আদিপর্ব: ১৫। মহাভিষ — অষ্ট বসু — প্রতীপ — শান্তনু-গঙ্গা

দুষ্মন্ত-শকুন্তলার পুত্র ভরত বহু দেশ জয় এবং বহুশত অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠান করে সার্বভৌম রাজচক্রবর্তী হয়েছিলেন। তাঁর বংশের এক রাজার নাম হস্তী, তিনি হস্তিনাপুর নগর স্থাপন করেন। হস্তীর চার পুরুষ পরে কুরু রাজা হন, তাঁর নাম অনুসারে কুরুজঙ্গল দেশ খ্যাত হয়। তিনি যেখানে তপস্যা করেছিলেন সেই স্থানই পবিত্র কুরুক্ষেত্র। কুরুর অধস্তন সপ্তম পুরুষের নাম প্রতীপ, তাঁর পুত্র শান্তনু।

মহাভিষ নামে ইক্ষ্বাকুবংশীয় এক রাজা ছিলেন, তিনি বহু যজ্ঞ করে স্বর্গে যান। একদিন তিনি দেবগণের সঙ্গে ব্রহ্মার কাছে গিয়েছিলেন, সেই সময়ে নদীশ্রেষ্ঠা গঙ্গাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সহসা বায়ুর প্রভাবে গঙ্গার সূক্ষ্ম বসন অপসৃত হ’ল। দেবগণ অধোমুখ হয়ে রইলেন, কিন্তু মহাভিষ গঙ্গাকে অসংকোচে দেখতে লাগলেন। ব্রহ্মা তাঁকে শাপ দিলেন, তুমি মর্ত্যলোকে জন্মগ্রহণ কর, পরে আবার স্বর্গে আসতে পারবে। মহাভিষ স্থির করলেন তিনি মহাতেজস্বী প্রতীপ রাজার পুত্র হবেন।

গঙ্গা মহাভিষকে ভাবতে ভাবতে মর্ত্যে ফিরে আসছিলেন, পথিমধ্যে দেখলেন বসু নামক দেবগণ মূর্ছিত হয়ে পড়ে আছেন। গঙ্গার প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা বললেন, বশিষ্ঠ আমাদের শাপ দিয়েছেন — তোমরা নরযোনিতে জন্মগ্রহণ কর। আমরা মানুষীর গর্ভে যেতে চাই না, আপনিই আমাদের পুত্ররূপে প্রসব করুন, প্রতীপের পুত্র শান্তনু আমাদের পিতা হবেন। জন্মের পরেই আপনি আমাদের জলে ফেলে দেবেন, যাতে আমরা শীঘ্র নিষ্কৃতি পাই। গঙ্গা বললেন, তাই করব।

কিন্তু যেন একটি পুত্র জীবিত থাকে, নতুবা শান্তনুর সঙ্গে আমার সঙ্গম ব্যর্থ হবে। বসুগণ বললেন, আমরা প্রত্যেকে নিজ বীর্যের অষ্টমাংশ দেব, তার ফলে একটি পুত্র জীবিত থাকবে। এই পুত্র বলবান হবে কিন্তু তার সন্তান হবে না।

রাজা প্রতীপ গঙ্গাতীরে ব'সে জপ করছিলেন এমন সময় মনোহর নারী রূপ ধারণ করে গঙ্গা জল থেকে উঠে প্রতীপের দক্ষিণ উরুতে বসলেন। রাজা বললেন, কল্যাণী, কি চাও? গঙ্গা বললেন, কুরুশ্রেষ্ঠ, আমি তোমাকে চাই। রাজা বললেন, পরস্ত্রী আর অসবর্ণা আমার অগম্য। গঙ্গা বললেন, আমি দেবকন্যা, অগম্য নই। রাজা বললেন, তুমি আমার বাম উরুতে না বসে দক্ষিণ উরুতে বসেছ, যেখানে পুত্র কন্যা আর পুত্রবধূর স্থান। তুমি আমার পুত্রবধূ হও। গঙ্গা বললেন, তাই হবে, কিন্তু আমার কোনও কার্যে আপনার পুত্র আপত্তি করতে পারবেন না। প্রতীপ সম্মত হলেন।

গঙ্গা অন্তর্হিত হ'লে প্রতীপ ও তাঁর পত্নী পুত্রলাভের জন্য তপস্যা করতে লাগলেন। রাজা মহাভিষ তাঁদের পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করলেন, তাঁর নাম হ'ল শান্তনু। শান্তনু যৌবন লাভ করলে প্রতীপ তাঁকে বললেন, তোমার নিমিত্ত এক রূপবতী কন্যা পূর্বে আমার কাছে এসেছিল। সে যদি পুত্রকামনায় তোমার কাছে উপস্থিত হয়, তবে তার ইচ্ছা পূর্ণ করো, কিন্তু তার পরিচয় জানতে চেয়ো না, তার কার্যেও বাধা দিও না। তারপর প্রতীপ তাঁর পুত্র শান্তনুকে রাজ্যে অভিষিক্ত করে বনে প্রস্থান করলেন।

