আদিপর্ব: ৩৫। ব্যাসের বিধান — দ্রৌপদীর বিবাহ
ব্যাস দ্রুপদকে এই উপাখ্যান বললেন। — পুরাকালে দেবতারা নৈমিষারণ্যে এক যজ্ঞ করেন, যম তার পুরোহিত ছিলেন। যম যজ্ঞে নিবৃত্ত থাকায় মনুষ্যগণ মৃত্যুহীন হয়ে বৃদ্ধি পেতে লাগল। দেবতারা উদ্বিগ্ন হয়ে ব্রহ্মার কাছে গেলে তিনি আশ্বাস দিলেন, যজ্ঞ শেষ হলে যম নিজ কার্যে মন দেবেন, তখন আবার মানুষের মরণ হবে। দেবতারা যজ্ঞস্থানে যাত্রা করলেন। যেতে যেতে তাঁরা গঙ্গার জলে একটি স্বর্ণপদ্ম দেখতে পেলেন। ইন্দ্র সেই পদ্ম নিতে গিয়ে দেখলেন, একটি অনলপ্রভা রমণী গঙ্গার গভীর জলে নেমে কাঁদছেন, তাঁর অশ্রুবিন্দু স্বর্ণপদ্ম হয়ে জলে পড়ছে। রোদনের কারণ জিজ্ঞাসা করলে রমণী ইন্দ্রকে বললেন, আমার পিছনে পিছনে আসুন। কিছুদূর গিয়ে ইন্দ্র দেখলেন, হিমালয়শিখরে সিংহাসনে বসে এক সুদর্শন যুবা এক যুবতীর সঙ্গে পাশা খেলছেন। তাঁরা খেলায় মত্ত হয়ে তাঁকে গ্রাহ্য করছেন না দেখে দেবরাজ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, এই বিশ্ব আমারই অধীন জেনো, আমিই এর ঈশ্বর। যুবা হাস্য করে ইন্দ্রের দিকে চাইলেন, ইন্দ্র স্থাণুর ন্যায় নিশ্চল হয়ে গেলেন। পাশা খেলা শেষ হলে সেই যুবা ইন্দ্রের সঙ্গিনীকে বললেন, ওকে নিয়ে এস, আমি ওর দর্প দূর করছি। সেই রমণীর স্পর্শমাত্র ইন্দ্র অবশ হয়ে ভূপতিত হলেন। তখন যুবকরূপী মহাদেব বললেন, ইন্দ্র, আর কখনও দর্প প্রকাশ করো না। তুমি তো অসীম বলশালী, ওই পর্বতটি উঠিয়ে গহ্বরের ভিতরে গিয়ে দেখ। ইন্দ্র গহ্বরে প্রবেশ করে দেখলেন, তাঁর তুল্য তেজস্বী চার জন পুরুষ সেখানে রয়েছেন। ইন্দ্রকে ভয়ে কম্পমান দেখে মহাদেব বললেন। গর্বের ফলে এরা এই গহ্বরে রয়েছে, তুমিও এখানে থাক। তোমরা সকলেই মনুষ্য হয়ে জন্মাবে এবং বহু শত্রু বধ করে আবার ইন্দ্রলোকে ফিরে আসবে।
তখন পূর্ববর্তী চার ইন্দ্র বললেন, ধর্ম বায়ু ইন্দ্র ও অশ্বিনদ্বয় আমাদের মানুষীর গর্ভে উৎপাদন করবেন। বর্তমান ইন্দ্র বললেন, আমি নিজ বীর্যে একজন পুরুষ সৃষ্টি করে তাকেই পঞ্চম ইন্দ্ররূপে পাঠাব। মহাদেব তাতে সম্মত হলেন এবং সেই লোকবাঞ্ছিতা শ্রীরূপিণী রমণীকে মনুষ্যলোকে তাঁদের ভার্যা হবার জন্য আদেশ দিলেন। এই সময়ে নারায়ণ তাঁর একটি কৃষ্ণ এবং একটি শুক্ল কেশ উৎপাটন করলেন। সেই দুই কেশ যদুকুলে গিয়ে দেবকী ও রোহিণীর গর্ভে প্রবিষ্ট হ'ল। শুক্ল কেশ থেকে বলদেব এবং কৃষ্ণ কেশ থেকে কেশব উৎপন্ন হলেন।
