আদিপর্ব: ২১। হস্তিনাপুরে পঞ্চপাণ্ডব — ভীষ্মের নাগলোকদর্শন

পাণ্ডুর আশ্রমের নিকট যে সকল ঋষি বাস করতেন তাঁরা মন্ত্রণা ক’রে পাণ্ডু ও মাদ্রীর মৃতদেহ এবং কুন্তী ও রাজপুত্রদের নিয়ে হস্তিনাপুরে গেলেন। এই সময়ে যুধিষ্ঠিরের বয়স ষোল, ভীমের পনর, অর্জুনের চৌদ্দ এবং নকুল-সহদেবের তের। ঋষিরা রাজসভায় এলে কৌরবগণ প্রণত হয়ে সংবর্ধনা করলেন। ঋষিদের মধ্যে যিনি বৃদ্ধতম তিনি পাণ্ডু ও মাদ্রীর মৃত্যুবিবরণ এবং যুধিষ্ঠিরাদির পরিচয় দিলেন এবং সভাস্থ সকলকে বিস্মিত ক’রে সঙ্গিগণসহ অন্তর্হিত হলেন।

ধৃতরাষ্ট্রের আদেশে বিদুর পাণ্ডু ও মাদ্রীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করলেন। ত্রয়োদশ দিনে শ্রাদ্ধাদি কৃত্য সম্পন্ন হ’ল, সকলে দুঃখিত মনে রাজপুরীতে ফিরে এলেন। তখন ব্যাস দেব বিহ্বলা সত্যবতীর কাছে এসে বললেন, মাতা, সুখের দিন শেষ হয়েছে, পৃথিবী এখন গতযৌবনা, ক্রমশ পাপের বৃদ্ধি হবে, কৌরবদের দুর্নীতির ফলে ধর্মকর্ম লোপ পাবে। কুরুবংশের ক্ষয় যেন আপনাকে দেখতে না হয়, আপনি তপোবনে গিয়ে যোগ অবলম্বন করুন। সত্যবতী তাঁর পুত্রবধূ অম্বিকা ও অম্বালিকাকে ব্যাসের কথা জানিয়ে বললেন, তোমরাও আমার সঙ্গে চল। তারপর তাঁরা তিনজনে বনে গিয়ে ঘোর তপস্যায় দেহ ত্যাগ করে ইষ্টলোকে গেলেন।

পঞ্চপাণ্ডব তাঁদের পিতৃগৃহে সুখে বাস করতে লাগলেন। নানাবিধ ক্রীড়ায় ভীমই সর্বাধিক শক্তি দেখাতেন। তিনি ধৃতরাষ্ট্রপুত্রদের মাথা ঠোকাঠুকি করিয়ে, জলে ডুবিয়ে এবং অন্যান্য প্রকারে নিগ্রহ করতেন। বাহুযুদ্ধে, গমনের বেগে বা ব্যায়ামের অভ্যাসে কেউ তাঁকে হারাতে পারত না। ভীমের মনে কোনও বিদ্বেষ ছিল না, তথাপি তিনি বালসুলভ প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ধার্তরাষ্ট্রগণের অপ্রিয় হলেন।

দুর্যোধন গঙ্গাতীরে প্রমাণকোটি নামক স্থানে উদকক্রীড়ন নাম দিয়ে একটি সুসজ্জিত আবাস রচনা করলেন এবং সেখানে নানাপ্রকার খাদ্যদ্রব্য রাখিয়ে পঞ্চপাণ্ডবকে ডেকে নিয়ে গেলেন। সেখানকার উদ্যানে সকলে খেলাচ্ছলে পরস্পরের মুখে খাদ্য তুলে দিতে লাগলেন, সেই সুযোগে পাপমতি দুর্যোধন ভীমকে কালকূট বিষ মিশ্রিত খাদ্য দিলেন। জলক্রীড়ার পর সকলে বিহারগৃহে বিশ্রাম করতে গেলেন, কিন্তু ভীম অত্যন্ত শ্রান্ত এবং বিষের প্রভাবে অচেতন হয়ে গঙ্গাতীরে পড়ে রইলেন। দুর্যোধন তাঁকে লতা দিয়ে বেঁধে জলে ফেলে দিলেন।

