আদিপর্ব: ৭। কদ্রু-বিনতার পণ — গরুড় — গজকচ্ছপ — অমৃতহরণ
একদিন উচ্চৈঃশ্রবাকে দেখে কদ্রু ও বিনতা তর্ক করলেন, এই অশ্বের বর্ণ কি। বিনতা বললেন, শ্বেত; কদ্রু বললেন, এর পুচ্ছলোম কৃষ্ণ। অবশেষে এই পণ স্থির হ’ল যে কাল তারা অশ্বটিকে ভাল করে দেখবেন এবং যার কথা মিথ্যা হবে তিনি সপত্নীর দাসী হবেন।
কদ্রু তাঁর সর্পপুত্রদের ডেকে বললেন, তোমরা শীঘ্র গিয়ে ওই অশ্বের পুচ্ছে লগ্ন হও, যাতে তা কৃষ্ণবর্ণ দেখায়। যে সর্পরা সম্মত হ’ল না কদ্রু তাদের শাপ দিলেন, তোমরা জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞে দগ্ধ হবে। পরদিন প্রভাতে কদ্রু ও বিনতা আকাশপথে সমুদ্রের পরপারে গেলেন। উচ্চৈঃশ্রবার পুচ্ছে কৃষ্ণবর্ণ লোম দেখে বিনতা বিষণ্ণ হলেন এবং কদ্রু তাঁকে দাসীত্বে নিযুক্ত করলেন।
এই সময়ে বিনতার দ্বিতীয় ডিম্ব বিদীর্ণ ক’রে মহাবল গরুড় বহির্গত হলেন এবং অগ্নিরাশির ন্যায় তেজোময় বিশাল দেহ ধারণ ক’রে আকাশে উঠে গর্জন করতে লাগলেন। তারপর তিনি সমুদ্রের পরপারে মাতার নিকট গেলেন। কদ্রু বিনতাকে বললেন, সমুদ্রের মধ্যে এক সুরম্য নাগালয় আছে, সেখানে আমাকে নিয়ে চল। বিনতা কদ্রুকে এবং গরুড় তাঁর বৈমাত্র ভ্রাতা সর্পগণকে বহন ক’রে নিয়ে চললেন। সূর্যতাপে পুত্ররা কষ্ট পাচ্ছে দেখে কদ্রু ইন্দ্রের স্তব করলেন, ইন্দ্রের আদেশে মেঘ থেকে বৃষ্টিপাত হ’ল। সর্প সকল হৃষ্ট হয়ে গরুড়ের পিঠে চ’ড়ে এক রমণীয় দ্বীপে এল। তারা গরুড়কে বললে, আমাদের অন্য এক দ্বীপে নিয়ে চল যেখানে নির্মল জল আছে। গরুড় বিনতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এদের আজ্ঞানুসারে আমাকে চলতে হবে কেন? বিনতা জানালেন যে কদ্রু কপট উপায়ে তাঁকে পণ পরাজিত ক’রে দাসীত্বে নিযুক্ত করেছেন। গরুড় দুঃখিত হয়ে সর্পদের জিজ্ঞাসা করলেন, কি করলে আমরা দাস্য থেকে মুক্ত হতে পারি? সর্পরা বললে, যদি নিজ বীর্যবলে অমৃত আনতে পার তবে মুক্তি পাবে।
গরুড় বিনতাকে বললেন, আমি অমৃত আনতে যাচ্ছি, পথে কি খাব? বিনতা বললেন, সমুদ্রের এক প্রান্তে বহু সহস্র নিষাদ বাস করে, তুমি সেই নির্দয় দুরাত্মাদের খেয়ো কিন্তু ব্রাহ্মণদের কখনও হিংসা করো না। গরুড় আকাশমার্গে যাত্রা ক’রে নিষাদালয়ে উপস্থিত হলেন এবং মুখব্যাদান ক’রে নিষাদগণকে গ্রাস করতে লাগলেন। এক ব্রাহ্মণ তাঁর পত্নীর সঙ্গে গরুড়ের কণ্ঠে প্রবেশ করেছিলেন। দীপ্ত অঙ্গারের ন্যায় দাহ বোধ হওয়ায় গরুড় বললেন, দ্বিজোত্তম, তুমি শীঘ্র নির্গত হও, ব্রাহ্মণ পাপী হ’লেও আমার ভক্ষ্য নয়। ব্রাহ্মণ বললেন, তবে আমার নিষাদী ভার্যাকেও ছেড়ে দাও। গরুড় বললেন, আপনি তাঁকে নিয়ে শীঘ্র বেরিয়ে আসুন, যেন আমার জঠরানলে জীর্ণ না হন। ব্রাহ্মণ সপত্নীক নির্গত হয়ে গরুড়কে আশীর্বাদ করে প্রস্থান করলেন।