এই উপাখ্যান শেষ ক’রে ব্যাস দ্রুপদকে বললেন, মহারাজ, সেই পাঁচ ইন্দ্রই পাণ্ডবরূপে জন্মেছেন এবং তাঁদের ভার্যারূপে নির্দ্দিষ্টা সেই লক্ষ্মী-রূপিণী রমণীই দ্রৌপদী হয়েছেন। আমি আপনাকে দিব্য চক্ষু দিচ্ছি, পাণ্ডবদের পূর্ব্বমূর্ত্তি দেখুন। দ্রুপদ দেখলেন, তাঁরা অনল ও সূর্য্যতুল্য প্রভাবান দিব্যবপুধারী, তাঁদের বক্ষ বিশাল, দেহ দীর্ঘ, মস্তকে স্বর্ণকিরীট ও দিব্য মালা, দেবতার সর্ব্বলক্ষণ তাঁদের দেহে বর্তমান। দ্রুপদ বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে ব্যাসকে প্রণাম করলেন। তখন ব্যাস এক ঋষিকন্যার কথা (১) বললেন যাঁকে মহাদেব বর দিয়েছিলেন — তোমার পঞ্চপতি হবে। ব্যাস আরও বললেন, মানুষের পক্ষে এরূপ বিবাহ বিহিত নয়, কিন্তু এ’রা দেবতার অবতার, মহাদেবের ইচ্ছায় দ্রৌপদী পঞ্চপাণ্ডবের পত্নী হবেন।
তার পর যুধিষ্ঠিরাদি স্নান ও মাঙ্গলিক কার্য্য শেষ ক’রে বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে পুরোহিত ধৌম্যের সঙ্গে বিবাহ সভায় এলেন। যথানিয়মে অগ্নিতে আহুতি দেবার পর যুধিষ্ঠির দ্রৌপদীর পাণিগ্রহণ করলেন। পরবর্ত্তী চার দিনে একে একে অন্য ভ্রাতাদেরও বিবাহ সম্পন্ন হ’ল। প্রত্যেক বার পুনর্বিবাহের পূর্ব্বে ব্রহ্মর্ষি ব্যাস দ্রৌপদীকে এই অলৌকিক বাক্য বলতেন — তুমি আবার কুমারী হও।
পতিশ্চতুবরতা (২) জ্যেষ্ঠ পতিদেবতানজে।
মধ্যমেষু চ পাঞ্চাল্যাস্তিতরং ত্রিতরং বিদুঃ।।
— জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির পাঞ্চালীর পতি ও ভাসুর হলেন, কনিষ্ঠ সহদেব পতি ও দেবর হলেন, এবং মধ্যবর্ত্তী তিন ভ্রাতা প্রত্যেকে পতি ভাসুর ও দেবর হলেন।
পাণ্ডবদের সঙ্গে মিলন হওয়ায় দ্রুপদ সর্ব্ববিধ ভয় থেকে মুক্তিলাভ করলেন। কুন্তী তাঁর পুত্রবধূকে আশীর্ব্বাদ করলেন, তুমি পতিদের আদরিণী, পতিব্রতা ও বীরপুত্রপ্রসবিনী হও। গুণবতী, তুমি পৃথিবীর সকল রত্ন লাভ কর, শত বৎসর সুখে জীবিত থাক। পাণ্ডবদের বিবাহের সংবাদ পেয়ে কৃষ্ণ বহু মণিযুক্তা ও স্বর্ণাভরণ, মহার্ঘ বসন, সালংকারা দাসী, অশ্ব গজ প্রভৃতি উপহার পাঠালেন।