আদিপর্ব: ৩৩। কর্ণ-জন্ম ও ভীমার্জ্জনের যুদ্ধ — কুন্তী-সকাশে দ্রৌপদী
রাজারা ক্রুদ্ধ হয়ে বলতে লাগলেন, আমাদের তৃণের ন্যায় অগ্রাহ্য ক’রে পাঞ্চালরাজ একটা ব্রাহ্মণকে কন্যাদান করতে চান, আমরা দুরাত্মা দ্রুপদ আর তার পুত্রকে বধ করব। আমাদের আহ্বান ক’রে এনে উত্তম অন্ন খাইয়ে পরিশেষে অপমান করা হয়েছে। স্বয়ম্বর ক্ষত্রিয়ের জন্য, তাতে ব্রাহ্মণের অধিকার নেই। যদি এই কন্যা আমাদের কাউকেও বরণ না করে তবে তাকে আগুনে ফেলে আমরা চ’লে যাব। লোভের বশে যে আমাদের অপ্রিয় কাজ করেছে সেই ব্রাহ্মণকে আমরা বধ করতে পারি না, দ্রুপদকেই বধ করব।
রাজারা আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছেন দেখে দ্রুপদ শান্তির কামনায় ব্রাহ্মণদের শরণাপন্ন হলেন। ভীম একটা গাছ উপড়ে নিয়ে অর্জ্জনের পাশে দাঁড়ালেন, অর্জুনও ধনুর্ব্বাণ নিয়ে প্রস্তুত হয়ে রইলেন। ব্রাহ্মণরা তাঁদের মৃগচর্ম্ম আর করঙ্ক নেড়ে বললেন, ভয় পেয়ো না, আমরা যুদ্ধ করব। অর্জুন সহাস্যে বললেন, আপনারা দর্শক হয়ে এক পাশে থাকুন, আমি শত শত শরে এই ক্রুদ্ধ রাজাদের নিবৃত্ত করব। অনন্তর রাজারা এবং দুর্য্যোধনাদি ব্রাহ্মণদের দিকে ধাবিত হলেন, কর্ণ অর্জুনকে এবং শল্য ভীমকে আক্রমণ করলেন। অর্জ্জনের আশ্চর্য্য শরক্ষেপণ দেখে কর্ণ বললেন, বিপ্রশ্রেষ্ঠ, তুমি কি মূর্ত্তিমান ধনুর্ব্বেদ, না রাম, না বিষ্ণু? অর্জুন বললেন, আমি একজন ব্রাহ্মণ, গুরুর কাছে অস্ত্রশিক্ষা করেছি। এই বলে অর্জুন কর্ণের ধনু ছেদন করলেন। কর্ণ অন্য ধনু নিলেন, তাও ছিন্ন হ’ল। নিজের সকল অস্ত্র বিফল হওয়ায় কর্ণ ভাবলেন, ব্রহ্মতেজ অজেয়, তখন তিনি বাইরে চ’লে গেলেন। শল্য আর ভীম বহুক্ষণ মুষ্টি আর জানু দিয়ে পরস্পরকে আঘাত করতে লাগলেন, অবশেষে ভীম শল্যকে তুলে ভূমিতে নিক্ষেপ করলেন। ব্রাহ্মণরা হেসে উঠলেন। রাজারা বললেন, এই দুই যোদ্ধা ব্রাহ্মণ বিশেষ প্রশংসার পাত্র, আমাদের যুদ্ধ থেকে বিরত হওয়াই উচিত। এঁদের পরিচয় পেলে পরে আবার সানন্দে যুদ্ধ করব। কুরু সকলকে অনুনয় ক’রে বললেন, এঁরা ধর্ম্মানুসারেই দ্রৌপদীকে লাভ করেছেন। তখন রাজারা নিবৃত্ত হয়ে চ’লে গেলেন।
ভীম ও অর্জুন তাঁদের বাসস্থান কুম্ভকারের কর্ম্মশালায় এসে আনন্দিত-মনে কুন্তীকে জানালেন যে, তাঁরা ভিক্ষা এনেছেন। কুটীরের ভিতর থেকেই কুন্তী বললেন, তোমরা সকলে মিলে ভোগ কর। তারপর দ্রৌপদীকে দেখে বললেন, কি আমি অন্যায় কথা বলে ফেলেছি। তিনি দ্রৌপদীর হাত ধরে যুধিষ্ঠিরের কাছে গিয়ে বললেন, পুত্র, তোমার দুই ভ্রাতা দ্রুপদ রাজার এই কন্যাকে আমার কাছে এনেছে, আমি প্রমাদবশে বলেছি—সকলে মিলে ভোগ কর। যাতে এ’র পাপ না হয় তার