আদিপর্ব: ২০। যুধিষ্ঠিরাদির জন্ম — পাণ্ডু ও মাদ্রীর মৃত্যু
মহারাজ পাণ্ডু বনে গিয়ে দুই পত্নীর সঙ্গে মৃগয়া করতে করতে অত্যন্ত হৃষ্টমনে কালযাপন করছিলেন। একদা তিনি বনে একটি হরিণ ও হরিণীকে সঙ্গমরত দেখে তাঁদের বাণবিদ্ধ করলেন। কিন্তু তাঁরা প্রকৃত হরিণ-হরিণী ছিলেন না; কিন্দম নামে এক পরম তেজস্বী ঋষি তাঁর পত্নীর সঙ্গে হরিণরূপে বিহার করছিলেন। বাণবিদ্ধ হয়ে ঋষি কিন্দম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নিজের আসল রূপ ধারণ করলেন এবং অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে পাণ্ডুকে বললেন, রাজা, তুমি অত্যন্ত নিষ্ঠুর কাজ করেছ। সঙ্গমকালে পশুকে বধ করাও অধর্ম, আর আমি পরম তপস্বী ব্রাহ্মণ। তুমি যেমন আমাকে আনন্দকালে বাণবিদ্ধ করে হত্যা করলে, সেইরূপ তুমিও যখন স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গমে প্রবৃত্ত হবে, তখনই তোমার মৃত্যু হবে। এই অভিশাপ দিয়ে ঋষি কিন্দম প্রাণত্যাগ করলেন।
পাণ্ডু কিন্দম ঋষির অভিশাপে অত্যন্ত সন্তপ্ত ও লজ্জিত হয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করলেন। তিনি মস্তকে অঞ্জলি রেখে তাঁর দুই মহিষী কুন্তী ও মাদ্রীকে বললেন, আমি আজ থেকে রাজ্যভোগ ও গৃহসুখ ত্যাগ করলাম, তোমরা হস্তিনাপুরে ফিরে যাও। কুন্তী ও মাদ্রী রোদন ক’রে বললেন, আমরা সর্বদা তোমার অনুগমন করব, তোমার সঙ্গেই বনে তপস্যা করব। পাণ্ডু তাঁদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আমি আজ থেকে ব্রহ্মচর্য ব্রত গ্রহণ করব, তোমরা আমার সঙ্গেই বনে থাক।
অপুত্রক ব্যক্তির গতি নেই, ইহলোক বা পরলোকে সুখ নেই—পাণ্ডু সর্বদা এই চিন্তা ক’রে অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি বনের ঋষিগণের সভায় গিয়ে কুরুকুলের সন্তানোৎপত্তির জন্য তাঁদের শরণাপন্ন হলেন এবং রোদন করতে করতে বললেন, হে মহর্ষিগণ, কিন্দম ঋষির অভিশাপে আমি অপুত্রক অবস্থায় রয়েছি, মস্তকে অঞ্জলি রেখে অনুনয় করছি, এই ঘোর সংকটের উপায় আপনারা বলুন। ঋষিরা বললেন, রাজা, আমরা দিব্য চক্ষুতে দেখছি তোমার দেবতুল্য পুত্র হবে।
পাণ্ডু নির্জনে কুন্তীকে বললেন, তুমি সন্তান লাভের জন্য চেষ্টা কর, আপৎকালে স্ত্রীলোক উত্তম বর্ণের পুরুষ অথবা দেবর থেকে পুত্রলাভ করতে পারে। কুন্তী বললেন, আমি শুনেছি রাজা ব্যুষিতাশ্ব যক্ষ্মা রোগে প্রাণত্যাগ করলে তাঁর মহিষী ভদ্রা মৃতপতির সহিত সঙ্গমে গর্ভবতী হয়েছিলেন। তুমিও তপস্যার প্রভাবে আমার গর্ভে মানস পুত্র উৎপাদন করতে পার। পাণ্ডু বললেন, ব্যুষিতাশ্ব দেবতুল্য শক্তিমান ছিলেন, আমার তেমন শক্তি নেই। আমি প্রাচীন ধর্মতত্ত্ব বলছি শোন। পুরাকালে নারীরা স্বাধীন ছিল, তারা স্বামীকে ছেড়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিচরণ করত, তাতে দোষ হত না কারণ প্রাচীন ধর্মই এইপ্রকার। উত্তরকুরু-দেশবাসী এখনও সেই ধর্মানুসারে চলে। এদেশেও সেই প্রাচীন প্রথা অধিককাল রহিত হয় নি। উদ্দালক নামে এক মহর্ষি ছিলেন, তাঁর পুত্রের নাম শ্বেতকেতু। একদিন শ্বেতকেতু দেখলেন, তাঁর পিতার সমক্ষেই এক ব্রাহ্মণ তাঁর মাতার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন। উদ্দালক