আশ্রমবাসিকপর্ব: ৯। জনমেজয়ের যজ্ঞে পরীক্ষিৎ — পাণ্ডবগণের প্রস্থান

জনমেজয় তাঁর পূর্বপুরুষদের এই পুনরাগমনের বিবরণ শুনে বললেন, যাঁরা দেহ ত্যাগ করেছেন তাঁদের দর্শনলাভ কি ক'রে সম্ভবপর হ'ল? ব্যাসশিষ্য বৈশম্পায়ন উত্তর দিলেন, মহারাজ, মানুষের কর্ম থেকেই শরীর উৎপন্ন হয়। শরীরের উপাদান মহাভূতসমূহ, ভূতধিপতি মহেশ্বরের অধিষ্ঠানের ফলে দেহ নষ্ট হ'লেও মহাভূত নষ্ট হয় না, জীবাত্মা মহাভূতকে ত্যাগ করেন না, মহাভূত আশ্রয় ক'রে তিনি পূর্বরূপে প্রকাশিত হ'তে পারেন।

তার পর বৈশম্পায়ন বললেন, জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র পূর্বে তাঁর পুত্রদের কখনও দেখেন নি, ব্যাসদেবের প্রসাদেই তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। জনমেজয় বললেন, বরদাতা ব্যাসদেব যদি আমার পিতাকে দেখান তবে আপনার বাক্যে আমার শ্রদ্ধা হবে, আমি প্রীত ও কৃতার্থ হব। ব্যাসের প্রসাদে আমার অভিলাষ পূর্ণ হ'ক। জনমেজয় এইরূপ বললে ব্যাসের তপস্যার প্রভাবে পরীক্ষিৎ তাঁর পূর্বের বয়সে ও রূপে অমাত্যগণ সহ আবির্ভূত হলেন, তাঁর সঙ্গে মহাত্মা শমীক (১) ও শৃঙ্গীও এলেন।

(১) আদিপর্ব ৮-পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

জনমেজয় অতিশয় আনন্দিত হলেন এবং যজ্ঞসমাপন ও যজ্ঞান্তস্নানের পর জরৎকারুপুত্র আস্তীককে বললেন, আমার এই যজ্ঞ অতি আশ্চর্য; আমি পিতার দর্শন পেয়েছি, তাঁর আগমনে আমার শোক দূর হয়েছে। আস্তীক বললেন, মহারাজ, যার যজ্ঞে মহর্ষি দ্বৈপায়ন উপস্থিত থাকেন তিনি ইহলোক ও পরলোক জয় করেছেন। পাণ্ডুর বংশধর, তুমি বিচিত্র আখ্যান শুনেছ, পিতাকে দেখেছ, সর্পসকল ভস্মসাৎ হয়েছে, তোমার সত্যবাক্যের ফলে তক্ষকও মুক্তিলাভ করেছেন। তুমি ঋষিদের পূজা করেছ, সাধুজনের সহিত মিলিত হয়েছ, এবং পাপনাশক মহাভারত শুনেছ; এর ফলে তোমার বিপুল ধর্ম লাভ হয়েছে।

বৈশম্পায়ন বলতে লাগলেন। — সকলে গঙ্গাতীর হতে আশ্রমে ফিরে এলে ব্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন, তুমি ধর্মজ্ঞ ঋষিদের মুখে বিবিধ উপদেশ শুনেছ, সদ্গতিপ্রাপ্ত পুত্রগণকেও দেখেছ। এখন শোক ত্যাগ কর, যুধিষ্ঠিরকে ভ্রাতাদের সঙ্গে রাজ্যে ফিরে যেতে বল; এরা মাসাধিক কাল এখানে রয়েছেন। ব্যাসের বাক্য শুনে ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠিরকে বললেন, অজাতশত্রু, তোমার মঙ্গল হোক, তোমরা এখন হস্তিনাপুরে ফিরে যাও, তোমরা এখানে থাকায় স্নেহের জন্য আমার তপস্যার ব্যাঘাত হচ্ছে। তুমি আমার পুত্রের কার্য করেছ, আমাদের পিণ্ড কীর্তি ও কুল তোমাতেই প্রতিষ্ঠিত আছে। আর আমার শোক নেই, জীবনেরও প্রয়োজন নেই, এখন কঠোর তপস্যা করব। তুমি আজ বা কাল চলে যাও।

যুধিষ্ঠির বললেন, আমি এই আশ্রমে থেকে আপনার সেবা করব। সহদেব বললেন, আমি মাতা কুন্তীকে ছেড়ে যেতে পারব না। ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী ও কুন্তী বহু প্রবোধ দিয়ে তাঁদের নিরস্ত করলেন। তখন পাণ্ডবগণ বিদায় নিয়ে ভার্যা বান্ধব ও সৈন্য সহ হস্তিনাপুরে প্রস্থান করলেন।