আদিপর্ব: ৩১। বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, শক্তি ও কল্মাষপাদ — ঔর্ব্ব — শ্বেতা

অর্জুন বশিষ্ঠের ইতিহাস জানতে চাইলে গন্ধর্ব্বরাজ বললেন।—বশিষ্ঠ ব্রহ্মার মানস পুত্র, অরুন্ধতীর পতি এবং ইক্ষ্বাকু কুলের পুরোহিত। কান্যকুব্জরাজ কুশিকের পুত্র গাধি, তাঁর পুত্র বিশ্বামিত্র। একদা বিশ্বামিত্র সসৈন্যে মৃগয়ায় গিয়ে পিপাসিত হয়ে বশিষ্ঠের আশ্রমে এলেন। রাজার সৎকারের নিমিত্ত বশিষ্ঠ তাঁর কামধেনু নন্দিনীকে বললেন, আমার যা প্রয়োজন তা দাও। নন্দিনী ধূমায়মান অন্নরাশি, সূপ (ডাল), দধি, ঘৃত, মিষ্টান্ন, মদ্য প্রভৃতি ভক্ষ্য ও পেয় এবং বিবিধ রত্ন ও বসন উৎপন্ন করলে, বশিষ্ঠ তা দিয়ে বিশ্বামিত্রের সৎকার করলেন। নন্দিনীর মনোহর আকৃতি দেখে বিস্মিত হয়ে বিশ্বামিত্র বশিষ্ঠকে বললেন, আপনি দশ কোটি ধেনু বা আমার রাজ্য নিয়ে আপনার কামধেনু আমাকে দান করুন। বশিষ্ঠ সম্মত হলেন না, তখন বিশ্বামিত্র সবলে নন্দিনীকে হরণ ক'রে কশাঘাতে তাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন। নন্দিনী বললে, ভগবান, বিশ্বামিত্রের সৈন্যদের কশাঘাতে আমি অনাথার ন্যায় বিলাপ করছি, আপনি তা উপেক্ষা করছেন কেন? বশিষ্ঠ বললেন, ক্ষত্রিয়ের বল তেজ, ব্রাহ্মণের বল ক্ষমা। কল্যাণী, আমি তোমাকে ত্যাগ করি নি, যদি তোমার শক্তি থাকে তবে আমার কাছেই থাক।

তখন সেই পয়স্বিনী কামধেনু ভয়ংকর রূপ ধারণ ক'রে হাম্বা রবে সৈন্যদের বিতাড়িত করলে। তাঁর বিভিন্ন অঙ্গ থেকে পহ্লব দ্রবিড শক যবন শবর পৌণ্ড্র কিরাত সিংহল বর্বর খশ পুলিন্দ চীন হূন কেরল ম্লেচ্ছ প্রভৃতি সৈন্য উৎপন্ন হয়ে বিশ্বামিত্রের সৈন্যদলকে বধ না করেও পরাজিত করলে। বিশ্বামিত্র ক্রুদ্ধ হয়ে বশিষ্ঠের প্রতি বিবিধ শর বর্ষণ করলেন, কিন্তু বশিষ্ঠ একটি বংশদণ্ড দিয়ে সমস্ত নিরস্ত করলেন। বিশ্বামিত্র নানাপ্রকার দিব্যাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করলেন কিন্তু বশিষ্ঠের ব্রহ্মশক্তিযুক্ত যষ্টিতে সমস্ত ভস্মীভূত হ'ল। বিশ্বামিত্রের আত্মগ্লানি হ'ল, তিনি বললেন, ধিগ্বলং ক্ষত্রিয়বলং ব্রহ্মতেজোবলং বলম্। বলাবলং বিনিশ্চিত্য তপ এব পরং বলম্।।

-- ক্ষত্রিয় বলকে ধিক্, ব্রহ্মতেজই বল। বলাবল দেখে আমি নিশ্চিত জেনেছি যে, তপস্যাই পরম বল।

