আদিপর্ব: ১৯। গান্ধারী, কুন্তী ও মাদ্রী — কর্ণ — দুর্য্যোধনাদির জন্ম
ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডু ও বিদুরকে ভীষ্ম পুত্রবৎ পালন করতে লাগলেন। ধৃতরাষ্ট্র অসাধারণ বলবান, পাণ্ডু পরাক্রান্ত ধনুর্ধর, এবং বিদুর অদ্বিতীয় ধর্ম- পরায়ণ হলেন। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ, বিদুর শূদ্রার গর্ভজাত, একারণে পাণ্ডুই রাজপদ পেলেন।
বিদুরের সঙ্গে পরামর্শ ক’রে ভীষ্ম গান্ধাররাজ সুবলের কন্যা গান্ধারীর সঙ্গে ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহ দিলেন। অন্ধ পতিকে অতিক্রম করবেন না—এই প্রতিজ্ঞা ক’রে পতিব্রতা গান্ধারী বস্ত্রখণ্ড ভাঁজ ক’রে চোখের উপর বাঁধলেন।
বসুদেবের পিতা যদুশ্রেষ্ঠ শূরর পৃথা(১) নামে একটি কন্যা ছিল। শূর তাঁর পিতৃব্যপুত্র নিঃসন্তান কুন্তীভোজকে সেই কন্যা দান করেন। পালক পিতার নাম অনুসারে পৃথার অপর নাম কুন্তী হ’ল। একদা ঋষি দুর্বাসা অতিথি রূপে গেলে কুন্তী তাঁর পরিচর্যা করলেন, তাতে দুর্বাসা তুষ্ট হ’য়ে একটি মন্ত্র শিখিয়ে বললেন, এই মন্ত্র দ্বারা তুমি যে যে দেবতাকে আহ্বান করবে তাঁদের প্রসাদে তোমার পুত্রলাভ হবে। কৌতূহলবশে কুন্তী সূর্যকে ডাকলেন। সূর্য আবির্ভূত হ’য়ে বললেন, অসিতনয়না, তুমি কি চাও? দুর্বাসার বরের কথা জানিয়ে কুন্তী নতমস্তকে ক্ষমা চাইলেন। সূর্য বললেন, তোমার আহ্বান বৃথা হবে না, আমার সঙ্গে মিলনের ফলে তুমি পুত্র লাভ করবে এবং কুমারীই থাকবে। কুন্তীর একটি দেবকুমার তুল্য পুত্র হ’ল। এই পুত্র স্বাভাবিক কবচ (বর্ম) ও কুণ্ডল ধারণ ক’রে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন, ইনিই পরে কর্ণ নামে খ্যাত হন। কলঙ্কের ভয়ে কুন্তী তাঁর পুত্রকে একটি পাত্রে রেখে জলে ভাসিয়ে দিলেন। সূতবংশীয় অধিরথ ও তাঁর পত্নী রাধা সেই বালককে দেখতে পেয়ে ঘরে নিয়ে গেলেন এবং বসুষেণ নাম দিয়ে পুত্রবৎ পালন করলেন। কর্ণ বড় হয়ে সকল প্রকার অস্ত্রের প্রয়োগ শিখলেন। তিনি প্রতিদিন মধ্যাহ্নকাল পর্যন্ত সূর্যের উপাসনা করতেন। একদিন ব্রাহ্মণবেশী ইন্দ্র কর্ণের কাছে এসে তাঁর কবচ (২) প্রার্থনা করলেন। কর্ণ নিজের দেহ থেকে কবচটি কেটে দিলে ইন্দ্র তাঁকে শক্তি অস্ত্র দান ক’রে বললেন, তুমি যার উপর এই অস্ত্র ক্ষেপণ করবে সে মরবে, কিন্তু একজন নিহত হ’লেই অস্ত্রটি আমার কাছে ফিরে আসবে। কবচ কেটে দেওয়ার জন্য বসুষেণের নাম কর্ণ ও বৈকর্তন হয়।
