স্ত্রীপর্ব: ২। ভীষ্মের লৌহমূর্ত্তি

ব্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্রের কাছে এসে বহু সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তুমি শোকে অভিভূত হয়ে বার বার মূর্ছিত হচ্ছ জানলে যুধিষ্ঠিরও দুঃখে প্রাণত্যাগ করতে পারেন। তিনি সকল প্রাণীকে কৃপা করেন, তোমাকে করবেন না কেন? বিধির বিধানের প্রতিকার নেই এই বুঝে আমার আদেশে এবং পাণ্ডবদের দুঃখ বিবেচনা ক’রে তুমি প্রাণধারণ কর, তাতেই তোমার কীর্তি ধর্ম ও তপস্যা হবে। প্রজ্বলিত অগ্নির ন্যায় যে পুত্রশোক উৎপন্ন হয়েছে, প্রজ্ঞারূপ জল দিয়ে তাকে নির্বাপিত কর। এই ব’লে ব্যাসদেব প্রস্থান করলেন।

ধৃতরাষ্ট্র শোক সংবরণ ক’রে গান্ধারী, কুন্তী এবং বিধবা বধূদের নিয়ে বিদুরের সঙ্গে হস্তিনাপুর থেকে যাত্রা করলেন। সহস্র সহস্র নারী কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের সঙ্গে চলল। এক ক্রোশ গিয়ে তাঁরা কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মাকে দেখতে পেলেন। কৃপাচার্য জানালেন যে ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রৌপদীর পঞ্চ পুত্র প্রভৃতি সকলেই নিহত হয়েছেন। তার পর কৃপাচার্য হস্তিনাপুরে, কৃতবর্মা নিজের দেশে, এবং অশ্বত্থামা ব্যাসের আশ্রমে চ’লে গেলেন।

ধৃতরাষ্ট্র হস্তিনাপুর থেকে নির্গত হয়েছেন শুনে যুধিষ্ঠিরাদি, কৃষ্ণ, সাত্যকি ও যদুবংশীয় তদ্ অনুগমন করলেন। দ্রৌপদী ও পাঞ্চালবধূগণও সঙ্গে চললেন। পাণ্ডবগণ প্রণাম করলে ধৃতরাষ্ট্র অপ্রীতমনে যুধিষ্ঠিরকে আলিঙ্গন করলেন এবং ভীমকে খুঁজতে লাগলেন। অন্ধরাজের দুষ্ট অভিসন্ধি বুঝে কৃষ্ণ তাঁর হাত দিয়ে ভীমকে সরিয়ে দিলেন এবং ভীমের লৌহময় মূর্তি ধৃতরাষ্ট্রের সম্মুখে রাখলেন। অদ্ভুত হস্তীর ন্যায় বলবান ধৃতরাষ্ট্র সেই লৌহমূর্তি আলিঙ্গন ক'রে ভেঙে ফেললেন। বক্ষে চাপ লাগার ফলে তাঁর মুখ থেকে রক্তপাত হ'ল, তিনি ভূমিতে পড়ে গেলেন; তখন সঞ্জয় তাঁকে ধরে তুললেন। ধৃতরাষ্ট্র সরোদনে উচ্চস্বরে বললেন, হা হা ভীম!

কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, শোক করবেন না, আপনি ভীমকে বধ করেন নি, তাঁর প্রতিমূর্তিই চূর্ণ করেছেন। দুর্যোধন ভীমের যে লৌহমূর্তি নির্মাণ করিয়েছিলেন তাই আমি আপনার সম্মুখে রেখেছিলাম। আপনার মন ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে তাই আপনি ভীমসেনকে বধ করতে চান; কিন্তু তাঁকে মারলেও আপনার পুত্রেরা বেঁচে উঠবেন না। আপনি বেদ ও বিবিধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন পুরাণ ও রাজধর্মও শুনেছেন, তবে স্বয়ং অপরাধী হয়ে এরূপ ক্রোধ করেন কেন? আপনি আমাদের উপদেশ শোনেন নি, দুর্যোধনের বশে চলে বিপদে পড়েছেন।

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, মাধব, তোমার কথা সত্য, পুত্রস্নেহই আজকে ধৈর্যচ্যুত করেছিল। আমার ক্রোধ এখন দূর হয়েছে, আমি মধ্যম পাণ্ডবকে স্পর্শ করতে ইচ্ছা করি। আমার পুত্রেরা নিহত হয়েছে, এখন পাণ্ডুর পুত্রেরা ই আমার স্নেহের পাত্র। এই ব’লে ধৃতরাষ্ট্র ভীম প্রভৃতিকে আলিঙ্গন ও কুশলপ্রশ্ন করলেন।