তার পর বিশ্বামিত্র রাজ্য ত্যাগ ক'রে তপস্যায় নিরত হলেন।

কল্মাষপাদ নামে এক ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা ছিলেন। একদিন তিনি মৃগয়ায় শ্রান্ত তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে এক সংকীর্ণ পথ দিয়ে চলছিলেন। সেই পথে বশিষ্ঠের জ্যেষ্ঠ পুত্র শক্তিকে আসতে দেখে রাজা বললেন, আমার পথ থেকে সরে যাও। শক্তি বললেন, ব্রাহ্মণকে পথ ছেড়ে দেওয়াই রাজার সনাতন ধর্ম। শক্তি কিছুতেই স'রে গেলেন না দেখে রাজা তাকে কশাঘাত করলেন। শক্তি ক্রুদ্ধ হয়ে শাপ দিলেন, তুমি নরমাংসভোজী রাক্ষস হও। কল্মাষপাদকে যজমান রূপে পাবার জন্য বশিষ্ঠ আর বিশ্বামিত্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। অভিশপ্ত কল্মাষপাদ যখন শক্তিকে প্রসন্ন করবার চেষ্টা করছিলেন সেই সময়ে বিশ্বামিত্রের আদেশে কিঙ্কর নামে এক রাক্ষস রাজার শরীরে প্রবিষ্ট হ'ল।

এক ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ বনমধ্যে রাজাকে দেখে তাঁর কাছে মাংস ও অন্ন চাইলেন। রাজা তাঁকে অপেক্ষা করতে ব'লে স্বভবনে গেলেন এবং অর্ধরাত্রে তাঁর প্রতিশ্রুতি স্মরণ ক'রে পাচককে সমাংস অন্ন নিয়ে যেতে আজ্ঞা দিলেন। পাচক জানালে যে মাংস নেই। রাক্ষসাবিষ্ট রাজা বললেন, তবে নরমাংস নিয়ে যাও। পাচক বধ্যভূমিতে গিয়ে নরমাংস নিলে এবং পাক ক'রে অন্নের সহিত ব্রাহ্মণকে নিবেদন করলে। দিব্যদৃষ্টিশালী ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, যে নৃপাধম এই অভোজ্য পাঠিয়েছে সে নরমাংসভোজী হবে।

শক্তি এবং অরণ্যচারী ব্রাহ্মণ এই দুজনের শাপের ফলে রাক্ষসাবিষ্ট কল্মাষপাদ কর্তব্যজ্ঞানশূন্য বিকৃতেন্দ্রিয় হলেন। একদিন তিনি শক্তিকে দেখে বললেন, তুমি যে শাপ দিয়েছ তার জন্য প্রথমেই তোমাকে খাব। এই ব'লে তিনি শক্তিকে বধ ক’রে ভক্ষণ করলেন। বিশ্বামিত্রের প্ররোচনায় কল্মাষপাদ বশিষ্ঠের শতপুত্রের সকলকেই খেয়ে ফেললেন। পুত্রশোকাতুর বশিষ্ঠ বহু প্রকারে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন কিন্তু তাঁর মৃত্যু হ’ল না। তিনি নানা দেশ ভ্রমণ ক’রে আশ্রমে ফিরে আসছিলেন এমন সময় পিছন থেকে বেদপাঠের ধ্বনি শুনতে পেলেন। বশিষ্ঠ বললেন, কে আমার অনুসরণ করছে? এক নারী উত্তর দিলেন, আমি অদৃশ্যন্তী, শক্তির বিধবা পত্নী। আমার গর্ভে যে পুত্র আছে তার বার বৎসর বয়স হয়েছে, সেই বেদপাঠ করছে। তাঁর বংশের সন্তান জীবিত আছে জেনে বশিষ্ঠ আনন্দিত হয়ে পুত্রবধূকে নিয়ে আশ্রমের দিকে চললেন।

