দ্রোণপর্ব: ২২। অশ্বত্থামার নারায়ণান্ত্রমোচন

(পঞ্চদশ দিনের যুদ্ধবৃত্তান্ত)

প্রলয়কালে যমের ন্যায় অশ্বত্থামা পাণ্ডবসৈন্য সংহার করতে লাগলেন। তাঁর নারায়ণান্ত্র থেকে সহস্র সহস্র দীপ্যমান সর্পের ন্যায় বাণ এবং লৌহগোলক শতঘ্নী শূল গদা ও খরধার চক্র নির্গত হ’ল, পাণ্ডবসৈন্য তৃণরাশির ন্যায় দগ্ধ হ’তে লাগল। সৈন্যগণ জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাচ্ছে এবং অর্জুন উদাসীন হয়ে আছেন দেখে যুধিষ্ঠির বললেন, ধৃষ্টদ্যুম্ন, তুমি পাঞ্চাল সৈন্য নিয়ে পালাও; সাত্যকি, তুমি বৃষ্ণি-অন্ধক সৈন্য নিয়ে গৃহে চলে যাও; ধর্মাত্মা বাসুদেব যা কর্তব্য মনে করেন করবেন। আমি সকল সৈন্যকে বলছি — যুদ্ধ করো না, আমি ভ্রাতাদের সঙ্গে অগ্নিপ্রবেশ করব। ভীষ্ম ও দ্রোণ রূপ দুস্তর সাগর পার হয়ে এখন আমরা অশ্বত্থামা রূপ গোষ্পদে নিমজ্জিত হব। আমি শুভাকাঙ্ক্ষী আচার্যকে নিপাতিত করেছি, অতএব অর্জুনের ইচ্ছা পূর্ণ হোক। এই দ্রোণ যুদ্ধে অপটু বালক অভিমন্যুকে হত্যা করেছেন; দ্যুতসভায় নিগৃহীত দ্রৌপদীর রোদন শুনে নীরব ছিলেন; পরিত্রাতা অর্জুনকে মারবার জন্য দুর্যোধন যখন যুদ্ধে যান তখন ইনিই তাঁর দেহে অক্ষয় কবচ বেঁধে দিয়েছিলেন; ব্রহ্মাস্ত্র অনভিজ্ঞ পাঞ্চালগণকে ইনি ব্রহ্মাস্ত্র দিয়ে নিপাতিত করেছিলেন; কৌরবগণ যখন আমাদের নির্বাসিত করে তখন ইনি আমাদের যুদ্ধ করতে দেন নি, আমাদের সঙ্গে বনেও যান নি। আমাদের সেই পরম সুহৃৎ দ্রোণাচার্য নিহত হয়েছেন, অতএব আমরাও সবান্ধবে প্রাণত্যাগ করব।

কৃষ্ণ সত্বর এসে দুই হাত তুলে সৈন্যগণকে বললেন, তোমরা শীঘ্র অস্ত্রত্যাগ কর, বাহন থেকে নেমে পড়, নারায়ণাস্র নিবারণের এই উপায়। ভীম বললেন, কেউ অস্ত্রত্যাগ ক’রো না, আমি শরাঘাতে অশ্বত্থামার অস্ত্র নিবারিত করব। এই ব’লে তিনি রথারোহণে অশ্বত্থামার দিকে ধাবিত হলেন। অশ্বত্থামাও হাস্যমুখে অভিভাষণ ক’রে অনলোৎসারী বাণে ভীমকে আচ্ছন্ন করলেন।

