আদিপর্ব: ১৮। দীর্ঘতমা — ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম — অণীমাণ্ডব্য

পুত্রশোকাতুরা সত্যবতী তাঁর দুই বধূকে সান্ত্বনা দিয়ে ভীষ্মকে বললেন, রাজা শান্তনুর পিণ্ড কীর্তি ও বংশ রক্ষার ভার এখন তোমার উপর। তুমি ধর্মের তত্ত্ব ও কুলাচার সবই জান, এখন আমার আদেশে বংশরক্ষার জন্য দুই ভ্রাতৃবধূর গর্ভে সন্তান উৎপাদন কর, অথবা স্বয়ং রাজ্যে অভিষিক্ত হও এবং বিবাহ কর, পিতৃপুরুষগণকে নরকে নিমগ্ন করো না।

ভীষ্ম বললেন, মাতা, আমি ত্রিলোকের সমস্তই ত্যাগ করতে পারি কিন্তু যে সত্যপ্রতিজ্ঞা করেছি তা ভঙ্গ করতে পারি না। শান্তনুর বংশ যাতে রক্ষা হয় তার ক্ষত্রধর্মসম্মত উপায় বলছি শুনুন। পুরাকালে জামদগ্ন্য পরশুরাম কর্তৃক পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় হলে ক্ষত্রিয়নারীগণ বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের সহবাসে সন্তান উৎপাদন করেছিলেন, কারণ বেদে বলা আছে যে, ক্ষেত্রজ পুত্র বিবাহকারীরই পুত্র হয়। উতথ্য ঋষির পত্নী মমতা যখন গর্ভিণী ছিলেন তখন তাঁর দেবর বৃহস্পতি সংগম প্রার্থনা করেন। মমতার নিষেধ না শুনে বৃহস্পতি বলপ্রয়োগে উদ্যত হলেন, তখন গর্ভস্থ শিশু তার পা দিয়ে পিতৃব্যের চেষ্টা ব্যর্থ করলে। বৃহস্পতি শিশুকে শাপ দিলেন, তুমি অন্ধ হবে। উতথ্যের পুত্র অন্ধ হয়ে জন্মগ্রহণ করলেন, তাঁর নাম হ’ল দীর্ঘতমা। তিনি ধার্মিক ও বেদজ্ঞ ছিলেন, কিন্তু গোধর্ম (১) অবলম্বন করায় প্রতিবেশী মুনিগণ ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে ত্যাগ করলেন। দীর্ঘতমার পুত্রেরা মাতার আদেশে পিতাকে ভেলায় চড়িয়ে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিলেন। ধর্মাঙ্গ বলি রাজা তাঁকে দেখতে পেয়ে সন্তান উৎপাদনের জন্য নিয়ে গেলেন এবং মহিষী সুদেষ্ণাকে তাঁর কাছে যেতে বললেন। অন্ধ বৃদ্ধ দীর্ঘতমার কাছে সুদেষ্ণা নিজে গেলেন না, তাঁর ধাত্রীকন্যাকে পাঠালেন। সেই শূদ্রকন্যার গর্ভে কক্ষীবান প্রভৃতি এগারজন ঋষি উৎপন্ন হন। তারপর রাজার নিবন্ধে সুদেষ্ণা স্বয়ং গেলেন, দীর্ঘতমা তাঁর অঙ্গ স্পর্শ করে বললেন, তোমার পাঁচটি তেজস্বী পুত্র হবে — অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্র সুহ্ম, তাদের দেশও এই সকল নামে খ্যাত হবে। বলি রাজার বংশ এইরূপে মহর্ষি দীর্ঘতমা থেকে উৎপন্ন হয়েছিল।