একদিন শান্তনু গঙ্গার তীরে এক দিব্যাভরণভূষিতা পরমা সুন্দরী নারীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বললেন, তুমি দেবী দানবী অপ্সরা না মানবী? তুমি আমার ভার্যা হও। গঙ্গা উত্তর দিলেন, রাজা, আমি তোমার মহিষী হব, কিন্তু আমি শুভ বা অশুভ যাই করি তুমি যদি বারণ বা ভর্ৎসনা কর তবে তোমাকে নিশ্চয় ত্যাগ করব। শান্তনু তাতেই সম্মত হলেন।

ভার্যার স্বভাবচরিত্র রূপগুণ ও সেবায় পরিতৃপ্ত হয়ে শান্তনু সুখে কালযাপন করতে লাগলেন। তাঁর আটটি দেবকুমার তুল্য পুত্র হয়েছিল। প্রত্যেক পুত্রের জন্মের পরেই গঙ্গা তাকে জলে নিক্ষেপ ক'রে বলতেন, এই তোমার প্রিয়কার্য করলাম। শান্তনু অসন্তুষ্ট হ'লেও কিছু বলতেন না, পাছে গঙ্গা তাঁকে ছেড়ে চ'লে যান। অষ্টম পুত্র প্রসবের পর গঙ্গা হাসছেন দেখে শান্তনু বললেন, একে মেরো না, পুত্রঘাতিনী, তুমি কে, কেন এই মহাপাপ করছ? গঙ্গা বললেন, তুমি পরে চাও অতএব এই পুত্রকে বধ করব না, কিন্তু তোমার কাছে থাকাও আমার শেষ হ’ল। গঙ্গা নিজের পরিচয় দিলেন এবং বসুগণের এই বৃত্তান্ত বললেন।— একদা পৃথু প্রভৃতি বসুগণ নিজ নিজ পত্নীসহ সুমেরু পর্বতের পার্শ্ববর্তী বশিষ্ঠের তপোবনে বিহার করতে এসেছিলেন। বশিষ্ঠের কামধেনু নন্দিনীকে দেখে দ্যু-নামক বসুর পত্নী তাঁর স্বামীকে বললেন, আমার সখী রাজকন্যা জিতবতীকে এই ধেনু উপহার দিতে চাই। পত্নীর অনুরোধে দ্যু-বসু নন্দিনীকে হরণ করলেন। বশিষ্ঠ আশ্রমে এসে দেখলেন নন্দিনী নেই। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে শাপ দিলেন, যারা আমার ধেনু নিয়েছে তারা মানুষ হয়ে জন্মাবে। বসুগণের অনুনয়ে প্রসন্ন হয়ে বশিষ্ঠ বললেন, তোমরা সকলে এক বৎসর পরে শাপমুক্ত হবে, কিন্তু দ্যু-বসু নিজ কর্মের ফলে দীর্ঘকাল মর্ত্যলোকে বাস করবেন। তিনি ধার্মিক, সর্বশাস্ত্রবিশারদ, পিতার প্রিয়কারী এবং স্ত্রীসম্ভোগত্যাগী হবেন। তার পর গঙ্গা বললেন, মহারাজ, অভিশপ্ত বসুগণের অনুরোধে আমি তাদের প্রসব ক’রে জলে নিক্ষেপ করেছি, কেবল দ্যু-বসু — যিনি এই অষ্টম পুত্র — দীর্ঘজীবী হয়ে বহুকাল মর্ত্যলোকে বাস করবেন এবং পুনর্বার স্বর্গলোকে যাবেন। এই বলে গঙ্গা নবজাত পুত্রকে নিয়ে অন্তর্হিত হলেন।

১৮। দেবব্রত-ভীষ্ম — সত্যবতী শান্তনু দুঃখিত মনে তাঁর রাজধানী হস্তিনাপুরে গেলেন। তিনি সর্ব- প্রকার রাজগুণে মণ্ডিত ছিলেন এবং কামরাগবর্জিত হয়ে ধর্মানুসারে রাজ্যশাসন করতেন। ছত্রিশ বৎসর তিনি স্ত্রীসঙ্গ ত্যাগ ক’রে বনবাসী হয়েছিলেন।