিনী, তীক্ষ্ণ বাক্যে নিষ্ক্রিয় পুরুষদের উত্তেজিত করতে পারেন। তাঁর বাগ্মিতার পরিচয় অনেক স্থানে পাওয়া যায়। বনপর্ব ৫-পরিচ্ছেদে, উদযোগপর্ব ১০-পরিচ্ছেদে, এবং শান্তিপর্ব ২-পরিচ্ছেদে দ্রৌপদীর খেদ ও ভর্ৎসনার যে নাটকীয় বিবরণ আছে তা সর্ব সাহিত্যে দুর্লভ। বহু কষ্ট ভোগ ক’রে তাঁর মন তিক্ত হয়ে গেছে, মঙ্গলময় বিধাতায় তাঁর আস্থা নেই। বনপর্ব ৭-পরিচ্ছেদে তিনি যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন, ‘মহারাজ, বিধাতা প্রাণীগণকে মাতা-পিতার দৃষ্টিতে দেখেন না, তিনি রুষ্ট ইতরজনের ন্যায় ব্যবহার করেন।’ দ্রৌপদী মাঝে মাঝে তাঁর পঞ্চ স্বামীকে বাকবাণে পীড়িত করেন, স্বামীরা তা নির্বিবাদে সয়ে যান। তাঁরা দ্রৌপদীকে সম্মান ও সমাদর করেন। বিরাটপর্বে যুধিষ্ঠির বলেছেন, ‘আমাদের এই ভার্যা প্রাণাপেক্ষা প্রিয়া, মাতার ন্যায় পালনীয়া, জ্যেষ্ঠা ভগিনীর ন্যায় রক্ষণীয়া।’ দ্রৌপদী পাঁচ স্বামীকেই ভালবাসেন, কিন্তু তাঁর ভালবাসার কিছু প্রকারভেদ দেখা যায়। যুধিষ্ঠির তাঁকে অনেক জ্বালিয়েছেন, তথাপি দ্রৌপদী তাঁর জ্যেষ্ঠ স্বামীকে ভক্তি করেন, অনুকম্পা ও কিঞ্চিৎ অবজ্ঞাও করেন, ভালমানুষ অবশ্য একগুঁয়ে গুরুজনকে লোকে যেমন ক’রে থাকে। বিপদের সময় দ্রৌপদী ভীমের উপরেই বেশী ভরসা রাখেন এবং শক্ত কাজের জন্য তাকেই ফরমাশ করেন, তাতে ভীম কৃতার্থ হয়ে যান। নকুল-সহদেবকে তিনি দেবরের ন্যায় স্নেহ করেন। অর্জুন তাঁর প্রথম অনুরাগের পাত্র, পরেও বোধ হয় অর্জুনের উপরেই তাঁর প্রকৃত প্রেম ছিল। মহাপ্রস্থানিকপর্বে যুধিষ্ঠির বলেছেন, ‘ধনঞ্জয়ের উপর এ’র বিশেষ পক্ষপাত ছিল।’ বিদেশে অর্জুন কিয়ৎকাল উলূপী ও চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে কাটিয়েছিলেন, দ্রৌপদী তা গ্রাহ্য করেন নি। কিন্তু অর্জুন যখন রূপবতী সুভদ্রাকে ঘরে আনলেন তখন দ্রৌপদী অতি দুঃখে বললেন, ‘কৌন্তেয়, তুমি সুভদ্রার কাছেই যাও, পুনর্বার বন্ধন করলে পূর্বের বন্ধন শিথিল হয়ে যায়।’ দ্রৌপদীর একটি বৈশিষ্ট্য — কৃষ্ণের সহিত তাঁর সখ্য সম্বন্ধ। তিনি কৃষ্ণের সখী এবং সুভদ্রার ন্যায় স্নেহভাগিনী, সকল সঙ্কটে কৃষ্ণই তাঁর শরণ্য ও স্মরণীয়।
