আদিপর্ব: ১৬। দেবব্রত ভীষ্ম — সত্যবতী
একদিন তিনি মৃগের অনুসরণে গঙ্গাতীরে এসে দেখলেন, দেবকুমারতুল্য চারুদর্শন দীর্ঘকায় এক বালক শরবর্ষণ ক’রে গঙ্গা আচ্ছন্ন করছে। শান্তনুকে মায়ায় মোহিত ক’রে সেই বালক অন্তর্হিত হ’ল। তাঁকে নিজের পুত্র অনুমান ক’রে শান্তনু বললেন, গঙ্গা, আমার পুত্রকে দেখাও। তখন শুভ্রবসনা সালঙ্কারা গঙ্গা পুত্রের হাত ধরে আবির্ভূত হয়ে বললেন, মহারাজ, এই আমার অষ্টমগর্ভজাত পুত্র, একে আমি পালন ক’রে বড় করেছি। এ বশিষ্ঠের কাছে বেদ অধ্যয়ন করেছে। শুক্র ও বৃহস্পতি যত শাস্ত্র জানেন, জামদগ্ন্য যত অস্ত্র জানেন, সে সমস্তই এ জানে। এই মহাধনুর্ধর রাজধর্মজ্ঞ পুত্রকে তুমি গৃহে নিয়ে যাও। দেবব্রত নামক এই পুত্রকে শান্তনু রাজভবনে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। রাজ্যের সকলেই এই গুণবান রাজকুমারের অনুরক্ত হলেন। চার বৎসর পরে শান্তনু একদিন যমুনাতীরবর্তী বনে বেড়াতে বেড়াতে অনির্বচনীয় সুগন্ধ অনুভব করলেন এবং তার অনুসরণ করে দেবকন্যার ন্যায় রূপবতী একটি কন্যার কাছে উপস্থিত হলেন। রাজার প্রশ্নের উত্তরে সেই কন্যা বললেন, আমি দাস (১) রাজের কন্যা, পিতার আজ্ঞায় নৌকাচালনা করি। শান্তনু, দাসরাজের কাছে গিয়ে সেই কন্যা চাইলেন। দাসরাজ বললেন, আপনি যদি একে ধর্মপত্নী করেন এবং এই প্রতিশ্রুতি দেন যে এর গর্ভজাত পুত্রই আপনার পরে রাজা হবে তবে কন্যাদান করতে পারি।
শান্তনু উক্তপ্রকার প্রতিশ্রুতি দিতে পারলেন না, তিনি সেই রূপবতী কন্যাকে ভাবতে ভাবতে রাজধানীতে ফিরে গেলেন। পিতাকে চিন্তান্বিত দেখে দেবব্রত বললেন, মহারাজ, রাজ্যের সর্বত্র কুশল, তথাপি আপনি চিন্তাকুল হয়ে আছেন কেন? আপনি আর অশ্বারোহণে বেড়াতে যান না, আপনার শরীর বিবর্ণ ও কৃশ হয়েছে, আপনার কি রোগ বলুন। শান্তনু বললেন, বৎস, আমার মহান বংশে তুমিই একমাত্র সন্তান, তুমি সর্বদা অস্ত্রচর্চা করে থাক, কিন্তু মানুষ অনিত্য তোমার বিপদ ঘটলে আমার বংশলোপ হবে। তুমি শতপুত্রেরও অধিক সেজন্য আমি বংশবৃদ্ধির নিমিত্ত বৃথা পুনর্বার বিবাহ করতে ইচ্ছা করি না, তোমার মঙ্গল হ’ক এই কামনাই করি। কিন্তু বেদজ্ঞগণ বলেন, পুত্র না থাকা আর একটিমাত্র পুত্র দুই সমান। তোমার অবর্তমানে আমার বংশের কি হবে এই চিন্তাই আমার দুঃখের কারণ।
বুদ্ধিমান দেবব্রত বৃদ্ধ অমাত্যের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, পিতার শোকের কারণ কি? অমাত্য জানালেন, রাজা দাসকন্যাকে বিবাহ করতে চান। দেবব্রত বৃদ্ধ ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে নিয়ে দাসরাজের কাছে গেলেন এবং পিতার জন্য কন্যা প্রার্থনা করলেন। দাসরাজ সসম্মানে তাঁকে সংবর্ধনা করে বললেন, এরূপ শ্লাঘনীয় বিবাহসম্বন্ধ কে না চায়? যিনি আমার কন্যা সত্যবতীর জন্মদাতা, সেই উপরিচর রাজা বহুবার আমাকে বলেছেন যে শান্তনুই তার উপযুক্ত পতি। কিন্তু এই বিবাহে একটি দোষ আছে—বৈমাত্র ভ্রাতারূপে তুমি যার প্রতিবন্দ্বী হবে সে কখনও সুখে থাকতে পারবে না।
গাঙ্গেয় দেবব্রত বললেন, আমি সত্যপ্রতিজ্ঞা করছি শুনুন, এরূপ প্রতিজ্ঞা অন্য কেউ করতে পারে না — আপনার কন্যার গর্ভে যে পুত্র হবে সেই রাজ্য পাবে। দাসরাজ বললেন, সৌম্য, তুমি রাজা শান্তনুর একমাত্র অবলম্বন, এখন আমার কন্যারও রক্ষক হ'লে, তুমিই একে দান করতে পার। তথাপি কন্যাভর্তার অধিকার অনুসারে আমি আরও কিছু বলছি শোন। হে সত্যবাদী মহাবাহু, তোমার প্রতিজ্ঞা কদাচ মিথ্যা হবে না, কিন্তু তোমার যে পুত্র হবে তাকেই আমার ভয়। দেবব্রত বললেন, আমি পূর্বেই সমগ্র রাজ্য ত্যাগ করেছি, এখন প্রতিজ্ঞা করছি আমার পুত্রও হবে না। আজ থেকে আমি ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করব, আমার পুত্র না হ'লেও অক্ষয় স্বর্গ লাভ হবে।
দেবব্রতের প্রতিজ্ঞা শুনে দাসরাজ রোমাঞ্চিত হয়ে বললেন, আমি সত্যবতীকে দান করব। তখন আকাশ থেকে অপ্সরা দেবগণ ও পিতৃগণ পুষ্পবৃষ্টি ক'রে বললেন, এ'র নাম ভীষ্ম হ'ল। সত্যবতীকে ভীষ্ম বললেন, মাতা, রথে উঠুন, আমরা স্বগৃহে যাব। হস্তিনাপুরে এসে ভীষ্ম পিতাকে সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন। সকলেই তাঁর দুষ্কর কার্যের প্রশংসা করে বললেন, ইনি ভীষ্ম (১)ই বটেন। শান্তনু পুত্রকে বর দিলেন, হে নিষ্পাপ, তুমি যতদিন বাঁচতে ইচ্ছা করবে তত দিন তোমার মৃত্যু হবে না, তোমার ইচ্ছানুসারেই মৃত্যু হবে।