পথিমধ্যে কল্মাষপাদ বশিষ্ঠকে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে খেতে গেলেন। বশিষ্ঠ তাঁর ভীতা পুত্রবধূকে বললেন, ভয় নেই, ইনি কল্মাষপাদ রাজা। এই বলে তিনি হুঙ্কার করে কল্মাষপাদকে থামিয়ে তাঁর গায়ে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে তাঁকে শাপমুক্ত করলেন এবং বললেন, রাজা, তুমি ফিরে গিয়ে রাজ্যশাসন কর, কিন্তু আর কখনও ব্রাহ্মণের অপমান ক’রো না। কল্মাষপাদ বললেন, আমি আপনার আজ্ঞাধীন হয়ে দ্বিজগণকে পূজা করব। এখন যাতে পিতৃ-ঋণ থেকে মুক্ত হ’তে পারি তার উপায় করুন, আমাকে একটি পুত্র দিন। বশিষ্ঠ বললেন, তাই দেব। তার পর তাঁরা লোকবিখ্যাত অযোধ্যাপুরীতে ফিরে এলেন। বশিষ্ঠের সহিত সঙ্গমের ফলে রাজমহিষী গর্ভবতী হলেন, বশিষ্ঠ তাঁর আশ্রমে ফিরে গেলেন। দ্বাদশ বৎসরেও সন্তান ভূমিষ্ঠ হ’ল না দেখে মহিষী পাষাণখণ্ড দিয়ে তাঁর উদর বিদীর্ণ ক’রে পুত্র প্রসব করলেন। এই পুত্রের নাম অশ্মক, ইনি পৌদন্য নগর স্থাপন করেছিলেন।

বশিষ্ঠের পুত্রবধূ অদৃশ্যন্তীও একটি পুত্র প্রসব করলেন, তাঁর নাম পরাশর। একদিন পরাশর বশিষ্ঠকে পিতা ব’লে সম্বোধন করলে অদৃশ্যন্তী সাশ্রুনয়নে বললেন, বৎস, পিতামহকে পিতা ব’লে ডেকো না, তোমার পিতাকে রাক্ষসে খেয়েছে। পরাশর ক্রুদ্ধ হয়ে সর্বলোক বিনাশের সংকল্প করলেন। তখন পৌত্রকে নিরস্ত করবার জন্য বশিষ্ঠ এই উপাখ্যান বললেন। —

পুরাকালে কৃতবীর্য নামে এক রাজা ছিলেন, তিনি তাঁর পুরোহিত ভৃগুবংশীয়গণকে প্রচুর ধনধান্য দান করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধর ক্ষত্রিয়দের অর্থাভাব হ’ল, তাঁরা ভার্গবদের কাছে প্রার্থী হয়ে এলেন। ভার্গবদের কেউ ভূগর্ভে ধন লুকিয়ে রাখলেন, কেউ ব্রাহ্মণদের দান করলেন, কেউ ক্ষত্রিয়গণকে দিলেন। একজন ক্ষত্রিয় ভার্গবদের গৃহে খনন করে ধন দেখতে পেলেন, তাতে সকলে ক্রুদ্ধ হয়ে ভার্গবগণকে বধ করলেন। ভার্গবনারীগণ ভয়ে হিমালয়ে আশ্রয় নিলেন, তাঁদের মধ্যে এক ব্রাহ্মণী তাঁর ঊরুদেশে গর্ভ গোপন করে রাখলেন। ক্ষত্রিয়রা জানতে পেরে সেই গর্ভ নষ্ট করতে এলেন, তখন সেই ব্রাহ্মণীর ঊরু ভেদ করে মধ্যাহ্নসূর্যের ন্যায় দীপ্যমান পুত্র প্রসূত হ’ল, তার তেজে ক্ষত্রিয়গণ অন্ধ হয়ে গেলেন। তাঁরা অনুগ্রহ ভিক্ষা করলে ব্রাহ্মণী বললেন, তোমরা আমার ঊরুজাত পুত্র ঔর্বকে প্রসন্ন কর। ক্ষত্রিয়গণের প্রার্থনায় ঔর্ব তাঁদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। তার পর পিতৃগণের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার জন্য তিনি ঘোর তপস্যা করতে লাগলেন। ঔর্বকে সর্বলোকবিনাশে উদ্যত দেখে পিতৃগণ এসে বললেন, বৎস, ক্রোধ সংবরণ কর। আমরা স্বর্গারোহণের জন্য উৎসুক ছিলাম, কিন্তু আত্মহত্যায় স্বর্গলাভ হয় না, সেজন্য স্বেচ্ছায় ক্ষত্রিয়দের হাতে মরেছি। আমরা ইচ্ছা করলেই ক্ষত্রিয়সংহার করতে পারতাম। তার পর পিতৃগণের অনুরোধে ঔর্ব তাঁর ক্রোধাগ্নি সমুদ্রজলে নিক্ষেপ করলেন। সেই ক্রোধ ঘোটকীর (১) মস্তক-রূপে অগ্নি উদ্‌গার করে সমুদ্রজল পান করে।