দুর্যোধন মহাভারতের প্রতিনায়ক এবং পূর্ণ পাপী। তাঁর তুল্য রাজ্যলোভী বা প্রভুত্বলোভী ধর্মজ্ঞানহীন দুর্মুখ ক্রূর দুরাত্মা এখনও দেখা যায়, এই কারণে তাঁর চরিত্র আমাদের সুপরিচিত মনে হয়। তিনি আজীবন পাণ্ডবদের অনিষ্ট করেছেন, নিজেও ঈর্ষা ও বিদ্বেষের দগ্ধ হয়েছেন, তাঁর দুই মন্ত্রণাদাতা কর্ণ ও শকুনি তাতে ইন্ধন যুগিয়েছেন। দুর্যোধন নিয়তিবাদী। সভাপর্বে তিনি বিদুরকে বলেছেন, ‘যিনি গর্ভস্থ শিশুকে শাসন করেন তিনিই আমার শাসক; তাঁর প্রেরণায় আমি জলস্রোতের ন্যায় চালিত হচ্ছি।’ উদ্যোগপর্বে কৃষ্ণ মুনি তাঁকে সদুপদেশ দিলে দুর্যোধন উরুতে চাপড় মেরে বললেন, ‘মহর্ষি, ঈশ্বর আমাকে যেমন সৃষ্টি করেছেন এবং ভবিষ্যতে আমার যা হবে আমি সেই ভাবেই চলছি, কেন প্রলাপ বকছেন?’ কিন্তু শয়তানকেও তার ন্যায্য পাওনা দিতে হয়। দুর্যোধনের অন্ধকারময় চরিত্রে আমরা একবার একটু স্নিগ্ধ আলোক দেখতে পাই। — দ্রোণবধের দিন প্রাতঃকালে সাত্যকিকে দেখে তিনি বলেছেন, ‘সখা, ক্রোধ লোভ ক্ষত্রিয়াচার ও পৌরুষকে ধিক — আমরা পরস্পরের প্রতি শরসন্ধান করছি! বাল্যকালে আমরা পরস্পরের প্রাণ অপেক্ষা প্রিয় ছিলাম, এখন এই রণস্থলে সে সমস্তই জীর্ণ হয়ে গেছে। সাত্যকি, আমাদের সেই বাল্যকালের খেলা কোথায় গেল, এই যুদ্ধই বা কেন হ’ল?’ যে ধনের লোভে আমরা যুদ্ধ করছি তা নিয়ে আমরা কি করব?’ আশ্রমবাসিকপর্বে প্রজাদের নিকট বিদায় নেবার সময় ধৃতরাষ্ট্র তাঁর মৃত পুত্রের সম্বন্ধে বলেছেন, ‘মন্দবুদ্ধি দুর্যোধন আপনাদের কাছে কোনও অপরাধ করে নি।’ প্রজাদের যিনি মুখপাত্র তিনিও স্বীকার করলেন, ‘রাজা দুর্যোধন আমাদের প্রতি কোনও দুর্ব্যবহার করেন নি।’ যুধিষ্ঠির স্বর্গে গিয়ে দুর্যোধনকে দেখে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। নারদ তাঁকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, ‘ইনি ক্ষত্রধর্মানুসারে যুদ্ধে নিজ দেহ উৎসর্গ ক’রে বীরলোক লাভ করেছেন, মহাভয় উপস্থিত হ’লেও ইনি কখনও ভীত হন নি।’ আসল কথা, দুর্যোধন লৌকিক ফরমুলা অনুসারে স্বর্গে গেছেন। যুদ্ধে মরলে স্বর্গ, অশ্বমেধে স্বর্গ, গঙ্গাস্নানে স্বর্গ ; আজীবন কে কি করেছে তা ধর্তব্য নয়। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, ‘কর্ণচরিত্র অতি মহৎ ও মনোহর।’ তিনি কর্ণের গুণাগুণের জমখরচ ক’শে সদগুণাবলীর মোটা রকম উদ্বৃত্ত পেয়েছিলেন কিনা জানি না। আমরা কর্ণচরিত্রে নীচতা ও মহত্ত্ব দুই-ই দেখতে পাই (নীচতাই বেশী), কিন্তু তার সমন্বয় করতে পারি না। বোধ হয় বহু রচয়িতার হাতে প’ড়ে কর্ণচরিত্রের এই বিপর্যয় হয়েছে। কর্ণপর্ব ১৮-পরিচ্ছেদে অর্জুনকে কৃষ্ণ বলেছেন, ‘জতুগৃহদাহ, দ্যুতক্রীড়া, এবং দুর্যোধন তোমাদের উপর যত উৎপীড়ন করেছেন সে সমস্তেরই মূল দুরাত্মা কর্ণ।’ কৃষ্ণ অত্যুক্তি করেন নি। মহাভারতে সব চেয়ে রহস্যময় পুরুষ কৃষ্ণ। বহু হস্তক্ষেপের ফলে তাঁর চরিত্রেই বেশী অসঙ্গতি ঘটেছে। মূল মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণকে ঈশ্বর বললেও সম্ভবত তাঁর আচরণে অতিপ্রাকৃত ব্যাপার বেশী দেখান নি; সাধারণত তাঁর আচরণ গীতাধর্মব্যাখ্যারই যোগ্য, তিনি বীতরাগভয়ক্রোধ স্থিতপ্রজ্ঞ লোকহিতে রত। কিন্তু মাঝে মাঝে তাঁর যে বিকার দেখা যায় তা ধর্মসংস্থাপক পুরুষোত্তমের পক্ষে নিতান্ত অশোভন, যেমন ঘটোৎকচবধের পর তাঁর উদ্দাম নৃত্য এবং দ্রোণবধের উদ্দেশ্যে যুধিষ্ঠিরকে মিথ্যাভাষণের উপদেশ। বঙ্কিমচন্দ্র যা কিছু অপ্রিয় পেয়েছেন সবই প্রক্ষেপ বলে উড়িয়ে দিয়ে কৃষ্ণকে আদর্শ নরধৰ্মী ঈশ্বর বলে মেনেছেন। শান্তিপর্বে যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম বলেছেন, 'এই মহাত্মা কেশব সেই পরম পুরুষের অংশমাত্র।' মৃত্যুর পূর্বে তিনি কৃষ্ণকে বলেছেন, 'তুমি সনাতন পরমাত্মা।' অর্জুন কৃষ্ণকে ঈশ্বর জ্ঞান করলেও সব সময়ে তা মনে রাখতেন না। কৃষ্ণের বিশ্ব-রূপদর্শনে অভিভূত হয়ে অর্জুন বলেছেন, 'তোমার মহিমা না জেনে প্রমাদবশে বা প্রণয়বশে তোমাকে কৃষ্ণ যাদব ও সখা বলে সম্বোধন করেছি, বিহার ভোজন ও শয়ন কালে উপহাস করেছি, সে সমস্ত ক্ষমা কর।' স্বামী প্রভাবানন্দ ও ক্রিস্টফার ইশারউড তাঁদের গীতার মুখবন্ধে লিখেছেন, 'Arjuna knows this—yet, by a merciful ignorance, he sometimes forgets. Indeed, it is Krishna who makes him forget, since no ordinary man could bear the strain of constant companionship with God.' মহাভারতপাঠে বোঝা যায় কৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব বহু-বিদিত ছিল না। কৃষ্ণপুত্ত্র শাম্ব দুৰ্য্যোধনের জামাতা; দুৰ্য্যোধন তাঁর বৈবাহিককে ঈশ্বর মনে করতেন না। উদ্যোগ-পৰ্বে তিনি যখন পাণ্ডবদূত কৃষ্ণকে বন্দী করবার মতলব করছিলেন তখন কৃষ্ণ সভাস্থ সকলকে তাঁর বিশ্বরূপ দেখালেন, কিন্তু তাতেও দুৰ্য্যোধনের বিশ্বাস হ'ল না। যুদ্ধের পূর্বে শকুনিপুত্র উলুককে তাঁর প্রতিনিধিরূপে পাণ্ডবশিবিরে পাঠাবার সময় দুৰ্য্যোধন তাকে শিখিয়ে দিলেন — 'তুমি কৃষ্ণকে বলবে, ... ইন্দ্রজাল মায়া কুহক বা বিভীষিকা দেখলে অস্ত্রধারী বীর ভয় পায় না, সিংহনাদ করে। আমরাও বহুপ্রকার মায়া দেখাতে পারি, কিন্তু তেমন উপায়ে কার্যসিদ্ধি করতে চাই না। কৃষ্ণ, তুমি অকস্মাৎ যশস্বী হয়ে উঠেছ, কিন্তু আমরা জানি পুংশ্চিহ্নধারী নপুংসক অনেক আছে। তুমি কংসের