সভাপর্ব: ১। ময় দানবের সভানির্ম্মাণ

কৃষ্ণ ও অর্জুন নদীতীরে উপবিষ্ট হ’লে ময় দানব কৃতাঞ্জলিপুটে সবিনয়ে অর্জুনকে বললেন, কৌন্তেয়, আপনি কৃষ্ণের ক্রোধ আর অগ্নির দহন থেকে আমাকে রক্ষা করেছেন। আপনার প্রত্যুপকার কি করব বলুন। অর্জুন উত্তর দিলেন, তোমার কার্য্য সবই তুমি করেছ, তোমার মঙ্গল হ’ক্, তোমার আর আমার মধ্যে যেন সর্ব্বদা প্রীতি থাকে: এখন তুমি যেতে পার। ময় বললেন, আমি দানবগণের বিশ্বকর্মা ও মহাশিল্পী, আপনাকে তুষ্ট করবার জন্য আমি কিছু করতে ইচ্ছা করি। অর্জুন বললেন প্রাণরক্ষার জন্য তুমি কৃতজ্ঞ হয়েছ, এ অবস্থায় তোমাকে দিয়ে আমি কিছু করাতে চাই না। তোমার অভিলাষ ব্যর্থ করতেও চাই না, তুমি কৃষ্ণের জন্য কিছু কর তাতেই আমার প্রত্যুপকার হবে।

ময় দানবের অনুরোধ শুনে কৃষ্ণ একটু ভেবে বললেন, হে দানবশ্রেষ্ঠ, যদি তুমি আমাদের প্রিয়কার্য্য করতে চাও তবে ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠিরের জন্য এমন এক সভা নির্ম্মাণ কর যার অনুকরণ মানুষের অসাধ্য। তারপর কৃষ্ণ ও অর্জুন ময়কে যুধিষ্ঠিরের কাছে নিয়ে গেলেন। কিছুকাল গত হ’লে সখাগণ বিদায় নিলেন তারপর ময় সভানির্ম্মাণে উদ্যোগী হলেন এবং পুণ্যদিনে মাঙ্গলিক কার্য্য সম্পন্ন ক’রে ব্রাহ্মণগণকে সঘৃত পায়স ও বিবিধ ধনরত্ন দিয়ে তুষ্ট করলেন। তারপর তিনি চতুর্দ্দশ হাজার হাত পরিমাপ করে সর্ব্ব ঋতুর উপযুক্ত সভাস্থান নির্বাচন করলেন।

জনার্দন কৃষ্ণ এতদিন ইন্দ্রপ্রস্থে সুখে বাস করছিলেন, এখন তিনি পিতার কাছে যেতে ইচ্ছুক হলেন। তিনি পিতৃস্বসা কুন্তীর চরণে প্রণাম ক’রে ভগিনী সুভদ্রার কাছে সস্নেহে বিদায় নিলেন এবং দ্রৌপদীর সঙ্গে দেখা ক’রে তাঁর হাতে সুভদ্রাকে সমর্পণ করলেন। তারপর তিনি স্বস্তিবচন করিয়ে ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা দিলেন এবং শুভমুহূর্ত্তে স্বর্ণভূষিত দ্রুতগামী রথে আরোহণ করলেন। কৃষ্ণের সারথি দারুককে সরিয়ে দিয়ে যুধিষ্ঠির নিজেই বল্গা হাতে নিলেন, অর্জুন ও শ্বেত ছত্র ধরলেন, নকুল ও সহদেব শ্বেতচামর ব্যজন করতে লাগলেন। ধৌম্য ও অন্য ব্রাহ্মণগণ এবং দ্রৌপদী প্রভৃতি পুরনারীগণ কৃষ্ণের রথের অনুগমন করলেন। অর্দ্ধক্রোশ পথ গিয়ে কৃষ্ণ অতি কষ্টে যুধিষ্ঠিরকে নিবৃত্ত করলেন এবং তাঁর চরণ বন্দনা ক’রে ও অন্যান্য পাণ্ডবদের আলিঙ্গন ক’রে দ্বারকার অভিমুখে প্রস্থান করলেন। পাণ্ডবগণ বহুক্ষণ কৃষ্ণের পথের দিকে তাকিয়ে থেকে বিষণ্ণচিত্তে রাজধানীতে ফিরে এলেন। কৃষ্ণ যথাসময়ে দ্বারকায় পৌঁছে পিতা বসুদেব ও মাতা দেবকীকে প্রণাম করলেন।

এদিকে ময় দানব যুধিষ্ঠিরের জন্য সেই বিচিত্র সভা নির্ম্মাণ করতে লাগল। সে প্রথমে দানবরাজ বৃষপর্বার সভার জন্য যে রত্ন ও উপকরণ বিন্দুসরোবরে গচ্ছিত রেখেছিল তা নিয়ে এল। সেখানে বরুণের এক দিব্য গদা এবং অর্জুনের জন্য দেবদত্ত নামক শঙ্খও ছিল; ময় সেগুলি সঙ্গে নিয়ে এল এবং ভীমকে গদা ও অর্জুনকে দেবদত্ত শঙ্খ উপহার দিল। ময় দানব চৌদ্দ মাসে সেই অপূর্ব্ব মণিচক্রবিরাজিত সভা নির্ম্মাণ শেষ করল। সেই সভার তুল্য রমণীয় সভা ভূমণ্ডলে আর ছিল না।

সভা নির্ম্মাণ সমাপ্ত হ’লে ময় যুধিষ্ঠিরকে সংবাদ দিলে। যুধিষ্ঠির ধৌম্য, ব্যাস ও অন্য ঋষিগণকে এবং কুরুদেশের নানা স্থান থেকে ব্রাহ্মণদের নিমন্ত্রণ ক’রে আনালেন এবং তাঁদের উত্তম বসন, মাল্য ও বহু সহস্র গাভী দান করলেন। তার পর গীত বাদ্য সহকারে দেবপূজা ও বিগ্রহস্থাপন ক'রে সভায় প্রবেশ করলেন। সাত দিন ধ'রে মল্ল যুদ্ধ (১) সূত বৈতালিক প্রভৃতি যুধিষ্ঠিরাদির মনোরঞ্জন করলে। নানা দেশ থেকে আগত ঋষি ও নৃপতিদের সঙ্গে পাণ্ডবগণ সেই সভায় আনন্দে বাস করতে লাগলেন।

(১) লগুড় যোদ্ধা, লাঠিয়াল।