(১) বড়বা।

বশিষ্ঠের কাছে এই উপাখ্যান শুনে পরাশর তাঁর ক্রোধ সংবরণ করলেন, কিন্তু তিনি রাক্ষসসত্র যজ্ঞ আরম্ভ করলেন, তাতে আবালবৃদ্ধ সকল রাক্ষস দগ্ধ হতে লাগল। অত্রি, পুলস্ত্য, পুলহ, ক্রতু ও মহাক্রতু রাক্ষসদের প্রাণরক্ষার জন্য সেখানে উপস্থিত হলেন। পুলস্ত্য (২) বললেন, বৎস, যারা তোমার পিতার মৃত্যুর বিষয় কিছুই জানে না সেই নির্দোষ রাক্ষসদের মেরে তোমার কি আনন্দ হচ্ছে? তুমি আমার বংশনাশ করো না। শক্তি শাপ দিয়েই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছিলেন। এখন তিনি তাঁর ভ্রাতাদের সঙ্গে দেবলোকে সুখে আছেন। পুলস্ত্যের কথায় পরাশর তাঁর যজ্ঞ শেষ করলেন।

(২) ইনি রাবণ প্রভৃতির পূর্ব্বপুরুষ।

অৰ্জ্জুন জিজ্ঞাসা করলেন, কল্মাষপাদ কি কারণে তাঁর মহিষীকে বশিষ্ঠের নিকট পুত্রোৎপাদনের জন্য নিযুক্ত করেছিলেন? গন্ধর্বরাজ বললেন, রাজা কল্মাষপাদ যখন রাক্ষসরূপে বনে বিচরণ করছিলেন তখন এক ব্রাহ্মণ ও তাঁর পত্নীকে দেখতে পান। রাজা সেই ব্রাহ্মণকে খেয়ে ফেলেন, তাতে ব্রাহ্মণী শাপ দেন, স্ত্রীসংগম করলেই তোমার মৃত্যু হবে। যাকে তুমি পুত্রহীন করেছ সেই বশিষ্ঠই তোমার পত্নীতে সন্তান উৎপাদন করবেন। এই কারণেই কল্মাষপাদ তাঁর মহিষীকে বশিষ্ঠের কাছে পাঠিয়েছিলেন।

[tags]
[/tags]

অর্জুন বললেন, গন্ধর্ব, তোমার সবই জানা আছে, এখন আমাদের উপযুক্ত পুরোহিত কে আছেন তা বল। গন্ধর্বরাজ বললেন, দেবলের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ধৌম্য উৎকোচক তীর্থে তপস্যা করছেন, তাঁকেই পৌরোহিত্যে বরণ করতে পার। অর্জুন প্রীতমনে গন্ধর্বরাজকে আগ্নেয় অস্ত্র দান ক'রে বললেন, অশ্বগুলি এখন তোমার কাছে থাকুক, আমরা প্রয়োজন হ'লেই নেব। তার পর তাঁরা পরস্পরকে সম্মান দেখিয়ে নিজ নিজ অভীষ্ট স্থানে প্রস্থান করলেন। পাণ্ডবগণ ধৌম্যের আশ্রমে গিয়ে তাঁকে পৌরোহিত্যে বরণ করলেন এবং তাঁর সঙ্গে পাঞ্চালীর স্বয়ংবরে যাবার ইচ্ছা করলেন।

॥ স্বয়ংবরপর্বধ্যায় ॥