(১) পশুর তুল্য যত্র তত্র সংগম।

তারপর ভীষ্ম বললেন, মাতা, বিচিত্রবীর্যের পত্নীদের গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য আপনি কোনও গুণবান ব্রাহ্মণকে অর্থ দিয়ে নিয়োগ করুন। সত্যবতী হাস্য ক’রে লজ্জিতভাবে নিজের পূর্ব ইতিহাস জানালেন এবং পরিশেষে বললেন, কন্যাবস্থায় আমার যে পুত্র হয়েছিল তাঁর নাম দ্বৈপায়ন, তিনি মহাযোগী মহর্ষি, চতুর্বেদ বিভক্ত ক'রে ব্যাস উপাধি পেয়েছেন; তিনি কৃষ্ণবর্ণ সেজন্য তাঁর অন্য নাম কৃষ্ণ। আমার এই পুত্র জন্মগ্রহণ ক’রেই পিতা পরাশরের সঙ্গে চলে যান এবং যাবার সময় আমাকে বলেছিলেন যে, প্রয়োজন হ’লে আমি ডাকলেই তিনি আসবেন। ভীষ্ম, তুমি আর আমি অনুরোধ করলে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন তাঁর ভ্রাতৃবধূদের গর্ভে পুত্র উৎপাদন করবেন।

ভীষ্ম এই প্রস্তাবের সমর্থন করলে সত্যবতী ব্যাসকে স্মরণ করলেন। ক্ষণকালমধ্যে ব্যাস আবির্ভূত হলেন, সত্যবতী তাঁকে আলিঙ্গন এবং স্তনদুগ্ধে সিক্ত ক’রে অশ্রুমোচন করতে লাগলেন। মাতাকে অভিবাদন ক'রে ব্যাস বললেন, আপনার অভিলাষ পূরণ করতে এসেছি, কি করতে হবে আদেশ করুন। সত্যবতী তাঁর প্রার্থনা জানালে ব্যাস বললেন, কেবল ধর্মপালনের উদ্দেশ্যে আমি আপনার অভীষ্ট কার্য করব। আমার নির্দেশ অনুসারে দুই রাজ্ঞী এক বৎসর ব্রতপালন ক’রে শুদ্ধ হ’ন, তবে তাঁরা আমার কাছে আসতে পারবেন। সত্যবতী বললেন, অরাজক রাজ্যে বৃষ্টি হয় না, দেবতা প্রসন্ন হন না, অতএব যাতে রাণীরা সদ্য গর্ভবতী হন তার ব্যবস্থা কর, সন্তান হ’লে ভীষ্ম তাদের পালন করবেন। ব্যাস বললেন, যদি এখনই পুত্র উৎপাদন করতে হয় তবে রাণীরা যেন আমার কুৎসিত রূপ গন্ধ আর বেশ সহ্য করেন।

সত্যবতী অনেক প্রবোধ দিয়ে তাঁর পুত্রবধূ অম্বিকাকে কোনও প্রকারে সম্মত ক’রে শয়নগৃহে পাঠালেন। অম্বিকা উত্তম শয্যায় শুয়ে ভীষ্ম এবং অন্যান্য কুরুবংশীয় বীরগণকে চিন্তা করতে লাগলেন। অনন্তর সেই দীপালোকিত গৃহে ব্যাস প্রবেশ করলেন। তাঁর কৃষ্ণ বর্ণ, দীপ্ত নয়ন ও পিঙ্গল জটা-শ্মশ্রু দেখে অম্বিকা ভয়ে চক্ষু নিমীলিত ক’রে রইলেন। ব্যাস বাইরে এলে সত্যবতী প্রশ্ন করলেন, এর গর্ভে গুণবান রাজপুত্র হবে তো? ব্যাস উত্তর দিলেন, এই পুত্র শতহস্তিতুল্য বলবান, বিদ্বান, বুদ্ধিমান এবং শতপুত্রের পিতা হবে; কিন্তু মাতার দোষে অন্ধ হবে। সত্যবতী বললেন, অন্ধ ব্যক্তি কুরুকুলের রাজা হবার যোগ্য নয়, তুমি আর একটি পুত্র দাও। সত্যবতীর অনুরোধে তাঁর দ্বিতীয় পুত্রবধূ অম্বালিকা শয়নগৃহে এলেন কিন্তু ব্যাসের মূর্তি দেখে তিনি ভয়ে পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গেলেন। সত্যবতীকে ব্যাস বললেন, এই পুত্র বিক্রমশালী খ্যাতিমান এবং পঞ্চপুত্রের পিতা হবে, কিন্তু মাতার দোষে পাণ্ডুবর্ণ হবে।