রাজা কুন্তীভোজ তাঁর পালিতা কন্যার বিবাহের জন্য স্বয়ংবরসভা আহ্বান করলে কুন্তী নরশ্রেষ্ঠ পাণ্ডুর গলায় বরমাল্য দিলেন। পাণ্ডুর আর একটি বিবাহ দেবার ইচ্ছায় ভীষ্ম মদ্রদেশের রাজা বাহ্লীকবংশীয় শল্যের কাছে গিয়ে তাঁর ভগিনীকে প্রার্থনা করলেন। শল্য বললেন, আমাদের বংশের একটি নিয়ম নিশ্চয় আপনার জানা আছে। ভালই হ’ক বা মন্দই হ’ক আমি কুলধর্ম লঙ্ঘন করতে পারি না। ভীষ্ম উত্তর দিলেন, কুলধর্ম পালনে কোনও দোষ নেই। এই বলে তিনি স্বর্ণ রত্ন গজ অশ্ব প্রভৃতি ধন বিবাহের পণ রূপে শল্যকে দিলেন। শল্য প্রীত হয়ে তাঁর ভগিনী মাদ্রীকে দান করলেন, ভীষ্ম সেই কন্যাকে হস্তিনাপুরে এনে পাণ্ডুর সঙ্গে বিবাহ দিলেন। দেবক রাজার শূদ্রা পত্নীর গর্ভে ব্রাহ্মণ কর্তৃক একটি কন্যা উৎপাদিত হয়েছিল, তাঁর সঙ্গে বিদুরের বিবাহ হ’ল।
কিয়ৎকাল পরে মহারাজ পাণ্ডু সসৈন্যে নির্গত হয়ে নানা দেশ জয় ক’রে বহু ধন নিয়ে স্বরাজ্যে ফিরে এলেন এবং ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতিক্রমে সেই সমস্ত ধন ভীষ্ম, দুই মাতা ও বিদুরকে উপহার দিলেন। তারপর তিনি দুই পত্নীর সঙ্গে বনে গিয়ে মৃগয়া করতে লাগলেন।
ব্যাস বর দিয়েছিলেন যে গান্ধারীর শত পুত্র হবে। যথাকালে গান্ধারী গর্ভবতী হলেন, কিন্তু দুই বৎসরেও তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হ’ল না এবং কুন্তীর একটি পুত্র (যুধিষ্ঠির) হয়েছে জেনে তিনি অধীর ও ঈর্ষান্বিত হলেন। ধৃতরাষ্ট্রকে না জানিয়ে গান্ধারী নিজের গর্ভপাত করলেন, তাতে লৌহের ন্যায় কঠিন একটি মাংসপিণ্ড প্রসূত হ’ল। তিনি সেই পিণ্ড ফেলে দিতে যাচ্ছিলেন এমন সময় ব্যাস এসে বললেন, আমার কথা মিথ্যা হবে না। ব্যাসের উপদেশে গান্ধারী শীতল জলে মাংসপিণ্ড ভিজিয়ে রাখলেন, তা থেকে অঙ্গুষ্ঠপ্রমাণ এক শ এক ভ্রূণ পৃথক হ’ল। সেই ভ্রূণগুলিকে তিনি পৃথক পৃথক ঘৃতপূর্ণ কলসে রাখলেন। এক বৎসর পরে একটি কলসে দুর্যোধন জন্মগ্রহণ করলেন। তাঁর পূর্বেই কুন্তীপুত্র যুধিষ্ঠির জন্মেছিলেন, সে কারণে যুধিষ্ঠিরই জ্যেষ্ঠ। দুর্যোধন ও ভীম একই দিনে জন্মগ্রহণ করেন।
দুর্যোধন জন্মেই গর্ভভের ন্যায় কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার ক’রে উঠলেন, সঙ্গে সঙ্গে গৃধ্র শৃগাল কাক প্রভৃতিও ডাকতে লাগল এবং অন্যান্য দুর্লক্ষণ দেখা গেল। ধৃতরাষ্ট্র ভয় পেয়ে ভীষ্ম বিদুর প্রভৃতিকে বললেন, আমাদের বংশের জ্যেষ্ঠ রাজপুত্র যুধিষ্ঠির তো রাজ্য পাবেই, কিন্তু তার পরে আমার এই পুত্র রাজা হবে তো? শৃগালাদি শ্বাপদ জন্তুরা আবার ডেকে উঠল। তখন ব্রাহ্মণগণ ও বিদুর বললেন, আপনার পুত্র নিশ্চয় বংশ নাশ করবে, ওকে পরিত্যাগ করাই মঙ্গল। পুত্রস্নেহের বশে ধৃতরাষ্ট্র তা করলেন না। এক মাসের মধ্যে তাঁর দুর্যোধন দুঃশাসন দুঃসহ প্রভৃতি একশত পুত্র এবং দুঃশলা নামে একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করল। ধৃতরাষ্ট্রের এক বৈশ্যপত্নী ছিল, তাঁর গর্ভে যুযুৎসু নামে ধৃতরাষ্ট্রের আর একটি পুত্র জন্মেছিল।