ভৃত্য ছিলে সেজন্য আমার তুল্য কোনও রাজা তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করেন নি।' সর্বত্র ঈশ্বররূপে স্বীকৃত না হ'লেও কৃষ্ণ বহু সমাজে অশেষ শ্রদ্ধা ও প্রীতির আধার ছিলেন এবং রূপ শৌর্য বিদ্যা ও প্রজ্ঞার জন্য পুরুষ-শ্রেষ্ঠ গণ্য হ'তেন। তিনি রাজা নন, যাদব আভিজাততন্ত্রের একজন প্রধান মাত্র, কিন্তু প্রতিপত্তিতে সর্বত্র শীর্ষস্থানীয়। তথাপি কৃষ্ণদ্বেষীর অভাব ছিল না। সভাপর্ব ৩-পরিচ্ছেদে উক্ত বঙ্গ-পাণ্ডু-কিরাতের রাজা পৌণ্ড্রক কৃষ্ণের অনুকরণে শঙ্খ চক্র গদা ধারণ করতেন এবং প্রচার করতেন যে তিনিই আদর্শ বাসুদেব ও পুরুষোত্তম।
অল্প বা অধিক যাই হ'ক, মহাভারতের ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে তা সর্বস্বীকৃত। আখ্যানমধ্যে বহু বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় যার সত্যতায় সন্দেহের কারণ নেই। দ্রৌপদীর বহুপতিত্বের দোষ ঢাকবার জন্য গ্রন্থকারকে বিশেষ চেষ্টা করতে হয়েছে। তিনি যদি শুধু গল্পই লিখতেন তবে এই লোকাচারবিরুদ্ধ বিষয়ের অবতারণা করতেন না। তাঁকে সুপ্রতিষ্ঠিত জনশ্রুতি বা ইতিহাস মানতে হয়েছে তাই তিনি এই ঘটনাটি বাদ দিতে পারেন নি। আখ্যানের মধ্যে দ্রোণপত্নী কৃপীর উল্লেখ অতি অল্প, তথাপি প্রসঙ্গক্রমে তাঁকে অল্পকেশী বলা হয়েছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন কৃষ্ণবর্ণ ছিলেন, তাঁর রূপ বেশ ও গন্ধ কুৎসিত ছিল, ভীম মাকুন্দ ছিলেন, মাহিষ্মতী নগরীর নারীরা স্বৈরিণী ছিল, মদ্র ও বাহীক দেশের স্ত্রীপুরুষ অত্যন্ত কদাচারী ছিল, যাদবগণ মাতাল ছিলেন, হিমালয়ের উত্তরে বালুকার্ণব ছিল, লোহিত্য (ব্রহ্মপুত্র নদ) এত বিশাল ছিল যে তাকে সাগর বলা হ'ত, দ্বারকাপুরী সাগর-কবলিত হয়েছিল — ইত্যাদি তুচ্ছ ও অতুচ্ছ অনেক বিষয় গ্রন্থমধ্যে বিকীর্ণ হয়ে আছে যা সত্য ব'লে মানতে বাধা হয় না।
মহাভারত পড়লে প্রাচীন সমাজ ও জীবনযাত্রার একটা মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়াদি সকলেই প্রচুর মাংসাহার করতেন, ভদ্রসমাজেও সুরাপান চলত। গোমাংসভোজন ও গোমেধ যজ্ঞের বহু উল্লেখ পাওয়া যায়, কিন্তু গ্রন্থ-রচনাকালে তা গর্হিত গণ্য হ'ত। অস্পৃশ্যতা কম ছিল, দাসদাসীরাও অন্ন পরিবেশন করত। অনুশাসনপর্বে ভীষ্ম বলেছেন, ৩০ বা ২১ বৎসরের বর ১০ বা ৭ বৎসরের কন্যাকে বিবাহ করবে; কিন্তু পরে আবার বলেছেন, বয়ঃস্থা কন্যাকে বিবাহ করাই বিজ্ঞলোকের উচিত। মহাভারতে সর্বত্র মূর্তবিবাহই দেখা যায়। রাজাদের অনেক