আদিপর্ব: ২৮। একচক্রা — বক রাক্ষস
পাণ্ডবরা একচক্রা নগরে ব্রাহ্মণের বেশে ভিক্ষোপজীবী হয়ে বাস করতে লাগলেন। যুধিষ্ঠিরাদি চার ভ্রাতা যা ভিক্ষা ক’রে আনতেন, কুন্তী তার অর্ধেক ভীমকে দিতেন এবং অবশিষ্ট অর্ধেক সকলে মিলে আহার করতেন। একদিন যুধিষ্ঠিরাদি চার ভাই ভিক্ষায় গিয়েছেন, ভীম ও কুন্তী বাড়িতে আছেন, এমন সময় তাঁরা শুনতে পেলেন যে গৃহস্বামী ব্রাহ্মণ ও তাঁর পরিবারের লোকজন শোকে বিলাপ করছেন। কুন্তী দয়াপরবশ হয়ে তাঁদের কাছে গেলেন।
ব্রাহ্মণ বিলাপ ক’রে বলছিলেন— হায়, এই নশ্বর মানুষ-জন্ম বড়ই কষ্টের। আমরা এই রাক্ষসের শাসিত দেশে বাস করছি, যেখানে আমাদের প্রাণ রক্ষা করার কেউ নেই। আজ আমার পালা এসেছে, আমাকে অন্ন ও মহিষ নিয়ে বক রাক্ষসের কাছে যেতে হবে। আমি গেলে আমার স্ত্রী ও সন্তানরা নিরাশ্রয় হয়ে পড়বে। স্ত্রী গেলে শিশুদের কে দেখবে? আমার এই পরম সুন্দরী কন্যা ও অবোধ শিশু পুত্রকে ত্যাগ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি অগত্যা স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সকলকেই নিয়ে রাক্ষসের ভক্ষ্য হব।
ব্রাহ্মণী স্বামীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন— স্বামী, আপনি শোক করবেন না। সতী স্ত্রীর ধর্মই হ’ল পতির জন্য আত্মত্যাগ করা। আমি আপনার পরিবর্তে যাব, এতে আমার অক্ষয় পুণ্য লাভ হবে। আপনি জীবিত থাকলে আমার সন্তানদের রক্ষা করতে পারবেন। তার পর তাঁদের কন্যা ও ছোট পুত্রও নিজেদের ত্যাগ করার কথা ব’লে রোদন করতে লাগল। ছোট ছেলেটি একগাছি ঘাস হাতে নিয়ে আধো-আধো স্বরে বললে— এই দিয়ে আমি রাক্ষসকে মেরে ফেলব। তাঁদের সেই করুণ বিলাপ ও আর্তনাদ শুনে কুন্তী স্থির থাকতে পারলেন না।
কুন্তী জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাদের দুঃখের কারণ কি বলুন, যদি পারি তো দূর করতে চেষ্টা করব। ব্রাহ্মণ বললেন, এই নগরের নিকট বক নামে এক মহাবল রাক্ষস বাস করে, সেই এদেশের প্রভু। আমাদের রাজা তাঁর রাজধানী একচক্রাপুরে থাকেন, তিনি নির্বোধ ও দুর্ব্বল, প্রজারক্ষার উপায় জানেন না। বক রাক্ষস এই দেশ রক্ষা করে, তার মূল্যস্বরূপ আমাদের প্রতিদিন একজন লোককে পাঠাতে হয়, সে প্রচুর অন্ন ও দুই মহিষ সঙ্গে নিয়ে যায়। বক সেই মানুষ মহিষ আর অন্ন ভোজন করে। আজ আমার পালা, আমার এমন ধন নেই যে অন্য কোনও মানুষকে কিনে নিয়ে রাক্ষসের কাছে পাঠাই। অগত্যা আমি স্ত্রী পুত্র কন্যাকে নিয়ে তার কাছে যাব, আমাদের সকলকেই সে খেয়ে ফেলুক।
