সভাপর্ব: ৭। রাজসূয় যজ্ঞের আরম্ভ

রাজা যুধিষ্ঠির ধনাগারে ও শস্যগারে সঞ্চিত বস্তুর পরিমাণ জেনে রাজসূয় যজ্ঞে উদ্যোগী হলেন। সেই সময়ে কৃষ্ণ ইন্দ্রপ্রস্থে আসায় যুধিষ্ঠির তাঁকে সম্বর্দ্ধনা ক'রে বললেন, কৃষ্ণ, তোমার প্রসাদেই এই পৃথিবী আমার বশে এসেছে এবং আমি বহু ধনের অধিকারী হয়েছি। এখন আমি তোমার ও ভ্রাতাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে যজ্ঞ করতে ইচ্ছা করি, তুমি অনুমতি দাও; অথবা তুমি নিজেই এই যজ্ঞে দীক্ষিত হও। কৃষ্ণ বললেন, নৃপশ্রেষ্ঠ, আপনিই সম্রাট হবার যোগ্য, অতএব নিজেই এই মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করুন, তাতেই আমরা কৃতার্থ হব। যজ্ঞের জন্য আপনি আমাকে যে কার্যে নিযুক্ত করবেন আমি তাই করব।

যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের সঙ্গে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করতে লাগলেন। ব্যাসদেব ঋত্বিকদের নিয়ে এলেন। সুসামা উদ্‌গাতা হলেন, যাজ্ঞবল্ক্য অধ্বর্যু, ধৌম্য ও পৈল হোতা, এবং স্বয়ং ব্যাস ব্রহ্মা (১) হলেন। শিল্পিগণ বিশাল গৃহ-সমূহ নির্মাণ করলেন। সহদেব নিমন্ত্রণের জন্য সর্বদিকে দূত পাঠালেন। তার পর যথাকালে বিপ্রগণ যুধিষ্ঠিরকে যজ্ঞে দীক্ষিত করলেন। নানা দেশ থেকে আগত রাজারা তাঁদের জন্য নির্মিত আবাসে রাজার অতিথি হয়ে রইলেন। তাঁরা বহুপ্রকার আখ্যায়িকা বলে এবং নট-নর্তকদের নৃত্যাদি উপভোগ করে কালযাপন করতে লাগলেন। সর্বদাই দীয়তাম্ ভুজ্যতাম্ ধ্বনি শোনা যেতে লাগল। যুধিষ্ঠির তাঁদের শতসহস্র ধেনু, শয্যা স্বর্ণ ও দাসী দান করলেন।

(১) ঋত্বিক বিশেষ।

ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র বিদুর দুর্যোধনাদি দ্রোণ কৃপ অশ্বত্থামা, গান্ধার রাজ সুবল, তাঁর পুত্র শকুনি, রথিশ্রেষ্ঠ কর্ণ, মদ্ররাজ শল্য, বাহ্লীকরাজ, সোমদত্ত, ভূরিশ্রবা, সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ, সপুত্রে দ্রুপদ, শাল্বরাজ, সাগরতীরবাসী ম্লেচ্ছগণের সহিত প্রাগ্‌-জ্যোতিষরাজ ভগদত্ত, বৃহদ্বল রাজা, পৌণ্ড্রক বাসুদেব, বঙ্গ কলিঙ্গ মালব অন্ধ্র দ্রবিড় সিংহল কাশ্মীর প্রভৃতি দেশের রাজা, কুন্তিভোজ, সপুত্রে বিরাট রাজা, চৈদ্যরাজ মহাবীর শিশুপাল, বলরাম অনিরুদ্ধ প্রদ্যুম্ন শাম্ব প্রভৃতি বৃষ্ণিবংশীয় বীরগণ, সকলেই রাজসূয় যজ্ঞ দেখতে ইন্দ্রপ্রস্থে এলেন এবং তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট গৃহে সুখে বাস করতে লাগলেন।

ভীষ্ম দ্রোণ প্রভৃতি গুরুজনকে অভিবাদন করে যুধিষ্ঠির বললেন, এই যজ্ঞে আপনারা সর্ববিষয়ে আমাকে অনুগ্রহ করুন। তার পর তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির যোগ্যতা অনুসারে এইপ্রকারে কার্যবিভাগ করে দিলেন।—দুঃশাসন খাদ্যাদ্যের ভার নিলেন, অশ্বত্থামা ব্রাহ্মণগণকে সংবর্ধনা করবেন, সঞ্জয় (২) রাজাদের সেবা করবেন, কোন্ও কার্য করা হবে কি হবে না তা ভীষ্ম ও দ্রোণ স্থির করবেন, কৃপ ধনরত্নের ভার নেবেন এবং দক্ষিণা দেবেন। বাহ্লীক, ধৃতরাষ্ট্র, সোমদত্ত ও জয়দ্রথ প্রভুর ন্যায় বিচরণ করতে লাগলেন। ধর্মজ্ঞ বিদুর ব্যয়ের ভার নিলেন, দুর্যোধন উপহার দ্রব্য (৩) গ্রহণ করতে লাগলেন, উত্তম ফললাভের ইচ্ছায় কৃষ্ণ স্বয়ং ব্রাহ্মণদের চরণ প্রক্ষালনে নিযুক্ত হলেন। যাঁরা যুধিষ্ঠিরের সভায় এসেছিলেন তাঁদের কেউ সহস্র মুদ্রার কম উপহার নিয়ে আসেন নি। নিমন্ত্রিত রাজারা স্পর্দ্ধা ক’রে ধনদান ক’রতে লাগলেন যাতে তাঁদের প্রদত্ত অর্থেই যজ্ঞের ব্যয়নির্বাহ হয়।

(২) ধৃতরাষ্ট্রের সারথি।
(৩) উপহারের বিবরণ ১০-পরিচ্ছেদে আছে।