আদিপর্ব: ৬। জরৎকারু মুনি — কদ্রু ও বিনতা — সমুদ্রমন্থন
শৌনক বললেন, তুমি জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ ও আস্তীকের ইতিহাস বল। সৌতি বললেন। — আস্তীকের পিতার নাম জরৎকারু, তিনি মহাতপা ব্রহ্মচারী ঊর্ধ্বরেতা পরিব্রাজক ছিলেন। একদিন তিনি পর্যটন করতে করতে দেখলেন, কতগুলি মানুষ উশীর (বেনা) তৃণ অবলম্বন ক'রে ঊর্ধ্বপাদ অধোমুখ হয়ে গর্তের উপর ঝুলছেন। জরৎকারুর প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা বললেন, আমরা যাযাবর নামক ঋষি ছিলাম। জরৎকারু নামে আমাদের একটি পুত্র আছে, সেই মূঢ় কেবল তপস্যা করে, বিবাহ এবং সন্তান উৎপাদনের চেষ্টা তার নেই। আমরা অনাথ হয়ে বংশলোপের আশঙ্কায় পাপীর ন্যায় এই গর্তে লম্বমান রয়েছি। জরৎকারু বললেন, আপনারা আমারই পিতৃপুরুষ, বলুন কি করব। পিতৃগণ বললেন, বৎস, দারগ্রহণ ও সন্তান উৎপাদন কর, তাতেই আমাদের পরম মঙ্গল হবে। জরৎকারু বললেন, আমি নিজের জন্য বিবাহ বা ধনোপার্জন করব না, আপনাদের হিতের জন্যই দারগ্রহণ করব। যে কন্যার নাম আমার নামের সমান, যাকে তার আত্মীয়রা স্বেচ্ছায় দান করবে, তাকেই আমি ভিক্ষাস্বরূপ নেব।
জরৎকারু বিবাহার্থী হয়ে ভ্রমণ করতে লাগলেন। একদিন তিনি বনে গিয়ে ধীর ও উচ্চ কণ্ঠে তিনবার কন্যা ভিক্ষা করলেন। তখন বাসুকি তাঁর ভগিনীকে নিয়ে এসে বললেন, দ্বিজোত্তম, আপনি একে গ্রহণ করুন। কন্যার নাম আর নিজের নাম এক জেনে জরৎকারু তাঁকে বিবাহ করলেন। আস্তীক নামে তাঁদের এক পুত্র হল, তিনিই সর্পগণকে ত্রাণ করেন এবং পিতৃগণকেও উদ্ধার করেন।
শৌনক বললেন, বৎস সৌতি, তোমার কথা অতি মধুর, আমরা আরও শুনতে ইচ্ছা করি। সৌতি বলতে লাগলেন। — পুরাকালে সত্যযুগে দক্ষ প্রজাপতির কদ্রু ও বিনতা নামে দুই সুলক্ষণা রূপবতী কন্যা ছিলেন, তাঁরা কশ্যপের ধর্মপত্নী। কশ্যপ তাঁদের বর দিতে ইচ্ছা করলে কদ্রু বললেন, তুল্যবলশালী সহস্র নাগ আমার পুত্র হোক; বিনতা বললেন, আমাকে দুই পুত্র দিন যারা কদ্রুর পুত্রের চেয়েও বলবান ও তেজস্বী। কশ্যপ দুই পত্নীকেই অভীষ্ট বর দিলেন। যথাকালে কদ্রু এক সহস্র এবং বিনতা দুই ডিম্ব প্রসব করলেন। পাঁচ শ বৎসর পরে কদ্রুর প্রত্যেক ডিম্ব থেকে পুত্র নির্গত হল। নিজের দুই ডিম্ব থেকে কিছুই বার হ'ল না দেখে বিনতা একটি ডিম্ব ভেঙে দেখলেন, তাঁর মধ্যস্থ সন্তানের দেহের ঊর্ধ্বভাগ আছে কিন্তু নিম্নভাগ অপরিণত। সেই পুত্র ক্রুদ্ধ হয়ে মাতাকে শাপ দিলেন, তোমার লোভের ফলে আমার দেহ অসম্পূর্ণ হয়েছে, তুমি পাঁচ শ বৎসর কদ্রুর দাসী হয়ে থাকবে। অন্য ডিম্বটিকে অসময়ে ভেঙো না, যথাকালে তা থেকে পুত্র নির্গত হয়ে তোমার দাসীত্ব মোচন করবে। এই কথা ব'লে তিনি আকাশে উঠলেন এবং অরুণরূপে সূর্য্যের সারথি হলেন। গরুড়ও যথাকালে জন্মগ্রহণ করলেন এবং জননী বিনতাকে ত্যাগ ক'রে ক্ষুধার্ত হয়ে আকাশে উঠলেন।
একদিন কদ্রু ও বিনতা দেখলেন, তাঁদের নিকট দিয়ে উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব যাচ্ছে।(১) অমৃতমন্থনে উৎপন্ন এই অশ্বরত্নের প্রশংসা সকল দেবতাই করতেন।