তারপর গরুড় তাঁর পিতা মহর্ষি কশ্যপের কাছে গেলেন। কশ্যপ কুশল প্রশ্ন করলে গরুড় বললেন, আমি মাতার দাসীত্ব মোচনের জন্য অমৃত আনতে যাচ্ছি, কিন্তু আমি প্রচুর খাদ্য পাই না, আপনি আমার ক্ষুধাপিপাসানিবৃত্তির উপায় বলুন।
কশ্যপ বললেন, বিভাবসু নামে এক কোপনস্বভাব মহর্ষি ছিলেন, তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা সুপ্রতীক ধনবিভাগের জন্য বার বার অনুরোধ করতেন। একদিন বিভাবসু বলিলেন, যে ভ্রাতারা গুরু ও শাস্ত্র মানে না তারাই পরস্পরকে শত্রু ভেবে শঙ্কিত হয়; সাধুলোকেরা ধনবিভাগের প্রশংসা করেন না। তুমি আমার নিষেধ শুনিবে না, ভিন্ন হয়ে ধনশালী হতে চাও, অতএব আমার শাপে তুমি হস্তী হও। সুপ্রতীকও জ্যেষ্ঠকে শাপ দিলেন, তুমি কচ্ছপ হও। বৎস গরুড়, ওই যে সরোবর দেখছ ওখানে দুই ভ্রাতা গজকচ্ছপ রূপে পরস্পরকে আক্রমণ করছে। তুমি ওই মহাগিরিতুল্য গজ এবং মহামেঘতুল্য কচ্ছপ ভোজন কর।
এক নখে গজ আর এক নখে কচ্ছপকে তুলে নিয়ে গরুড় অলম্ব তীর্থে গেলেন। সেখানকার বৃক্ষসকল শাখাভঙ্গের ভয়ে কাঁপতে লাগল। একটি বিশাল দিব্য বটবৃক্ষ গরুড়কে বললে, আমার শতযোজন আয়ত মহাশাখায় বসে তুমি গজকচ্ছপ ভোজন কর। গরুড় বসবামাত্র মহাশাখা ভেঙে গেল। বালখিল্য মুনিগণ সেই শাখা থেকে অধোমুখে ঝুলছেন দেখে গরুড় সন্তস্ত হয়ে চঞ্চুদ্বারা শাখাটি ধরে ফেললেন এবং বহু দেশে বিচরণ করে অবশেষে গন্ধমাদন পর্বতে উপস্থিত হলেন। কশ্যপ সেখানে তপস্যা করছিলেন। তিনি পুত্রের অনিষ্টবারণের জন্য বালখিল্যগণকে বললেন, তপোধনগণ, লোকের হিতের নিমিত্ত গরুড় মহৎ কর্মে প্রবৃত্ত হয়েছে, আপনারা তাকে অনুমতি দিন। তখন বালখিল্যগণ শাখা ত্যাগ করে হিমালয়ে তপস্যা করতে গেলেন। গরুড় শাখা মুখে করে বিকৃতস্বরে পিতাকে বললেন, ভগবান, মানুষবর্জিত এমন স্থান বলুন যেখানে এই শাখা ফেলতে পারি। কশ্যপ একটি তুষারময় জনশূন্য পর্বতের কথা বললেন। গরুড় সেখানে গিয়ে শাখা ত্যাগ করলেন এবং পর্বতশৃঙ্গে বসে গজকচ্ছপ ভোজন করলেন।
ভোজন শেষ করে গরুড় মহাবেগে উড়ে চললেন। অশুভসূচক নানাপ্রকার প্রাকৃতিক উপদ্রব দেখে ইন্দ্রাদি দেবগণ ভীত হলেন। বৃহস্পতি বললেন, কশ্যপ- বিনতার পুত্র কামরূপী গরুড় অমৃত হরণ করতে আসছে। তখন দেবতারা নানাবিধ অস্ত্র ধারণ করে অমৃতরক্ষার জন্য প্রস্তুত হলেন। গরুড়কে দেখে দেবগণ ভয়ে কম্পিত হয়ে পরস্পরকে অস্ত্রাঘাত করতে লাগলেন। বিশ্বকর্মা অমৃতের