আদিপর্ব: ২৯। ধৃষ্টদ্যুম্ন ও দ্রৌপদীর জন্ম-বৃত্তান্ত — গন্ধর্ব্বরাজ অঙ্গারপর্ণ

কিছুকাল পরে পাণ্ডবদের আশ্রয়দাতা ব্রাহ্মণের গৃহে অন্য এক ব্রাহ্মণ অতিথি রূপে উপস্থিত হলেন। ইনি বিবিধ উপাখ্যান এবং নানাদেশের আশ্চর্য বিবরণের প্রসঙ্গে বললেন, পাঞ্চালরাজকন্যা দ্রৌপদীর স্বয়ংবর হবে। পাণ্ডবগণ সবিশেষ জানতে চাইলে তিনি এই ইতিহাস বললেন। —

দ্রোণাচার্য্যের নিকট পরাজয়ের পর দ্রুপদ প্রতিশোধ ও পুত্রলাভের জন্য অত্যন্ত ব্যগ্র হলেন। তিনি গঙ্গা ও যমুনার তীরে বিচরণ করতে করতে একটি ব্রাহ্মণবসতিতে এলেন। সেখানে যাজ ও উপযাজ নামক দুই ব্রহ্মর্ষি বাস করতেন। পাদসেবার উপযাজকে তুষ্ট ক'রে দ্রুপদ বললেন, আমি আপনাকে দশ কোটি গো দান করব, আপনি আমাকে এমন পুত্র পাইয়ে দিন যে দ্রোণকে বধ করবে। উপযাজ সম্মত হলেন না, তথাপি দ্রুপদ তাঁর পরিচর্যা করতে লাগলেন। এক বৎসর পরে উপযাজ বললেন, আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যাজ শুচি অশুচি বিচার করেন না, আমি তাঁকে ভূমিতে পতিত ফল তুলে নিতে দেখেছি। ইনি গুরুগৃহে বাসকালে অন্যের উচ্ছিষ্ট ভিক্ষান্ন ভোজন করতেন। আমার মনে হয় ইনি ধন চান, আপনার জন্য পুরোহিত যজ্ঞ করবেন। যাজের প্রতি অশ্রদ্ধা হ'লেও দ্রুপদ তাঁর কাছে গিয়ে প্রার্থনা জানালেন। যাজ সম্মত হলেন এবং উপযাজকে সহায়রূপে নিযুক্ত করলেন।

যজ্ঞ শেষ হ'লে যাজ দ্রুপদমহিষীকে ডেকে বললেন, রাজ্ঞী, আসুন, আপনার দুই সন্তান উপস্থিত হয়েছে। মহিষী বললেন, আমার মুখপ্রক্ষালন আর স্নান হয় নি, আপনি অপেক্ষা করুন। যাজ বললেন, যজ্ঞাগ্নিতে আমি আহুতি দিচ্ছি। উপযাজ মন্ত্রপাঠ করছেন, এখন তা থেকে অভীষ্টলাভ হবেই, আপনি আসুন বা না আসুন। যাজ আহুতি দিলে যজ্ঞাগ্নি থেকে এক অগ্নিবর্ণ বর্ম-মুকুটভূষিত খড়্গধনুৰ্বাণধারী কুমার সগর্জনে উত্থিত হলেন। পাঞ্চালগণ হৃষ্ট হয়ে সাধু সাধু বলতে লাগল, আকাশবাণী হ’ল — এই রাজপুত্র দ্রোণবধ করে রাজার শোক দূর করবেন। তারপর যজ্ঞবেদী থেকে কুমারী পাঞ্চালী উঠলেন, তিনি সুদর্শনা, শ্যামবর্ণা, পদ্মপলাশাক্ষী, কুঞ্চিতকৃষ্ণকেশী, পীনপয়োধরা, তাঁর নীলোৎপলতুল্য সৌরভ এক ক্রোশ দূরেও অনুভূত হয়। আকাশবাণী হ’ল — সব নারীর শ্রেষ্ঠা এই কৃষ্ণা হতে ক্ষত্রিয়ক্ষয় এবং কুরুবংশের মহাভয় উপস্থিত হবে। দ্রুপদ ও তাঁর মহিষী এই কুমার-কুমারীকে পুত্ৰকন্যা রূপে লাভ ক'রে অতিশয় সন্তুষ্ট হলেন। ধৃষ্ট (প্রগল্‌ভ) ও দদ্যুম্ন (দ্যুতি, যশ, বীর্য, ধন)-সমন্বিত এই কারণে কুমারের নাম ধৃষ্টদ্যুম্ন হ’ল। শ্যাম বর্ণের জন্য এবং আকাশবাণী অনুসারে কুমারীর নাম কৃষ্ণা হ’ল। দৈব অনিবাৰ্য এই জেনে এবং নিজ কীর্তি রক্ষার জন্য দ্রোণাচার্য ধৃষ্টদ্যুম্নকে স্বগৃহে এনে অস্ত্রশিক্ষা দিলেন।