যথাকালে অম্বিকা একটি অন্ধ পুত্র এবং অম্বালিকা পাণ্ডুবর্ণ পুত্র প্রসব করলেন, তাঁদের নাম ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। অম্বিকা পুনর্বার ঋতুমতী হলে সত্যবতী তাঁকে আর একবার ব্যাসের কাছে যেতে বললেন, কিন্তু মহর্ষির রূপ আর গন্ধ মনে করে অম্বিকা নিজে গেলেন না, অপ্সরার ন্যায় রূপবতী এক দাসীকে পাঠালেন। দাসীর অভ্যর্থনা ও পরিচর্যায় তুষ্ট হয়ে ব্যাস বললেন, কল্যাণী, তুমি আর দাসী হ'য়ে থাকবে না, তোমার গর্ভস্থ পুত্র ধর্মাত্মা ও পরম বুদ্ধিমান হবে।

এই দাসীর গর্ভে বিদুর জন্মগ্রহণ করেন। মাণ্ডব্য নামে এক মৌনব্রতী ঊর্ধ্ববাহু তপস্বী ছিলেন। একদিন কয়েকজন চোর রাজরক্ষীদের ভয়ে পালিয়ে এসে মাণ্ডব্যের আশ্রমে তাদের অপহৃত ধন লুকিয়ে রাখলে। রক্ষীরা আশ্রমে এসে মাণ্ডব্যকে প্রশ্ন করলে, কিন্তু তিনি উত্তর দিলেন না। অন্বেষণের ফলে চোরর দল অপহৃত ধন সমেত ধরা পড়ল, রক্ষীরা তাদের সঙ্গে মাণ্ডব্যকেও রাজার কাছে নিয়ে গেল। রাজার আদেশে সকলকেই শূলে চড়ানো হ'ল। কিন্তু মাণ্ডব্য তপস্যার প্রভাবে জীবিত রইলেন। অবশেষে তাঁর পরিচয় পেয়ে রাজা ক্ষমা চাইলেন এবং তাঁকে শূল থেকে নামালেন, কিন্তু শূলের ভগ্ন অগ্রভাগ তাঁর দেহে রয়ে গেল। মাণ্ডব্য সেই অবস্থাতেই নানা দেশে বিচরণ ও তপস্যা করতে লাগলেন এবং শূলখণ্ডের জন্য অণী (১) মাণ্ডব্য নামে খ্যাত হলেন। একদিন তিনি ধর্মরাজের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন্ কর্মের ফলে আমাকে এই দণ্ড দিয়েছেন? ধর্ম বললেন, আপনি বাল্যকালে একটি পতঙ্গের পুচ্ছদেশে তৃণ প্রবিষ্ট করেছিলেন, তারই এই ফল। অণীমাণ্ডব্য বললেন, আপনি লঘু পাপে আমাকে গুরুদণ্ড দিয়েছেন। সর্বপ্রাণিবধের চেয়ে ব্রহ্মবধ গুরুতর। আমার শাপে আপনি শূদ্র হয়ে জন্মগ্রহণ করবেন। আজ আমি এই বিধান দিচ্ছি—চতুর্দশ (২) বৎসর বয়সের মধ্যে কেউ কিছু করলে তা পাপ ব'লে গণ্য হবে না। অণীমাণ্ডব্যের অভিশাপের ফলেই ধর্ম দাসীর গর্ভে বিদুররূপে জন্মেছিলেন।

(১) অণী—শূলাদির অগ্রভাগ।
(২) আর একটি শ্লোকে দ্বাদশ আছে।