পাণ্ডবসৈন্য অস্ত্র পরিত্যাগ ক’রে হস্তী অশ্ব ও রথ থেকে নেমে পড়ল, তখন অশ্বত্থামার নারায়ণাস্র কেবল ভীমের দিকে যেতে লাগল। কৃষ্ণ ও অর্জুন সত্বর রথ থেকে নেমে ভীমের কাছে গেলেন। কৃষ্ণ বললেন, পাণ্ডুপুত্র, এ কি করছেন? বারণ করলেও রথ থেকে নিবৃত্ত হচ্ছেন না কেন? যদি আজ জয়ী হওয়া সম্ভবপর হত তবে আমরা সকলেই যুদ্ধ করতাম। দেখুন, পাণ্ডবপক্ষের সকলেই রথ থেকে নেমেছেন। এই ব’লে কৃষ্ণ ও অর্জুন সবলে ভীমকে রথ থেকে নামালেন এবং তাঁর অস্ত্র কেড়ে নিলেন। ভীম ক্রোধে রক্তনয়ন হয়ে সর্পের ন্যায় নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন, নারায়ণাস্রও নিবৃত্ত হ’ল।

হতাবশিষ্ট পাণ্ডবসৈন্য আবার যুদ্ধে উদ্যত হয়েছে দেখে দুর্যোধন বললেন, অশ্বত্থামা, আবার অস্ত্র প্রয়োগ কর। অশ্বত্থামা বিষণ্ণ হয়ে বললেন, রাজা, এই নারায়ণাস্র দ্বিতীয়বার প্রয়োগ করলে প্রয়োগকারীকেই বধ করে। নিশ্চয় কৃষ্ণ পাণ্ডবগণকে এই অস্ত্র নিবারণের উপায় বলেছেন, নতুবা আজ সমস্ত শত্রু ধ্বংস হ’ত। তখন দুর্যোধনের অনুরোধে অশ্বত্থামা অন্য অস্ত্র নিয়ে আবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন এবং ধৃষ্টদ্যুম্ন ও সাত্যকিকে পরাস্ত ক’রে মালবরাজ সুদর্শন, পদ্রুদেশের বৃষকেতু ও চেদি দেশের মদ্ররাজকে বধ করলেন। তার পর তিনি অর্জুনের দিকে ভয়ংকর আগ্নেয়াস্ত্র নিক্ষেপ করলেন, অর্জুন ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ ক’রে অশ্বত্থামার অস্ত্র ব্যর্থ ক’রে দিলেন।

এই সময়ে শিষ্যজালপরিবৃত সর্ববেদের আধার সাক্ষাৎ ধর্ম সদৃশ মহর্ষি ব্যাস আবির্ভূত হলেন। অশ্বত্থামা কাতর হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন; ভগবান, আমার অস্ত্র মিথ্যা হ’ল কেন? কৃষ্ণার্জুনের মায়ার না দৈব ঘটনায় এমন হ’ল? কৃষ্ণ ও অর্জুন মানুষ হয়ে আমার অস্ত্র থেকে কি ক’রে নিস্তার পেলেন?

ব্যাসদেব বললেন, স্বয়ং নারায়ণ মায়ার দ্বারা জগৎ মোহিত ক’রে কৃষ্ণরূপে বিচরণ করছেন। তাঁর তপস্যার ফলে তাঁরই তুল্য নর-ঋষি জন্মেছিলেন, অর্জুন সেই নরের অবতার। অশ্বত্থামা, তুমিও রুদ্রের অংশে জন্মেছ। কৃষ্ণ অর্জুন ও তোমার অনেক জন্ম হয়ে গেছে, তোমরা বহু কর্ম যোগ ও তপস্যা করেছ, যুগে যুগে কৃষ্ণার্জুন শিবলিঙ্গের পূজা করেছেন, তুমি শিবপ্রতিমার পূজা করেছ। কৃষ্ণ রুদ্রের ভক্ত এবং রুদ্র হতেই তাঁর উৎপত্তি।

ব্যাসের বাক্য শুনে অশ্বত্থামা রুদ্রকে নমস্কার করলেন এবং কেশবের প্রতি শ্রদ্ধাবান হলেন। তিনি রোমাঞ্চিতদেহে মহর্ষি ব্যাসকে অভিবাদন ক'রে কৌরবগণের নিকট ফিরে গেলেন। সে দিনের যুদ্ধ শেষ হ'ল।