বিরাটপর্ব: ৯। উপকীচকবধ — দ্রৌপদী ও বৃহন্নলা

কীচকের বান্ধবরা মৃতদেহ বেষ্টন ক'রে কাঁদতে লাগল। স্থলে উদ্ধৃত কচ্ছপের ন্যায় একটা পিণ্ড দেখে তারা ভয়ে রোমাঞ্চিত হ’ল। সূতপুত্রগণ (১) যখন অন্ত্যেষ্টির জন্য মৃতদেহ বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তারা দেখলে অদূরে একটা স্তম্ভ ধ'রে দ্রৌপদী দাঁড়িয়ে আছেন। উপকীচকরা বললে, ওই অসতীটাকে কীচকের সঙ্গে দগ্ধ কর, ওর জন্যই তিনি হত হয়েছেন। তারা বিরাটের কাছে গিয়ে অনুমতি চাইলে তিনি সম্মত হলেন, কারণ কীচকের বান্ধবরাও পরাক্রান্ত।

(১) এরা কীচকের ভ্রাতৃসম্পর্কীয় বা উপকীচক।

উপকীচকগণ দ্রৌপদীকে বেঁধে শ্মশানে নিয়ে চলল। তিনি উচ্চস্বরে বললেন, জয় জয়ন্ত বিজয় জয়সেন জরাদ্ বল শোন, মহাবীর গন্ধর্ব্বগণ শোন — সূতপুত্রগণ আমাকে দাহ করতে নিয়ে যাচ্ছে। ভীম সেই আহ্বান শুনে তখনই শয্যা থেকে উঠে বললেন, সৈরিন্ধ্রী, ভয় নেই। তিনি বেশ পরিবর্তন ক’রে অন্যদ্বার দিয়ে নির্গত হয়ে প্রাচীর লঙ্ঘন ক’রে সূতগণের সম্মুখীন হলেন। চিতার নিকটে একটি শুষ্ক বৃহৎ বৃক্ষ দেখে তিনি উৎপাটন ক’রে স্কন্ধে নিলেন এবং দণ্ডপাণি কৃতান্তের ন্যায় ধাবিত হলেন। তাঁকে দেখে উপকীচকরা ভয় পেয়ে বললে, ক্রুদ্ধ গন্ধর্ব্ব বৃক্ষ নিয়ে আসছে, সৈরিন্ধ্রীকে শীঘ্র মুক্তি দাও। তারা দ্রৌপদীকে ছেড়ে দিয়ে রাজধানীর দিকে পালাতে গেল, সেই এক শ পাঁচজন উপকীচককে ভীম যমালয়ে পাঠালেন।

তার পর তিনি দ্রৌপদীকে বললেন, কৃষ্ণা, আর ভয় নেই, তুমি রাজভবনে ফিরে যাও, আমিও অন্য পথে পাকশালায় যাচ্ছি।

প্রাতঃকালে মৎস্যদেশের নরনারীগণ সেনাপতি কীচক ও তাঁর এক শ পাঁচজন বান্ধব নিহত হয়েছে দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হ’ল। তারা রাজার কাছে গিয়ে সেই সংবাদ দিয়ে বললে, সৈরিন্ধ্রী আবার আপনার ভবনে এসেছে; সে রূপবতী সেজন্য পুরুষরা তাকে কামনা করবে, গন্ধর্বরাও মহাবল। মহারাজ, সৈরিন্ধ্রীর দোষে যাতে আপনার রাজধানী বিনষ্ট না হয় তার ব্যবস্থা করুন।

কীচক ও উপকীচকদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য আদেশ দিয়ে বিরাট সুদেষ্ণাকে বললেন, তুমি সৈরিন্ধ্রীকে এই কথা বল—সুন্দরী, তুমি এখান থেকে যেখানে ইচ্ছা হয় চলে যাও; রাজা গন্ধর্বদের ভয় করেন, তিনি নিজে এ কথা তোমাকে বলতে পারেন না, সেজন্য আমি বলছি।

মুক্তিলাভের পর দ্রৌপদী তাঁর গাত্র ও বস্ত্র ধৌত ক’রে রাজধানীর দিকে চললেন, তাঁকে দেখে লোকে গন্ধর্বের ভয়ে ত্রস্ত হয়ে পালাতে লাগল। পাকশালার নিকটে এসে ভীমসেনকে দেখে দ্রৌপদী সহাস্যে বললেন, গন্ধর্বরাজকে নমস্কার, যিনি আমাকে মুক্ত করেছেন। ভীম উত্তর দিলেন, এই নগরে যে পুরুষরা আছেন তাঁরা এখন তোমার কথা শুনে ঋণমুক্ত হলেন।

তার পর দ্রৌপদী দেখলেন, নৃত্যশালায় অর্জুন কন্যাদের নৃত্য শেখাচ্ছেন। কন্যারা বললে, সৈরিন্ধ্রী, ভাগ্যক্রমে তুমি মুক্তিলাভ করেছ এবং তোমার অনিষ্টকারী কীচকগণ নিহত হয়েছে। অর্জুন বললেন, তুমি কি ক’রে মুক্ত হ’লে, সেই পাপীরাই বা কি ক’রে নিহত হ’ল তা সবিস্তারে শুনতে ইচ্ছা করি। দ্রৌপদী বললেন, বৃহন্নলা সৈরিন্ধ্রীর কথায় তোমার কি প্রয়োজন? তুমি তো কন্যাদের মধ্যে সুখে আছ, আমার ন্যায় দুঃখভোগ কর না। অর্জুন বললেন, কল্যাণী, বৃহন্নলাও মহাদুঃখ ভোগ করছে, সে এখন পশুতুল্য হয়ে গেছে তা তুমি বুঝছ না। আমরা এক স্থানেই বাস করি, তুমি কষ্ট পেলে কে না দুঃখিত হয়?

দ্রৌপদী কন্যাদের সঙ্গে সুদেষ্ণার কাছে গেলেন। রাজার আদেশ অনুসারে সুদেষ্ণা বললেন, সৈরিন্ধ্রী, তুমি শীঘ্র যেখানে ইচ্ছা হয় চলে যাও। তুমি যুবতী ও রূপে অনুপমা, রাজাও গন্ধর্বদের ভয় করেন। দ্রৌপদী বললেন, আর তের দিনের জন্য আমাকে ক্ষমা করুন, তার পর আমার গন্ধর্ব পতিগণ তাদের কর্ম সমাপ্ত ক’রে আমাকে নিয়ে যাবেন, আপনাদেরও সকলের মঙ্গল করবেন।