কুন্তী বললেন, আপনি দুঃখ করবেন না, আমার পাঁচ পুত্রের একজন রাক্ষসের কাছে যাবে। ব্রাহ্মণ বললেন, আপনারা আমার শরণাগত ব্রাহ্মণ অতিথি আমাদের জন্য আপনার পুত্রের প্রাণনাশ হতে পারে না। কুন্তী বললেন, আমার পুত্র বীর্য্যবান মন্ত্রসিদ্ধ ও তেজস্বী, সে রাক্ষসের খাদ্য পৌঁছিয়ে দিয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু আপনি কারও কাছে প্রকাশ করবেন না, কারণ মন্ত্রশক্তির জন্য লোকে আমার পুত্রের উপর উপদ্রব করবে। কুন্তীর কথা শুনে ব্রাহ্মণ অতিশয় হৃষ্ট হলেন। এমন সময় যুধিষ্ঠিরাদি ভিক্ষা নিয়ে ফিরে এলেন। ভীম রাক্ষসের কাছে যাবেন শুনে যুধিষ্ঠির মাতাকে বললেন, যাঁর বাহুবলের ভরসায় আমরা সুখে নিদ্রা যাই, যাঁর ভয়ে দুর্যোধন প্রভৃতি বিনিদ্র থাকে, যিনি জতুগৃহ থেকে আমাদের উদ্ধার করেছেন, সেই ভীমসেনকে আপনি কোন্ বুদ্ধিতে ত্যাগ করছেন? কুন্তী বললেন, যুধিষ্ঠির, ভীমের বল অযুত হস্তীর সমান, তার তুল্য বলবান কেউ নেই। এই ব্রাহ্মণের গৃহে আমরা সুখে নিরাপদে বাস করছি, এ'র প্রত্যুপকার করা আমাদের কর্তব্য।
রাত্রি প্রভাত হ'লে ভীম অন্ন নিয়ে বক রাক্ষস যেখানে থাকে সেই বনে গেলেন এবং তার নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। সে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে মহাবেগে ভীমের কাছে এসে দেখলে, ভীম অন্ন ভোজন করছেন। বক বললে, আমার অন্ন আমার সম্মুখেই কে খাচ্ছে, কোন্ দুর্বুদ্ধি যমালয়ে যেতে ইচ্ছা হয়েছে? ভীম মুখ ফিরিয়ে হাসতে হাসতে খেতে লাগলেন। রাক্ষস দুই হাত দিয়ে ভীমের পিঠে আঘাত করলে, কিন্তু ভীম গ্রাহ্য করলেন না। রাক্ষস একটা গাছ নিয়ে আক্রমণ করতে এল। ভীম ভোজন শেষ ক'রে আচমন ক'রে বাঁ হাতে রাক্ষসের নিক্ষিপ্ত গাছ ধরে ফেললেন। তখন দুজনে বাহুযুদ্ধ হতে লাগল, ভীম বক রাক্ষসকে ভূমিতে ফেলে নিষ্পিষ্ট ক'রে বধ করলেন। রাক্ষসের চীৎকার শুনে তার আত্মীয় পরিজন ভয় পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ভীম তাদের বললেন, তোমরা আর কখনও মানুষের হিংসা করবে না, যদি কর তবে তোমাদেরও প্রাণ যাবে। রাক্ষসরা ভীমের আদেশ মেনে নিলে। তারপর ভীম রাক্ষসের মৃতদেহ নগরের দ্বারদেশে ফেলে দিয়ে অন্যের অজ্ঞাতসারে ব্রাহ্মণের গৃহে ফিরে এলেন। নগরবাসীরা আশ্চর্য হয়ে ব্রাহ্মণের কাছে সংবাদ নিতে গেল। ব্রাহ্মণ বললেন, একজন মন্ত্রসিদ্ধ মহাত্মা আমাদের রোদনে দয়ার্দ্র হয়ে আমার পরিবর্তে রাক্ষসের কাছে অন্ন নিয়ে গিয়েছিলেন, নিশ্চয় তিনিই তাকে বধ ক'রে সকলের হিতসাধন করেছেন।