শ্বেতকেতুকে বললেন, তুমি ক্রুদ্ধ হয়ো না, সনাতন ধর্মই এই, পৃথিবীতে সকল স্ত্রীলোকই গরুর তুল্য স্বাধীন। শ্বেতকেতু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, আজ থেকে যে নারী পরপুরুষগামিনী হবে, যে পুরুষ পতিব্রতা পত্নীকে ত্যাগ ক’রে অন্য নারীর সংসর্গ করবে, এবং যে নারী পতির আজ্ঞা পেয়েও ক্ষেত্রজ পুত্র উৎপাদনে আপত্তি করবে, তাদের সকলেরই ভ্রূণহত্যার পাপ হবে। কুন্তী, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন থেকে আমাদের জন্ম হয়েছে তা তুমি জান। আমি পুত্রপ্রার্থী, মস্তকে অঞ্জলি রেখে অনুনয় করছি, তুমি কোনও তপস্বী ব্রাহ্মণের কাছে গুণবান পুত্র লাভ কর।
কুন্তী তখন দুর্বাসার বরের বৃত্তান্ত পাণ্ডুকে জানিয়ে বললেন, মহারাজ, তুমি অনুমতি দিলে আমি কোনও দেবতা বা ব্রাহ্মণকে মন্ত্রবলে আহ্বান করতে পারি। দেবতার কাছে সদ্য পুত্রলাভ হবে, রহস্যের পর বিলম্বে হবে। পাণ্ডু বললেন, আমি ধন্য হয়েছি, অনুগৃহীত হয়েছি, তুমিই আমাদের বংশের রক্ষিত্রী। দেবগণের মধ্যে ধর্মই সর্বাপেক্ষা পুণ্যবান, আজই তুমি তাঁকে আহ্বান কর।
গান্ধারী যখন এক বৎসর গর্ভধারণ করেছিলেন সেই সময়ে কুন্তী মন্ত্রবলে ধর্মকে আহ্বান করলেন। শতশৃঙ্গ পর্বতের উপর ধর্মের সহিত সঙ্গমের ফলে কুন্তী গর্ভবতী হলেন। প্রসবকালে দৈববাণী হল—এই বালক ধার্মিকগণের শ্রেষ্ঠ, বিক্রান্ত, সত্যবাদী ও পৃথিবীপতি হবে, এবং যুধিষ্ঠির নামে খ্যাত হবে।
তার পর পাণ্ডুর ইচ্ছাক্রমে বায়ু ও ইন্দ্রকে আহ্বান ক’রে কুন্তী ভীম ও অর্জুন নামে আরও দুই পুত্র লাভ করলেন। একদিন মাদ্রী পাণ্ডুকে বললেন, মহারাজ, কুন্তী আমার সপত্নী, তাঁকে আমি কিছু বলতে সাহস করি না, কিন্তু তুমি বললে তিনি আমাকেও পুত্রবর্তী করতে পারেন। পাণ্ডু অনুরোধ করলে কুন্তী সম্মত হলেন এবং তাঁর উপদেশে মাদ্রী অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে স্মরণ ক’রে নকুল ও সহদেব নামে যমজ পুত্র লাভ করলেন। মাদ্রীর আরও পুত্রের জন্য পাণ্ডু অনুরোধ করলে কুন্তী বললেন, আমি মাদ্রীকে বলেছিলাম—কোনও এক দেবতাকে স্মরণ কর, কিন্তু সে যুগল দেবতাকে আহ্বান ক’রে আমাকে প্রতারিত করেছে। মহারাজ, আমাকে আর অনুরোধ ক’রো না।
দেবতার প্রসাদে লব্ধ পাণ্ডুর এই পঞ্চ পুত্র কালক্রমে চন্দ্রের ন্যায় প্রিয়দর্শন, সিংহের ন্যায় বলশালী এবং দেবতার ন্যায় তেজস্বী হ’ল। একদিন রমণীয় বসন্তকালে পাণ্ডু নির্জনে মাদ্রীকে দেখে সংযম হারালেন এবং পত্নীর নিষেধ অগ্রাহ্য ক’রে তাঁকে সবলে গ্রহণ করলেন। শাপের ফলে সঙ্গমকালেই পাণ্ডুর প্রাণবিয়োগ হ’ল। মাদ্রীর আর্তনাদ শুনে কুন্তী সেখানে এলেন এবং বিলাপ ক’রে বললেন, আমি রাজাকে সর্বদা সাবধানে রক্ষা করতাম, তুমি এই বিজন স্থানে কেন তাঁকে লোভিত করলে? তুমি আমার চেয়ে ভাগ্যবতী, তাঁকে হৃষ্ট দেখেছ। আমি জ্যেষ্ঠা ধর্মপত্নী, সেজন্য ভর্তার সহমৃতা হব। তুমি এই বালকদের পালন কর। মাদ্রী বললেন, আমি কামভোগে তৃপ্ত হই নি, অতএব পতির অনুসরণ করব। তোমার তিন পুত্রকে আমি নিজ পুত্রের ন্যায় দেখতে পারব না, তুমিই আমার দুই পুত্রকে নিজপুত্রবৎ পালন কর। এই বলে মাদ্রী পাণ্ডুর সহগমনকামনায় প্রাণত্যাগ করলেন।