সভাপর্ব: ৪। জরাসন্ধের পূর্ব্ববৃত্তান্ত

কৃষ্ণ বললেন, অর্জ্জুন ভরতবংশের যোগ্য কথা বলেছেন। যুদ্ধ না ক'রে কেউ অমর হয়েছে এমন আমরা শুনি নি। বুদ্ধিমানের নীতি এই, যে অতিপ্রবল শত্রুর সঙ্গে সংগ্রাম করবে না; জরাসন্ধ সম্বন্ধে আমার তাই মত। আমরা ছদ্মবেশে শত্রুগৃহে প্রবেশ করব এবং তাকে একাকী পেলেই অভীষ্ট সিদ্ধ করব। আমাদের আত্মীয় নৃপতিদের মুক্তির জন্য আমরা জরাসন্ধকে বধ করতে চাই, তার ফলে যদি মরি তবে আমাদের স্বর্গলাভ হবে।

যুধিষ্ঠির বললেন, কৃষ্ণ, এই জরাসন্ধ কে? তার কিরূপ পরাক্রম যে অগ্নিতুল্য তোমাকে স্পর্শ ক'রে পতঙ্গের ন্যায় পুড়ে মরে নি? কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, জরাসন্ধ কে এবং আমরা কেন তার বহু উৎপীড়ন সহ্য করেছি তা বলছি শুনুন। বৃহদ্রথ নামে মগধদেশে এক রাজা ছিলেন, তিনি তিন অক্ষৌহিণী সেনার অধিপতি। কাশীরাজের দুই যমজ কন্যাকে তিনি বিবাহ করেন। বৃহদ্রথ তাঁর দুই ভার্যাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, দুজনকেই সমদৃষ্টিতে দেখবেন। রাজার যৌবন গত হ'ল তথাপি তিনি পুত্রলাভ করলেন না। উদারচেতা চণ্ডকৌশিক মুনি রাজাকে একটি মন্ত্রসিদ্ধ আম্রফল দেন, সেই ফল দুই খণ্ড ক'রে দুই রাজপত্নী খেলেন এবং গর্ভবর্তী হয়ে দশম মাসে দুজনে দুই শরীরখণ্ড প্রসব করলেন। তার প্রত্যেকটির এক চক্ষু, এক বাহু, এক পদ এবং অর্ধ মুখ উদর নিতম্ব। রাজ্ঞীরা ভয়ে ও দুঃখে তাঁদের সন্তান পরিত্যাগ করলেন, দুজন ধাত্রী সেই দুই সজীব প্রাণিখণ্ড আবৃত ক'রে বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিলে। সেই সময়ে জরা নামে এক রাক্ষসী সেখানে এল এবং খণ্ড দুটিকে দেখে সদৃশ করবার ইচ্ছায় সংযুক্ত করলে। তৎক্ষণাৎ একটি পূর্ণাঙ্গ বীর কুমার উৎপন্ন হ'ল। রাক্ষসী বিস্ময়ে চক্ষু বিস্ফারিত ক'রে দেখতে লাগল, বজ্রতুল্য গুরুভার শিশুকে সে তুলতে পারলে না। বালক তার তাম্রবর্ণ হাতের মুষ্টি মুখে পুরে সজল মেঘের ন্যায় গর্জন ক'রে কাঁদতে লাগল। সেই শব্দ শুনে রাজা, তাঁর দুই পত্নী, এবং অন্তঃপুরের অন্যান্য লোক সেখানে এলেন। জরা রাক্ষসী নারীমূর্তি ধারণ ক'রে শিশুটিকে কোলে নিয়ে বললে, বৃহদ্রথ, তোমার পুত্রকে নাও, ধাত্রীরা একে ত্যাগ করেছিল, আমি রক্ষা করেছি। তখন দুই কাশীরাজকন্যা বালককে কোলে নিয়ে স্তনদুগ্ধধারায় স্নান করালেন।

রাজা বৃহদ্রথ জিজ্ঞাসা করলেন, আমার পুত্রপ্রদায়িনী কল্যাণী পদ্মকোষবর্ণা, তুমি কে? রাক্ষসী উত্তর দিলে, আমি কামরূপিণী জরা রাক্ষসী, তোমার গৃহে আমি সুখে বাস করছি। গৃহদেবী নামে রাক্ষসী প্রত্যেক মানুষের গৃহে বাস করে, দানববিনাশের জন্য ব্রহ্মা তাদের সৃষ্টি করেছেন। যে লোক ভক্তি ক'রে গৃহদেবীকে ঘরের দেওয়ালে চিত্রিত ক'রে রাখে তার শ্রীবৃদ্ধি হয়। মহারাজ, আমি তোমার গৃহপ্রাচীরে চিত্রিত থেকে গন্ধ পুষ্প ভোজ্যাদির দ্বারা পূজিত হচ্ছি, সেজন্য তোমার প্রত্যুপকার করতে ইচ্ছা করি। এই বলে রাক্ষসী অন্তর্হিত হ’ল। জরা রাক্ষসী সেই কুমারকে সন্ধিত অর্থাৎ যোজিত করেছিল সেজন্য তার নাম জরাসন্ধ হ’ল।

যথাকালে জরাসন্ধকে রাজপদে প্রতিষ্ঠিত ক’রে বৃহদ্রথ তাঁর দুই পত্নীর সঙ্গে তপোবনে চলে গেলেন। চণ্ডকৌশিকের আশীর্বাদে জরাসন্ধ সকল রাজার উপর প্রভুত্ব এবং ত্রিপুরারি মহাদেবকে সাক্ষাৎ দর্শনের শক্তি লাভ করলেন। কংস হংস ও ডিম্ভকের মৃত্যুর পর আমার সঙ্গে জরাসন্ধের প্রবল শত্রুতা হ’ল। তিনি একটা গদা নিরানব্বই বার ঘুরিয়ে গিরিব্রজ থেকে মথুরার অভিমুখে নিক্ষেপ করেন, সেই গদা নিরানব্বই যোজন দূরে পতিত হয়। মথুরার নিকটবর্তী সেই স্থানের নাম গদাবসান।