বনপর্ব: ৩৩। ভীমের পদ্মসংগ্রহ
ভীম গন্ধমাদনের উপর দিয়ে হনুমানের প্রদর্শিত পথে যাত্রা করলেন। দিনশেষে তিনি বনমধ্যে হংস কারণ্ডব ও চক্রবাকে সমাকীর্ণ একটি বৃহৎ নদী দেখতে পেলেন, তার জল অতি নির্মল এবং পরম সুন্দর স্বর্ণময় দিব্য পদ্মে আচ্ছন্ন। এই নদী কৈলাশশিখর ও কুবেরভবনের নিকটবর্তী, ক্রোধবশ নামক রাক্ষসগণ তা রক্ষা করে। মৃগচর্মধারী স্বর্ণাঙ্গদভূষিত ভীম নিঃশঙ্কচিত্তে খড়্গহস্তে পদ্ম নিতে আসছেন দেখে রাক্ষসগণ তাঁকে প্রশ্ন করলে, মুনিবেশধারী অথচ সশস্ত্র কে তুমি? ভীম তাঁর পরিচয় দিয়ে জানালেন যে তিনি দ্রৌপদীর জন্য পদ্ম নিতে এসেছেন। রাক্ষসরা বললে, এখানে কুবের ক্রীড়া করেন, মানুষ এখানে আসতে পারে না। যক্ষরাজের অনুমতি না নিয়ে যে আসে সে বিনষ্ট হয়। তুমি ধর্মরাজের ভ্রাতা হয়ে সবলে পদ্ম হরণ করতে এসেছ কেন? ভীম বললেন, যক্ষপতি কুবেরকে তো এখানে দেখছি না, আর তাঁর দেখা পেলেও আমি অনুমতি চাইতে পারি না, কারণ ক্ষত্রিয়রা প্রার্থনা করেন না, এই সনাতন ধর্ম। তা ছাড়া এই নদীর উৎপত্তি পর্বতনির্ঝর থেকে, কুবেরভবনে নয়, সকলেরই এতে সমান অধিকার।
নিষেধ অগ্রাহ্য ক'রে ভীম জলে নামছেন দেখে রাক্ষসরা তাঁকে মারবার জন্য ধাবিত হ'ল। শতাধিক রাক্ষস ভীমের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হ'ল, আর সকলে কৈলাস পর্বতে পালিয়ে গেল। ভীম তখন নদীতে নেমে 'অমৃততুল্য' জল পান করলেন এবং পদ্মসমূহ উৎপাটন ক'রে অনেক পদ্ম সংগ্রহ করলেন। পরাজিত রাক্ষসদের কাছে সমস্ত শুনে কুবের হেসে বললেন, আমি সব জানি, কৃষ্ণার জন্য ভীম ইচ্ছামত পদ্ম নিন।
সেই সময়ে বদরিকাশ্রমে বালকায়ুর খরস্পর্শ বায়ু বহিতে লাগিল, উল্কাপাত হ’ল, এবং অন্যান্য দুর্লক্ষণ দেখা গেল। বিপদের আশঙ্কায় যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করিলেন, ভীম কোথায়? দ্রৌপদী জানাইলেন যে ভীম তাঁর অনুরোধে পদ্ম আনতে গেছেন। যুধিষ্ঠির বললেন, আমরাও শীঘ্র সেখানে যাব। তখন ঘটোৎকচ তাঁর অনুচরদের সাহায্যে যুধিষ্ঠিরাদি, দ্রৌপদী, লোমশ ও অন্যান্য ব্রাহ্মণদের বহন ক’রে ভীমের নিকট উপস্থিত হলেন। যুধিষ্ঠির দেখলেন, অনেক যক্ষ নিহত হয়ে পড়ে আছে, ক্রুদ্ধ ভীম সঘৃণনয়নে ওষ্ঠ দংশন ক’রে গদা তুলে নদীতীরে দাঁড়িয়ে আছেন। যুধিষ্ঠির বললেন, ভীম, একি করেছ? এতে দেবতারা অসন্তুষ্ট হবেন আর এমন ক’রো না। সেই সময়ে উদ্যানরক্ষকগণ এসে সকলকে প্রণাম করলে। যুধিষ্ঠির সেই রাক্ষসদের সান্ত্বনা দিলে তারা কুবেরের কাছে ফিরে গেল।
পাণ্ডবগণ অর্জুনের প্রতীক্ষায় গন্ধমাদনের সেই সানুদেশে কিছুকাল সুখে যাপন করলেন। তার পর একদিন যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের বললেন, মহাত্মা লোমশ আমাদের বহু তীর্থ দেখিয়েছেন, বিশালা বদরী এবং এই দিব্য নদীও আমরা দেখেছি, এখন কোন্ উপায়ে আমরা কুবেরভবনে যাব তা ভেবে দেখ। এই সময়ে আকাশবাণী হ’ল—এখান থেকে কেউ সেখানে যেতে পারে না। আপনি বদরিকাশ্রমে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে বৃষপর্বার আশ্রম হয়ে আর্ষ্টিষেণের আশ্রমে যান তা হলে কুবেরভবন দেখতে পাবেন। আকাশবাণী শুনে সকলে বদরিকায় ফিরে গেলেন।