রক্ষক ছিলেন, তিনি গরুড়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ যুদ্ধ করে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ভূপতিত হলেন। গরুড়ের পক্ষের আন্দোলনে ধূলি উড়ে দেবলোক অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে, বায়ু সেই ধূলি অপসারিত করলেন। ইন্দ্রাদি দেবতাদের সঙ্গে গরুড়ের তুমুল যুদ্ধ হতে লাগল। পরিশেষে গরুড় জয়ী হলেন এবং স্বর্ণময় ক্ষুদ্র দেহ ধারণ করে অমৃতরক্ষাগারে প্রবেশ করলেন।
গরুড় দেখলেন, অমৃতের চতুর্দিকে অগ্নিশিখা জ্বলছে, তার নিকটে একটি ক্ষুরধার লৌহচক্র নিরন্তর ঘুরছে। তিনি তাঁর দেহ সংকুচিত ক'রে চক্রের অরের অন্তরাল দিয়ে প্রবেশ ক'রে দেখলেন, অমৃত রক্ষার জন্য দুই ভয়ংকর সর্প চক্রের নিম্নদেশে রয়েছে। গরুড় তাদের বধ ক'রে অমৃত নিয়ে আকাশে এসে বিষ্ণুর দর্শন পেলেন। গরুড় অমৃতপানের লোভ সংবরণ করেছেন দেখে বিষ্ণু প্রীত হয়ে বললেন, তোমাকে বর দেব। গরুড় বললেন, আমি তোমার উপরে থাকতে এবং অমৃতপান না ক'রেই অজর অমর হ'তে ইচ্ছা করি। বিষ্ণু বললেন, তাই হবে। তখন গরুড় বললেন, ভগবান, তুমিও আমার কাছে বর চাও। বিষ্ণু বললেন, তুমি আমার বাহন হও, আমার রথধ্বজের উপরেও থেকো। গরুড় তাই হবে ব'লে মহাবেগে প্রস্থান করলেন।
তখন ইন্দ্র তাঁকে বজ্রাঘাত করলেন। গরুড় সহাস্যে বললেন, শতক্রতু, দধীচি মুনি, যাঁর অস্থিজাত বজ্র, এবং তোমার সম্মানের নিমিত্ত আমি একটি পালক ফেলে দিলাম, তোমার বজ্রপাতে আমার কোনও ব্যথা হয় নি। গরুড়ের নিক্ষিপ্ত সেই সুন্দর পালক দেখে সকলে আনন্দিত হয়ে তাঁর নাম দিলেন 'সুপর্ণ'। ইন্দ্র তাঁর সঙ্গে সখ্য স্থাপন ক'রে বললেন, যদি তোমার অমৃতে প্রয়োজন না থাকে তবে আমাকে ফিরিয়ে দাও, কারণ তুমি যাদের দেবে তারাই আমাদের উপর উপদ্রব করবে। গরুড় বললেন, কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে আমি অমৃত নিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আমি রাখব সেখান থেকে তুমি হরণ করো। ইন্দ্র তুষ্ট হয়ে বর দিতে চাইলে গরুড় বললেন, মহাবল সর্পগণ আমার ভক্ষ্য হ'ক। ইন্দ্র বললেন, তাই হবে।
তার পর গরুড় বিনতার কাছে এলেন এবং সর্পভ্রাতাদের বললেন, আমি অমৃত এনেছি, এই কুশের উপর রাখছি, তোমরা স্নান ক'রে এসে খেয়ো। এখন তোমাদের কথা রাখ, আমার মাতাকে দাসীত্ব থেকে মুক্ত কর। তাই হ'ক বলে সর্পরা স্নান করতে গেল, সেই অবসরে ইন্দ্র অমৃত হরণ করলেন। সর্পের দল ফিরে এসে 'আমি আগে, আমি আগে' ব'লে অমৃত খেতে গেল, কিন্তু না পেয়ে কুশ চাটতে লাগল, তার ফলে তাদের জিহ্বা দ্বিধা বিভক্ত হল।