শৌনক অমৃতমন্থনের বিবরণ শুনতে চাইলে সৌতি বললেন — একদা দেবগণ সুমেরু পর্বতের শিখরে বসে অমৃতপ্রাপ্তির জন্য মন্ত্রণা করেছিলেন। নারায়ণ ব্রহ্মাকে বললেন, দেবগণ ও অসুরগণ একত্র হয়ে সমুদ্রমন্থন করুন, তা হ'লে অমৃত পাবেন। ব্রহ্মা ও নারায়ণের আদেশে নাগরাজ অনন্ত মন্দর পর্বত উৎপাটন করলেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে দেবতারা সমুদ্রতীরে গিয়ে বললেন, অমৃতের জন্য আমরা আপনাকে মন্থন করব। সমুদ্র বললেন, আমাকে অনেক মর্দন সইতে হবে, অমৃতের অংশ যেন আমি পাই।
দেবাসুরের অনুরোধে সাগরস্থ কূর্ম্মরাজ মন্দর পর্বতকে পৃষ্ঠে ধারণ করলেন, ইন্দ্র বজ্র দ্বারা পর্বতের নিম্নদেশ সমান ক'রে দিলেন। তারপর মন্দরকে মন্থনদণ্ড এবং নাগরাজ বাসুকি (অনন্ত)কে রজ্জু ক'রে দেবাসুর সমুদ্র মন্থন করতে লাগলেন। অসুরগণ নাগরাজের শীর্ষদেশ এবং দেবগণ পুচ্ছ ধারণ করলেন। বাসুকির মুখ থেকে ধূম ও অগ্নিশিখার সহিত যে নিঃশ্বাসবায়ু নির্গত হ'ল তা মেঘে পরিণত হয়ে পরিশ্রান্ত দেবাসুরের উপর জলবর্ষণ করতে লাগল। সমুদ্র থেকে মেঘগর্জনের ন্যায় শব্দ উঠল, মন্দরের ঘর্ষণে বহু জলজন্তু নিষ্পিষ্ট হ'ল, পর্বতের বৃক্ষসকল পক্ষিসমেত নিপাতিত হ'ল, বৃক্ষের ঘর্ষণে অগ্নি উৎপন্ন হয়ে হস্তী সিংহ প্রভৃতি জন্তুকে দগ্ধ ক'রে ফেলল। নানাপ্রকার বৃক্ষের নির্যাস, ওষধির রস এবং কাষ্ঠদ্রব্য সমুদ্রজলে পড়ল। সেই সকল রসংমিশ্রিত জল থেকে দুগ্ধ ও ঘৃত উৎপন্ন হ'ল।
তারপর মথ্যমান সাগর থেকে চন্দ্র উঠলেন এবং ঘৃত থেকে লক্ষ্মী, সুরা দেবী, শ্বেতবর্ণ উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব ও নারায়ণের বক্ষের ভূষণ কৌস্তুভ মণির উদ্ভব হ’ল। সর্বকামনাপূরক পারিজাত এবং সুরভি ধেনুও উত্থিত হ’ল। লক্ষ্মী, সুরা দেবী, চন্দ্র ও উচ্চৈঃশ্রবা দেবগণের নিকট গেলেন। অনন্তর ধন্বন্তরি দেব অমৃতপূর্ণ কমণ্ডলু নিয়ে উঠলেন, তা দেখে দানবগণ ‘আমার আমার’ ব’লে কোলাহল করতে লাগল। তারপর শ্বেতবর্ণ চতুরদন্ত মহাকায় ঐরাবত উত্থিত হ’লে ইন্দ্র তাকে ধরলেন। অতিশয় মন্থনের ফলে কালকূট উঠল, সধূম অগ্নির ন্যায় সেই বিষে জগৎ ব্যাপ্ত হ’ল। ব্রহ্মার অনুরোধে ভগবান মহেশ্বর সেই বিষ কণ্ঠে গ্রহণ করলেন, সেই থেকে তাঁর নাম নীলকণ্ঠ।
দানবগণ অমৃত ও লক্ষ্মী লাভের জন্য দেবতাদের সঙ্গে কলহ করতে লাগল। নারায়ণ মোহিনী মায়ায় স্ত্রীরূপ ধারণ ক’রে দানবগণের কাছে গেলেন, তারা মোহিত হয়ে তাঁকে অমৃত সমর্পণ করলে। তিনি দানবগণকে শ্রেণীবদ্ধ ক’রে বসিয়ে কমণ্ডলু থেকে কেবল দেবগণকে অমৃত পান করালেন। দানবগণ ক্রুদ্ধ হয়ে দেবগণের প্রতি ধাবিত হ’ল, তখন বিষ্ণু অমৃত হরণ করলেন। দেবতারা বিষ্ণুর কাছ থেকে অমৃত নিয়ে পান করছিলেন সেই অবসরে রাহু নামক এক দানব দেবতার রূপ ধারণ ক’রে অমৃত পান করলে। অমৃত রাহুর কণ্ঠদেশে যাবার আগেই চন্দ্র ও সূর্য বিষ্ণুকে ব’লে দিলেন, বিষ্ণু তখনই তাঁর চক্র দিয়ে সেই দানবের মুণ্ডচ্ছেদ করলেন। রাহুর মুণ্ড আকাশে উঠে গর্জন করতে লাগল, তার কবন্ধ (ধড়) ভূমিতে পড়ল, সমস্ত পৃথিবী কম্পিত হ’ল। সেই অবধি চন্দ্রসূর্যের সঙ্গে রাহুর চিরস্থায়ী শত্রুতা হ’ল।
বিষ্ণু স্ত্রীরূপ ত্যাগ ক’রে দেবগণের সঙ্গে যোগ দিয়ে ঘোর যুদ্ধ করলেন। দানবগণ পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেল।