বনপর্ব: ৫২। দ্রৌপদীহরণ
একদিন পঞ্চপাণ্ডব মহর্ষি ধৌম্যের অনুমতি নিয়ে দ্রৌপদীকে আশ্রমে রেখে বিভিন্ন দিকে মৃগয়া করতে গেলেন। সেই সময়ে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ কাম্যকবনে উপস্থিত হলেন। তিনি বিবাহকামনায় শাল্বরাজ্যে যাচ্ছিলেন, অনেক রাজা তাঁর সহযাত্রী ছিলেন। দ্রৌপদীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি তাঁর সঙ্গী রাজা কোটিকাস্যকে বললেন, এই অনবদ্যঙ্গী কে? একে পেলে আমার আর বিবাহের প্রয়োজন নেই। সৌম্য, তুমি জেনে এস ইনি কে, এঁর রক্ষক কে। এই বরারোহা সুন্দরী কি নামকে ভজনা করবেন?
শৃগাল যেমন ব্যাঘ্রবধূর কাছে যায় সেইরূপ কোটিকাশ্য দ্রৌপদীর কাছে গিয়ে বললেন, সুতন্বী, কদম্বতরুর একটি শাখা নুইয়ে দীপ্যমতী অগ্নিশিখার ন্যায় কে তুমি একাকিনী দাঁড়িয়ে আছ? তুমি কার কন্যা, কার পত্নী? এখানে কি করছ? আমি সুরথ রাজার পুত্র কোটিকাশ্য। বার জন রথারোহী রাজপুত্র এবং বহু হস্তী অশ্ব ও পদাতি যাঁর অনুগমন করছেন তিনি সৌবীররাজ জয়দ্রথ। আরও অনেক রাজা ও রাজপুত্র তাঁর সঙ্গে আছেন। দ্রৌপদী বললেন, এখানে আর কেউ নেই, অগত্যা আমিই আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। আমি দ্রুপদরাজকন্যা কৃষ্ণা, ইন্দ্রপ্রস্থবাসী পাণ্ডবগণ আমার স্বামী, তাঁরা এখন মৃগয়া করতে গেছেন। আপনারা যানবাহন থেকে নেমে আসুন, অতিথিপ্রিয় ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির আপনাদের দেখে প্রীত হবেন।
কোটিকাশ্যের কথা শুনে জয়দ্রথ বললেন, আমি সত্য বলছি, এই নারীকে দেখে মনে হচ্ছে অন্য নারীরা বানরী। এই বলে তিনি ছয় জন সহচরের সঙ্গে আশ্রমে প্রবেশ করে দ্রৌপদীকে কুশলপ্রশ্ন করলেন। দ্রৌপদী পাদ্য ও আসন দিয়ে বললেন, নৃপকুমার, আপনাদের প্রাতরাশের জন্য আমি পঞ্চাশটি মৃগ দিচ্ছি, যুধিষ্ঠির এলে আরও বহুপ্রকার মৃগ শরভ শশ রুরু শম্বর গবয় বরাহ মহিষ প্রভৃতি দেবেন। জয়দ্রথ বললেন, তুমি আমাকে প্রাতরাশ দিতে স্বীকার করছ তা ভাল। এখন আমার রথে ওঠ, রাজ্যচ্যুত শ্রীহীন দীন পাণ্ডবদের জন্য তোমার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। তুমি আমার ভার্যা হও, সিন্ধু-সৌবীর রাজ্য ভোগ কর।
ক্রোধে আরক্তমুখে ভ্রুকুটি করে দ্রৌপদী বললেন, মূঢ়, যশস্বী মহারথ পাণ্ডবদের নিন্দা করতে তোমার লজ্জা হয় না? কুক্কুরতুল্য লোকেই এমন কথা বলে। তুমি নিদ্রিত সিংহ আর তীক্ষ্ণবিষ সর্পকে পদাঘাত করতে ইচ্ছা করছ। জয়দ্রথ বললেন, কৃষ্ণা, পাণ্ডবরা কেমন তা আমি জানি, তুমি আমাদের ভয় দেখাতে পারবে না, এখন সত্বর এই হস্তীতে বা এই রথে ওঠ; অথবা দীনবাক্যে আমার অনুগ্রহ ভিক্ষা কর। দ্রৌপদী বললেন, আমি অবলা নই, সৌবীররাজের কাছে দীনবাক্য বলব না। গ্রীষ্মকালে শুষ্ক তৃণরাশির মধ্যে অগ্নির ন্যায় অর্জুন তোমার সৈন্যমধ্যে প্রবেশ করবেন, অন্ধক ও বৃষ্ণি বংশীয় বীরগণের সঙ্গে জনার্দন আমার অনুসরণ করবেন। তুমি যখন অর্জুনের বাণবর্ষণ, ভীমের গদাঘাত এবং নকুল-সহদেবের ক্রোধ দেখবে তখন নিজ বুদ্ধির নিন্দা করবে।
জয়দ্রথ ধরতে এলে দ্রৌপদী তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন এবং পুরোহিত ধৌম্যকে ডাকতে লাগলেন। জয়দ্রথ ভূমি থেকে উঠে দ্রৌপদীকে সবলে রথে তুললেন। ধৌম্য এসে বললেন, জয়দ্রথ, তুমি ক্ষত্রিয়ের ধর্ম পালন কর, মহাবল পাণ্ডবদের পরাজিত না ক'রে তুমি এঁকে নিয়ে যেতে পার না। এই নীচ কর্ম্মের ফল তোমাকে নিশ্চয়ই ভোগ করতে হবে। এই ব'লে ধৌম্য পদাতি সৈন্যের সঙ্গে মিশে দ্রৌপদীর পশ্চাতে চললেন।