সংজ্ঞাহীন ভীম জলে নিমগ্ন হয়ে নাগলোকে উপস্থিত হলেন। মহাবিষ সর্পগণ তাঁকে দংশন করতে লাগল, সেই জঙ্গম সর্পবিষে স্থাবর কালকূট বিষ নাশ হল। চেতনা পেয়ে ভীম তাঁর বন্ধন ছিন্ন করে সর্প বধ করতে লাগলেন। তখন কতকগুলি সর্প নাগরাজ বাসুকির কাছে গিয়ে সংবাদ দিলে। বাসুকি ভীমের কাছে গিয়ে তাঁকে নিজের দৌহিত্রের দৌহিত্র, অর্থাৎ কুন্তীভোজের দৌহিত্র বলে চিনতে পেরে গাঢ় আলিঙ্গন করলেন। বাসুকি বললেন, একে ধনরত্ন দিয়ে সুখী কর। একজন নাগ বললে, ধন দিয়ে কি হবে, যদি আপনি তুষ্ট হয়ে থাকেন তবে এই কুমারকে রসায়ন পান করতে দিন। বাসুকির আজ্ঞায় নাগগণ ভীমকে রসায়নকুণ্ডের কাছে নিয়ে গেল। ভীম স্বস্ত্যয়ন করে শুচি হয়ে পূর্বমুখে বসলেন এবং এক নিঃশ্বাসে এক-একটি কুণ্ডের রস পান করে আটটি কুণ্ড নিঃশেষ করলেন। তারপর তিনি নাগদত্ত উত্তম শয্যায় শুয়ে সুখে নিদ্রিত হলেন।

জলবিহার শেষ ক'রে কৌরব (১) ও পাণ্ডবগণ ভীমকে দেখতে পেলেন না। ভীম আগেই চলে গেছেন মনে ক'রে তাঁরা রথ গজ ও অশ্বে হস্তিনাপুরে ফিরে গেলেন। ভীমকে না দেখে কুন্তী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হলেন। বিদুর যুধিষ্ঠির প্রভৃতি সমস্ত নগরোদ্যানে অন্বেষণ ক'রেও কোথাও তাঁকে পেলেন না। কুন্তীর ভয় হ'ল, হয়তো ক্রুর দুর্যোধন ভীমকে হত্যা করেছে। বিদুর তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বললেন, এমন কথা বলবেন না, মহামুনি ব্যাস বলেছেন আপনার পুত্রেরা দীর্ঘায়ু হবে।

(১) ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু দুজনেই কুরুবংশজাত সেজন্য কৌরব। তথাপি সাধারণতঃ দুর্যোধনাদিকেই কৌরব এবং তাঁদের পক্ষকে কুরু বলা হয়।

অষ্টম দিনে ভীমের নিদ্রাভঙ্গ হ'ল। নাগগণ তাঁকে বললে, রসায়ন জীর্ণ ক'রে তুমি অযুত হস্তীর বল পেয়েছ, এখন দিব্য জলে স্নান ক'রে গৃহে যাও। ভীম স্নান ক'রে উত্তম অন্ন ভোজন করলেন এবং নাগদের আশীর্বাদ নিয়ে দিব্য আভরণে ভূষিত হয়ে স্বগৃহে ফিরে গেলেন। সকল বৃত্তান্ত শুনে যুধিষ্ঠির বললেন, চুপ ক'রে থাক, এ বিষয় নিয়ে আলোচনা ক'রো না, এখন থেকে আমাদের সাবধানে থাকতে হবে। দুর্যোধন বিফলমনোরথ হয়ে মনস্তাপ ভোগ করতে লাগলেন।

রাজকুমারদের শিক্ষার জন্য ধৃতরাষ্ট্র গৌতমগোত্রজ কৃপাচর্যকে নিযুক্ত করলেন।