আদিপর্ব: ৩০। তপতী ও সংবরণ
অর্জ্জুন প্রশ্ন করলেন, তুমি আমাকে তাপত্য বলছ কেন? তপতী কে? আমরা তো কৌন্তেয়। গন্ধর্ব্বরাজ এই ত্রিলোকবিশ্রুত উপাখ্যান বললেন। —
যিনি নিজ তেজে সমস্ত আকাশ ব্যাপ্ত করেন সেই সূর্য্যের এক কন্যার নাম তপতী, ইনি সাবিত্রীর কনিষ্ঠা। রূপে গুণে তিনি অতুল্য ছিলেন। সূর্য্যদেব এমন কোনও পাত্র খুঁজে পেলেন না যিনি তপতীর উপযুক্ত। সেই সময়ে কুরুবংশীয় ঋক্ষপুত্র সংবরণ রাজা প্রত্যহ উদয়কালে সূর্য্যের আরাধনা করতে লাগলেন। তিনি ধার্মিক, রূপবান ও বিখ্যাত বংশের নৃপতি, সেজন্য সূর্য্য তাঁকেই কন্যা দিতে ইচ্ছা করলেন। একদিন সংবরণ পর্ব্বতের নিকটস্থ বনে মৃগয়া করতে গেলে তাঁর অশ্ব ক্ষুৎপিপাসায় পীড়িত হয়ে ম’রে গেল। সংবরণ পদব্রজে বিচরণ করতে করতে এক অতুলনীয় রূপবতী কন্যা দেখতে পেলেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু সেই কন্যা মেঘমধ্যে সৌদামিনীর ন্যায় অন্তর্হিত হলেন। রাজা কামমোহিত হয়ে ভূমিতে প’ড়ে গেলেন, তখন তপতী আবার দেখা দিয়ে বললেন, নৃপশ্রেষ্ঠ, উঠুন, মোহগ্রস্ত হবেন না। সংবরণ অস্পষ্ট বাক্যে অনুনয় ক’রে বললেন, সুন্দরী, তুমি আমাকে ভজনা কর নতুবা আমার প্রাণবিয়োগ হবে। তুমি প্রসন্ন হও, আমি তোমার বশংগত ভক্ত। তপতী বললেন, আপনিও আমার প্রাণ হরণ করেছেন। আমি স্বাধীন নই, আমার পিতা আছেন। আপনি তপস্যায় তাঁকে প্রীত ক’রে আমাকে প্রার্থনা করুন। এই বলে তপতী চলে গেলেন।
সংবরণ পুনর্ব্বার মূর্চ্ছিত হয়ে প’ড়ে গেলেন। অমাত্য ও সুহৃদ্গণ অন্বেষণ ক’রে রাজাকে দেখতে পেলেন এবং তাঁর মাথায় পদ্মসুগন্ধিত শীতল জল সেচন করলেন। রাজা সংজ্ঞালাভ ক’রে মন্ত্রী ভিন্ন সকলকেই বিদায় দিলেন এবং সেই পর্ব্বতেই উর্দ্ধমুখে কৃতাঞ্জলি হয়ে পুরোহিত বশিষ্ঠ ঋষিকে স্মরণ করতে লাগলেন। দ্বাদশ দিন অতীত হলে বশিষ্ঠ সেখানে এলেন। তিনি যোগবলে সমস্ত জেনে কিছুক্ষণ সংবরণের সঙ্গে আলাপ ক’রে উর্দ্ধে চলে গেলেন। সূর্য্যের কাছে এসে বশিষ্ঠ প্রণাম ক’রে কৃতাঞ্জলিপুটে বললেন, বিভাবসু, আপনার তপতী নামে যে কন্যা আছে তাঁকে আমি মহারাজ সংবরণের জন্য প্রার্থনা করছি। সূর্য সম্মত হয়ে তপতীকে দান করলেন, বশিষ্ঠ তাঁকে নিয়ে সংবরণের কাছে এলেন। সংবরণ তপতীকে বিবাহ করলেন এবং মন্ত্রীর উপর রাজ্যচালনার ভার দিয়ে সেই পৰ্ব্বতময় বনে উপবনে পত্নীর সঙ্গে বার বৎসর সুখে বাস করলেন।
সেই বার বৎসরে তাঁর রাজ্যে একবিন্দু বৃষ্টিপাত হ'ল না, স্থাবর জঙ্গম এবং সমস্ত প্রজা ক্ষয় পেতে লাগল, লোকে ক্ষুধায় কাতর হয়ে পুরসভা ছেড়ে দিকে দিকে উদভ্রান্ত হয়ে বিচরণ করতে লাগল। বশিষ্ঠ মুনি সংবরণ ও তপতীকে রাজপুরীতে ফিরিয়ে আনলেন, তখন ইন্দ্র আবার বর্ষণ করলেন, শস্য উৎপন্ন হ'ল। অর্জুন, সেই তপতীর গর্ভে কুরু নামক পুত্র হয়। তুমি তাঁরই বংশে জন্মেছ সেজন্য তুমি তাপত্য।