এই বৃত্তান্ত শুনে পাণ্ডবগণ বিষণ্ণ হলেন। কুন্তী যুধিষ্ঠিরকে বললেন, আমরা এই ব্রাহ্মণের গৃহে বহুকাল বাস করেছি, এদেশে যে রমণীয় বন-উপবন আছে তাও দেখা হয়েছে, এখন ভিক্ষাও পূর্বের ন্যায় যথেষ্ট পাওয়া যাচ্ছে না। যদি তোমরা ভাল মনে কর তবে পাঞ্চাল দেশে চল। পাণ্ডবগণ সম্মত হলেন। এই সময়ে ব্যাস পুনৰ্বার তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। নানা বিচিত্র কথাপ্রসঙ্গে তিনি বললেন, কোনও এক ঋষির একটি পরমা সুন্দরী কন্যা ছিল, পূর্বজন্মের কর্মদোষে তার পতিলাভ হয় নি। তার কঠোর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব এসে বললেন, অভীষ্ট বর চাও। কন্যা বার বার বললেন, সর্বগুণান্বিত পতি কামনা করি। মহাদেব বললেন, তুমি পাঁচ বার পতি চেয়েছ, এজন্য পরজন্মে তোমার পাঁচটি ভরতবংশীয় পতি হবে। সেই দেবৰূপিণী কন্যা কৃষ্ণা নামে দ্রুপদের বংশে জন্মেছে, সেই তোমাদের পত্নী হবে। তোমরা পাঞ্চালনগরে যাও, দ্রুপদকন্যাকে পেয়ে তোমরা সুখী হবে।

পাণ্ডবরা পাঞ্চালদেশে যাত্রা করলেন। এক অহোরাত্র পরে তাঁরা সোমাশ্রয়ণ তীর্থে গঙ্গাতীরে এলেন। অন্ধকারে পথ দেখবার জন্য অর্জুন একটি জ্বলন্ত কর নিয়ে আগে আগে চললেন। সেই সময়ে গন্ধর্বরাজ স্ত্রীদের নিয়ে জল-ক্রীড়া করতে এসেছিলেন। পাণ্ডবদের কণ্ঠস্বর শুনে তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, প্রাতঃসন্ধ্যার পূর্বকাল পর্যন্ত সমস্ত রাত্রি যক্ষ-গন্ধর্ব-রাক্ষসদের, অবশিষ্ট কাল মানুষের। রাত্রিতে কোনও মানুষ, এমন কি সৈন্য নৃপতিও, যদি জলের কাছে আসে তবে ব্রহ্মজ্ঞগণ নিন্দা করেন। আমি কুবেরের সখা গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণ। এই বন আমার, তোমরা দূরে যাও। অর্জুন বললেন, সমুদ্রে, হিমালয়ের পার্শ্বে এবং এই গঙ্গায় দিনে রাত্রিতে বা সন্ধ্যায় কারও আসতে বাধা নেই। তোমার কথায় কেন আমরা গঙ্গার পবিত্র জল স্পর্শ করব না? তখন অঙ্গারপর্ণ পাণ্ডবদের প্রতি অনেকগুলি বাণ ছুড়লেন। অর্জুন তাঁর মশাল আর ঢাল ঘুরিয়ে সমস্ত বাণ নিরস্ত করে দ্রোণের নিকট লব্ধ প্রদীপ্ত আগ্নেয় অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। গন্ধর্ব-রাজের রথ দগ্ধ হয়ে গেল, তিনি অচেতন হয়ে অধোমুখে পড়ে গেলেন, অর্জুন তাঁর মাল্যভূষিত কেশ ধরে টানতে লাগলেন। গন্ধর্বের ভার্য্যা কুম্ভীনসী যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহাভাগ, আমি আপনার শরণাগতা, রক্ষা করুন, আমার স্বামীকে মুক্তি দিন। যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে অর্জুন গন্ধর্বকে ছেড়ে দিলেন।

গন্ধর্ব বললেন, আমি পরাজিত হয়েছি, নিজেকে আর অঙ্গারপর্ণ (১) বলব না। আমার বিচিত্র রথ দগ্ধ হয়েছে, আমার এক নাম চিত্ররথ হলেও আমি দগ্ধরথ হয়েছি। যে মহাত্মা আমাকে প্রাণদান করেছেন সেই অর্জুনকে আমি চাক্ষুষী বিদ্যা দান করছি। রাজকুমার, তুমি ত্রিলোকের যা কিছু দেখতে ইচ্ছা করবে এই বিদ্যাবলে তা দেখতে পাবে। আমি তোমাকে আর তোমার প্রত্যেক ভ্রাতাকে একশত দিবাবর্ণ বেগবান গন্ধর্বদেশীয় অশ্ব দিচ্ছি, এরা প্রভুর ইচ্ছানুসারে উপস্থিত হয়। অর্জুন বললেন, গন্ধর্ব, তুমি প্রাণসংশয়ে যা আমাকে দিচ্ছ তা নিতে আমার প্রবৃত্তি হচ্ছে না। গন্ধর্ব বললেন, তুমি জীবন দিয়েছ, তার পরিবর্তে আমি চাক্ষুষী বিদ্যা দিচ্ছি। তোমার আগ্নেয় অস্ত্র এবং চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব আমাকে দাও।

(১) যাঁর পর্ণ বা বাহন জ্বলন্ত অঙ্গার তুল্য।

অর্জুন গন্ধর্বের প্রার্থনা অনুসারে চাক্ষুষী বিদ্যা ও অশ্ব নিলেন এবং আগ্নেয় অস্ত্র দান করে সখ্যে আবদ্ধ হলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, আমরা বেদজ্ঞ ও শত্রু দমনে সমর্থ, তথাপি রাত্রিকালে আমাদের ধর্ষণ করলে কেন? গন্ধর্ব বললেন, তোমাদের অগ্নিহোত্র নেই, ব্রাহ্মণকে অগ্রবর্তী করেও চল না, সেজন্য আমি তোমাদের দর্প করেছি। হে তাপত্য, শ্রেয়োলাভের জন্য পুরোহিত নিয়োগ করা কর্ত্তব্য। পুরোহিত না থাকলে কোনও রাজা কেবল বীরত্ব বা আভিজাত্যের প্রভাবে রাজ্য জয় করতে পারেন না। ব্রাহ্মণকে পুরোভাগে রাখলেই চিরকাল রাজ্যপালন করা যায়।