বনপর্ব: ২৩। সগর রাজা — ভগীরথের গঙ্গানয়ন

যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে লোমশ এই আখ্যান বললেন। — ইক্ষ্বাকুবংশে সগর নামে এক রাজা ছিলেন, তিনি পত্নীদের সঙ্গে কৈলাস পর্বতে গিয়ে পুত্রকামনায় কঠোর তপস্যা করেন। মহাদেবের বরে তাঁর এক পত্নীর গর্ভে ষাট হাজার পুত্র এবং আর এক পত্নীর গর্ভে একটি পুত্র হ’ল। বহুকাল পরে সগর অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করলেন। যজ্ঞের অশ্ব সগরের ষাট হাজার পুত্র কর্তৃক রক্ষিত হয়ে বিচরণ করতে করতে জলশূন্য সমুদ্রের তীরে এসে অন্তর্হিত হয়ে গেল। এই সংবাদ শুনে সগর তাঁর পুত্রদের আদেশ দিলেন, তোমরা সকলে সকল দিকে অপহৃত অশ্বের অন্বেষণ কর। সগরপুত্রগণ যজ্ঞাশ্ব কোথাও না পেয়ে সমুদ্র খনন করতে লাগলেন, অসুর নাগ রাক্ষস এবং অন্যান্য অসংখ্য প্রাণী নিহত হ’ল। অবশেষে তাঁরা সমুদ্রের উত্তরপূর্ব দেশ বিদীর্ণ ক’রে পাতালে গিয়ে সেই অশ্ব এবং তার নিকটে তেজোরাশির ন্যায় দীপ্যমান মহাত্মা কপিলকে দেখতে পেলেন। সগরপুত্রগণ চোর মনে ক’রে কপিলের প্রতি সক্রোধে ধাবিত হলেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টির তেজে তখনই ভস্ম হয়ে গেলেন।

সগর রাজার দ্বিতীয় পত্নী শৈব্যার গর্ভে জাত পুত্রের নাম অসমঞ্জা। ইনি দুর্বল বালকদের ধরে ধরে নদীতে ফেলে দিতেন সেজন্য সগর তাঁকে নির্বাসিত করেন। অসমঞ্জার পুত্রের নাম অংশুমান। নারদের নিকট ষাট হাজার পুত্রের মৃত্যুসংবাদ শুনে সগর শোকে সন্তপ্ত হয়ে পৌত্র অংশুমানকে বললেন, তুমি যজ্ঞাশ্ব খুঁজে নিয়ে এসে আমাদের নরক থেকে উদ্ধার কর। অংশুমান পাতালে গিয়ে কপিলকে প্রণাম ক’রে যজ্ঞাশ্ব ও পিতৃগণের তর্পণের জন্য জল চাইলেন। কপিল প্রসন্ন হয়ে বললেন, তুমি অশ্ব নিয়ে গিয়ে সগরের যজ্ঞ সমাপ্ত কর। তোমার পিতৃগণের উদ্ধারের জন্য তোমার পৌত্র মহাদেবকে তুষ্ট ক’রে স্বর্গ থেকে গঙ্গা আনবেন।

অংশুমান ফিরে এলে সগরের যজ্ঞ সমাপ্ত হল, তিনি সমুদ্রকে নিজের পুত্ররূপে (১) কল্পনা করলেন। সগর স্বর্গারোহণ করলে অংশুমান রাজা হলেন। তাঁর পুত্র দিলীপ, দিলীপের পুত্র ভগীরথ। ভগীরথ রাজ্যলাভ করে মন্ত্রীদের উপর রাজকার্যের ভার দিয়ে হিমালয়ে গিয়ে গঙ্গার আরাধনা করতে লাগলেন। সহস্র দিব্য বৎসর অতীত হলে গঙ্গা মূর্তিমতী হয়ে দেখা দিলেন। ভগীরথ তাঁকে বললেন, আমার পূর্বপুরুষ ষাট হাজার সগরপুত্র কপিলের শাপে ভস্মীভূত হয়েছেন, আপনি তাঁদের দেহাবশেষ জলসিক্ত করুন তবে তাঁরা স্বর্গে যেতে পারবেন। গঙ্গা বললেন, মহারাজ, তোমার প্রার্থনা পূর্ণ করব, এখন তুমি মহাদেবকে তপস্যায় তুষ্ট করে এই বর চাও, যেন পতনকালে আমাকে তিনি মস্তকে ধারণ করেন। ভগীরথ কৈলাস পৰ্বতে গিয়ে কঠোর তপস্যায় মহাদেবকে তুষ্ট করলেন, মহাদেব গঙ্গাকে ধারণ করতে সম্মত হলেন।

(১) ষাট হাজার সন্তানের ভস্মের আধার এজন্য সমুদ্র সগরের পুত্ররূপে কল্পিত এবং 'সাগর' নামে খ্যাত।

ভগীরথ প্রণত হয়ে সংযতচিত্তে গঙ্গাকে স্মরণ করলেন। হিমালয়কন্যা পুণ্যতোয়া গঙ্গা মৎস্যাদি জলজন্তু সহিত গগনমেখলার ন্যায় মহাদেবের ললাটে পতিত হলেন এবং ত্রিধা বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হতে লাগলেন। ভগীরথ তাঁকে পথ দেখিয়ে সগরসন্তানগণের ভস্মরাশির নিকট নিয়ে গেলেন। গঙ্গার পবিত্র জলে সিক্ত হয়ে সগরসন্তানগণ উদ্ধার লাভ করলেন, সমুদ্র পুনর্বার জলপূর্ণ হল, ভগীরথ গঙ্গাকে নিজ দুহিতারূপে কল্পনা করলেন।