পত্নী এবং দাসী বা উপপত্নী থাকত, যাঁর এক ভার্যা তিনি মহাসত্ত্বিশালী গণ্য হতেন। বর্ণসংকরের ভয় ছিল, কিন্তু অনুশাসনপর্বে ভীষ্ম বহুপ্রকার বর্ণসংকরের উল্লেখ করে বলেছেন, তাদের সংখ্যার ইয়ত্তা নেই। অনেক বিধবা সতী হতেন, আবার অনেকে পৌত্রপৌত্রাদির সঙ্গে থাকতেন, যেমন সত্যবতী কুন্তী উত্তরা সুভদ্রা। নারীর মর্যাদার অভাব ছিল না, কিন্তু সময়ে সময়ে তাঁদেরও দান বিক্রয় এবং দ্যূতখেলায় পণ রাখা হ'ত। ভূমি ধনরত্ন বস্ত্র যানবাহন প্রভৃতির সঙ্গে রূপবতী দাসীও দান করার প্রথা ছিল। উৎসবে শোভাবৃদ্ধির জন্য বেশ্যার দল নিযুক্ত হ'ত। ব্রাহ্মণরা প্রচুর সম্মান পেতেন; তাঁরা সভায় তুমুল তর্ক করতেন এবং অন্য লোকে উপহাসও করত। দেবপ্রতিমার পূজা প্রচলিত ছিল। রাজাকে দেবতুল্য জ্ঞান করা হ'ত, কিন্তু অনুশাসনপর্বে ১৩-পরিচ্ছেদে ভীষ্ম বলেছেন, 'যিনি প্রজারক্ষার আশ্বাস দিয়ে রক্ষা করেন না সেই রাজাকে ক্ষিপ্ত কুক্কুরের ন্যায় বিনষ্ট করা উচিত'। অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান অতি বীভৎস ছিল। পুরাকালে নরবলি চলত, মহাভারতের কালে তা নিন্দিত হলেও লোপ পায় নি, জরাসন্ধ তার আয়োজন করেছিলেন।
যুদ্ধের বর্ণনা অতিরঞ্জিত হলেও আমরা তৎকালীন যুদ্ধরীতির কিছু কিছু আন্দাজ করতে পারি। ভীষ্মপর্ব ১-পরিচ্ছেদে কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের যে নিয়মবন্ধন বিবৃত হয়েছে তা আধুনিক সার্বজাতিক নিয়ম অপেক্ষা নিকৃষ্ট নয়। নিরস্ত্র বা বাহনচ্যুত শত্রুকে মারা অন্যায় বলা হ'ত। নিয়মলঙ্ঘন করলে যোদ্ধা নিন্দাভাজন হতেন। স্বপক্ষ ও বিপক্ষের আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল। সূর্যাস্তের পর প্রহার বা যুদ্ধ নিবারণ ঘোষিত হ'ত, কিন্তু সময়ে সময়ে রাত্রিকালেও যুদ্ধ চলত। নির্দিষ্ট সমরে নির্দিষ্ট স্থানে যুদ্ধ হ'ত, কিন্তু সৌপ্তিকপর্বে অশ্বত্থামা তার ব্যতিক্রম করেছিলেন। যুদ্ধভূমির নিকট বেশ্যাশিবির থাকত। বিখ্যাত যোদ্ধাদের রথে চার ঘোড়া জোতা হ'ত। ধ্বজদণ্ড রথের ভিতর থেকে উঠত, রথী আহত হ’লে ধ্বজদণ্ড ধ’রে নিজেকে সামলাতেন। অর্জুন ও কর্ণের রথ শব্দহীন ব'লে বর্ণিত হয়েছে। দ্বৈরথ যুদ্ধের পূর্বে বাগযুদ্ধ হ'ত, বিপক্ষের তেজ কমাবার জন্য দুই বীর পরস্পরকে গালি দিতেন এবং নিজের গর্ব করতেন। বিখ্যাত রথীদের চতুর্দিকে রক্ষী যোদ্ধারা থাকতেন, পিছনে একাধিক শকটে রাশি রাশি শর ও অন্যান্য ক্ষেপনীয় অস্ত্র থাকত। বোধ হয় পদাতিক সৈন্য ধনুর্বাণ নিয়ে যুদ্ধ করত না, তাদের বর্মও থাকত না; এই কারণেই রথারোহী বর্মধারী যোদ্ধা একাই বহু সেনা শরাঘাতে বধ করতে পারতেন।