উপায় বল। যুধিষ্ঠির একটু চিন্তা ক’রে বললেন, অর্জুন, তুমি যাজ্ঞসেনীকে (১) জয় করেছ, তুমিই এঁকে যথাবিধি বিবাহ কর। অর্জুন বললেন, মহারাজ, আমাকে অধর্মভাগী করবেন না, আগে আপনার, তার পর ভীমের, তার পর আমার, তার পর নকুল-সহদেবের বিবাহ হবে। দ্রৌপদী সকলকেই দেখছিলেন, পাণ্ডবরাও পরস্পরের দিকে চেয়ে দ্রৌপদীর প্রতি আসক্ত হলেন। যুধিষ্ঠির ভ্রাতাদের মনোভাব বুঝলেন, তিনি ব্যাসের কথা স্মরণ ক’রে এবং ভ্রাতাদের মধ্যে পাছে ভেদ হয় সেই ভয়ে বললেন, ইনি আমাদের সকলেরই ভার্যা হবেন।
এমন সময় কৃষ্ণ ও বলরাম সেখানে এলেন এবং যুধিষ্ঠির ও পিতৃম্বসা কুন্তীর পাদবন্দনা ক’রে বললেন, আমি কৃষ্ণ, আমি বলরাম। কুশলপ্রশ্নের পর যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা এখানে গোপনে বাস করছি, বাসুদেব, তোমরা জানলে কি ক’রে? কৃষ্ণ সহাস্যে বললেন, মহারাজ, অগ্নি গুপ্ত থাকলেও প্রকাশ পায়, পাণ্ডব ভিন্ন অন্য কার এত বিক্রম? ভাগ্যক্রমে আপনারা জতুগৃহ থেকে মুক্তি পেয়েছেন, ধৃতরাষ্ট্রের পাপী পুত্রদের অভীষ্ট সিদ্ধ হয় নি। আপনাদের সমৃদ্ধি-লাভ হ’ক, আপনারা গোপনে থাকবেন। এই ব’লে কৃষ্ণ-বলরাম তাঁদের শিবিরে প্রস্থান করলেন।
ভীমার্জুন যখন দ্রৌপদীকে নিজেদের আবাসে নিয়ে আসছিলেন তখন ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁদের পিছনে ছিলেন। কুম্ভকারের গৃহের চতুর্দিকে নিজের অনুচরদের রেখে ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রচ্ছন্ন হয়ে রইলেন। সন্ধ্যাকালে কুন্তী ভিক্ষান্ন পাক করে দ্রৌপদীকে বললেন, ভদ্রে, তুমি আগে দেবতা ব্রাহ্মণ আর আগন্তুকদের অন্ন দাও, তার পর যা থাকবে তার অর্দ্ধ ভাগ ভীমকে দাও। অবশিষ্ট অংশ যুধিষ্ঠিরাদি চার ভ্রাতা, তোমার আর আমার জন্য ভাগ কর। দ্রৌপদী হৃষ্টচিত্তে কুন্তীর আজ্ঞা পালন করলেন। পাণ্ডবদের ভোজনের পর সহদেব ভূমিতে কুশশয্যা পাতলেন, তার উপরে নিজ নিজ মৃগচর্ম বিছিয়ে পঞ্চ ভ্রাতা শুয়ে পড়লেন। কুন্তী তাঁদের মাথার দিকে এবং দ্রৌপদী পায়ের দিকে শুলেন। কুশশয্যায় এইরূপে পায়ের বালিশের মতন শুয়েও দ্রৌপদীর মনে দুঃখ বা পাণ্ডবদের প্রতি অবজ্ঞার ভাব হ’ল না।
পাণ্ডবরা শুয়ে শুয়ে অশ্ব, রথ, হস্তী প্রভৃতি সেনাবিষয়ক আলোচনা করতে লাগলেন। অন্তরাল থেকে ধৃষ্টদ্যুম্ন সমস্তই শুনলেন এবং ভগিনীকে দেখলেন। তিনি রাত্রিকালেই দ্রুপদকে সকল বৃত্তান্ত জানাবার জন্য সত্বর চলে গেলেন।
বিমর্ষ দ্রুপদ ধৃষ্টকে জিজ্ঞাসা করলেন, কৃষ্ণা কোথায় গেল? কোনও হীনজাতি তাকে নিয়ে যায় নি তো? আমার মস্তকে কর্দমাক্ত চরণ কে রাখলে? পুষ্পমালা কি ভস্মে পড়েছে? অর্জুনই কি লক্ষ্যভেদ করেছেন?