আদিপর্ব ১-পরিচ্ছেদে মহাভারতকথক সৌতি বলেছেন, ‘কয়েকজন কবি এই ইতিহাস পূর্বে বলে গেছেন, এখন অপর কবিরা বলছেন, আবার ভবিষ্যতে অন্য কবিরা বলবেন।’ এই শেষোক্ত কবিরা মহাভারতের ত্রুটি শোধনের চেষ্টা করেছেন। মহাভারতের দুষ্মন্ত ইচ্ছা ক’রে শকুন্তলার অপমান করেছেন, কিন্তু কালিদাসের দুষ্মন্ত শাপের বশে না জেনে করেছেন। মহাভারতের কচ দেবযানীকে প্রত্যাভিশাপ দিয়েছেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কচ পরম ক্ষমাশীল। কাশীরাম দাসের গ্রন্থে এবং বাংলা নাটকে কর্ণচরিত্র সংশোধিত হয়েছে।
মহাভারতের আখ্যান ও উপাখ্যানগুলি দু-তিন হাজার বৎসর ধরে এদেশের জনসাধারণকে মনোরঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব শিখিয়েছে এবং কাব্যনাটকাদির উপাদান যুগিয়েছে। মহাভারতের বহু শ্লোক প্রবাদরূপে সুপ্রচলিত হয়েছে। মহাভারতীয় নরনারীর চরিত্রে কোথায় কি অসংগতি বা ত্রুটি আছে লোকে তা গ্রাহ্য করে নি, । কিছু মহৎ তাই আদর্শরূপে পেয়ে ধন্য হয়েছে। সেকাল আর একালের লোকাচারে অনেক প্রভেদ, তথাপি মহাভারতে কৃষ্ণ ভীষ্ম ও কবিগণ কর্তৃক ধর্মের যে মূল আদর্শ কথিত হয়েছে তা সর্বকালেই গ্রহণীয়।
দুঃখময় সংসারে মিলনান্ত আখ্যানই জনপ্রিয় হবার কথা, কিন্তু এদেশের প্রাচীনতম এবং সর্বাধিকপ্রচলিত চিরায়ত-সাহিত্য বা ক্লাসিক রামায়ণ-মহাভারত বিয়োগান্ত হ’ল কেন? এই দুই গ্রন্থের স্পষ্ট উদ্দেশ্য — বিচিত্র ঘটনার বর্ণনা দ্বারা লোকের মনোরঞ্জন এবং কথাচ্ছলে ধর্মশিক্ষা; কিন্তু অন্য উদ্দেশ্যও আছে।
মানুষ চিরজীবী নয়, সেজন্য বাস্তব বা কাল্পনিক সকল জীবনবৃত্তান্তই বিয়োগান্ত। রামায়ণ রাম-রাবণ প্রভৃতির এবং মহাভারত ভরতবংশীয়গণের জীবনবৃত্তান্ত। এই দুই গ্রন্থের রচয়িতারা নির্লিপ্ত সাক্ষীর ন্যায় অনাসক্তভাবে সুখদুঃখ মিলনবিরহ প্রভৃতি জীবনদ্বন্দ্বের বর্ণনা করেছেন। তাঁদের পরোক্ষ উদ্দেশ্য পাঠকের মনেও অনাসক্তি সঞ্চার করা। তাঁরা শ্মশানবৈরাগ্য প্রচার করেন নি, বিষয়ভোগও ছাড়তে বলেন নি, শুধু এই অলঙ্ঘনীয় জাগতিক নিয়ম শান্তচিত্তে মেনে নিতে বলেছেন —
সর্বে ক্ষয়ান্তা নিচয়াঃ পতনান্তাঃ সমুচ্ছ্রয়াঃ।
সংয়োগা বিপ্রযোগান্তা মরণান্তং চ জীবিতম্।। (স্ত্রীপৰ্ব)
— সকল সঞ্চয়ই পরিশেষে ক্ষয় পায়, উন্নতির অন্তে পতন হয়, মিলনের অন্তে বিচ্ছেদ হয়, জীবনের অন্তে মরণ হয়।
রাজশেখর বসু
১ আষাঢ় ১৩৬৫