সভাপর্ব: ২। যুধিষ্ঠির-সকাশে নারদ
একদিন দেবর্ষি নারদ পারিজাত, রৈবত, সুমুখ ও সৌম্য এই চার জন ঋষির সঙ্গে পাণ্ডবদের সভায় উপস্থিত হলেন। যুধিষ্ঠির যথাবিধি আসন অর্ঘ্য গো মধুপর্ক ও রত্নাদি দিয়ে সংবর্ধনা করলে নারদ প্রশ্নচ্ছলে ধর্ম কাম ও অর্থ বিষয়ক এইপ্রকার বহু উপদেশ দিলেন।—মহারাজ, তুমি অর্থচিন্তার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মচিন্তাও কর তো? কাল বিভাগ করে সমভাবে ধর্ম অর্থ ও কামের সেবা কর তো? তোমার দুর্গসকল যেন ধনধান্য জল অস্ত্র যন্ত্র যোদ্ধা ও শিল্পিগণে পরিপূর্ণ থাকে। কঠোর দণ্ড দিয়ে তুমি যেন প্রজাদের অবজ্ঞাভাজন হয়ো না। বীর, বুদ্ধিমান, পবিত্রস্বভাব, সদ্বংশজ ও অনুরক্ত ব্যক্তিকে সেনাপতি করবে। সৈন্যগণকে যথাকালে খাদ্য ও বেতন দেবে। শরণাগত শত্রুকে পুত্রবৎ রক্ষা করবে। পররাজ্য জয় করে যে ধনরত্ন পাওয়া যাবে তার ভাগ প্রধান প্রধান যোদ্ধাদের যোগ্যতা অনুসারে দেবে। তোমার যা আয় তার অর্ধেক বা এক-তৃতীয়াংশে বা এক-চতুর্থাংশে নিজের ব্যয় নির্বাহ করবে। গণক (২) ও লেখক (৩)গণ প্রত্যহ পূর্বাহ্ণে তোমাকে আয়ব্যয়ের হিসাব দেবে। লোভী, চোর, বিদ্বেষী আর অল্পবয়স্ক লোককে কার্যের ভার দেবে না। তোমার রাজ্যে যেন বড় বড় জলপূর্ণ তড়াগ থাকে, কৃষি যেন কেবল বৃষ্টির উপর নির্ভর না করে। কৃষকদের যেন বীজ আর খাদ্যের অভাব না হয়, তারা যেন অল্প সুদে ঋণ পায়। তুমি নারীদের সঙ্গে মিষ্টবাক্যে আলাপ করবে কিন্তু গোপনীয় বিষয় বলবে না। ধনী আর দরিদ্রের মধ্যে বিবাদ হলে তোমার অমাত্যরা যেন ঘুষ নিয়ে মিথ্যা বিচার না করে। অন্ধ মূক পঙ্গু অনাথ ও ভিক্ষুদের পিতার ন্যায় পালন করবে। নিদ্রা আলস্য ভয় ক্রোধ মৃদুতা ও দীর্ঘসূত্রতা এই ছয় দোষ পরিহার করবে।
নারদের চরণে প্রণত হয়ে যুধিষ্ঠির বললেন, আপনার উপদেশে আমার জ্ঞানবৃদ্ধি হ'ল, যা বললেন তাই আমি করব। আপনি যে রাজধর্ম বিবৃত করলেন তা আমি যথাশক্তি পালন করে থাকি। আমি সৎপথেই চলতে ইচ্ছা করি, কিন্তু পূর্ববর্তী জিতেন্দ্রিয় নৃপতিগণ যে ভাবে কর্তব্যপালন করতেন তা আমি পারি না। তার পর যুধিষ্ঠির বললেন, ‘ভগবান, আপনি বহু লোকে বিচরণ করে থাকেন, এই সভার তুল্য বা এর চেয়ে ভাল কোনও সভা দেখেছেন কি?’ নারদ সহাস্যে বললেন, ‘তোমার এই সভার তুল্য অন্য সভা আমি মনুষ্যলোকে দেখি নি, শুনিও নি। তবে আমি ইন্দ্র যম বরুণ কুবের ও ব্রহ্মার সভার কথা বলছি শোন।—’
ইন্দ্রের সভা শত যোজন দীর্ঘ, দেড় শ যোজন আয়ত, পাঁচ যোজন উচ্চ, তা ইচ্ছানুসারে আকাশে চালিত করা যায়। সেখানে জরা শোক ক্লান্তি নেই ইন্দ্রাণী শচী সেখানে শ্রী লক্ষ্মী হ্রী কীর্তি ও দ্যুতি দেবীর সঙ্গে বিরাজ করেন। দেবগণ, সিদ্ধ ও সাধ্যগণ, বহু মহর্ষি, রাজা হরিশ্চন্দ্র, গন্ধর্ব ও অপ্সরা সকল সেখানে থাকেন। যমের সভা তেজস উপাদানে নির্মিত, সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল, তার বিস্তার শত যোজন, দৈর্ঘ্য আরও বেশী। স্বর্গীয় ও পার্থিব সর্ববিধ ভোগ্য বস্তু সেখানে আছে। যযাতি, নহুষ, পুরু, মান্ধাতা, ধ্রুব, কার্তবীর্যার্জুন, ভরত, নিষধপতি নল, ভগীরথ, রাম-লক্ষ্মণ, তোমার পিতা পাণ্ডু প্রভৃতি সেখানে থাকেন। বরুণের সভা জলমধ্যে নির্মিত, দৈর্ঘ্যপ্রস্থে যমসভার সমান, তার প্রাকার ও তোরণ শুভ্র। সেই সভা অধিক শীতলও নয় উষ্ণও নয়, সেখানে বাসুকি তক্ষক প্রভৃতি নাগগণ এবং বিরোচনপুত্র বলি প্রভৃতি দৈত্যদানবগণ থাকেন। চার সমুদ্র, গঙ্গা যমুনা প্রভৃতি নদী, তীর্থ-সরোবর, পর্বতসমূহ এবং জলচরগণ মূর্ত্তিমান হয়ে সেখানে বরুণের উপাসনা করে। কুবেরের সভা এক শ যোজন দীর্ঘ, সত্তর যোজন বিস্তৃত, কৈলাসশিখরের ন্যায় উচ্চ ও শুভ্রবর্ণ। যক্ষগণ সেই সভা আকাশে বহন করে। কুবের সেখানে বিচিত্র বসন ও আভরণে ভূষিত হয়ে সহস্র রমণীতে বেষ্টিত হয়ে বাস করেন, দেব ও গন্ধর্বগণ অপ্সরাদের সঙ্গে দিবাভাগে গান করেন। মিশ্রকেশী মেনকা উর্বশী প্রভৃতি অপ্সরা, যক্ষ ও রাক্ষসগণ, বিশ্বাবসু হাহা হহু প্রভৃতি গন্ধর্ব, এবং ধার্মিক বিভীষণ সেখানে থাকেন। পুলস্ত্যের পুত্র কুবের উমাপতি শিবকে নতশিরে প্রণাম ক’রে সেই সভায় উপবেশন করেন।
মহারাজ, আমি সূর্যের আদেশে সহস্রবৎসরব্যাপী ব্রহ্মব্রত অনুষ্ঠান করি, তার পর তাঁর সঙ্গে ব্রহ্মার সভায় যাই। সেই সভা অবর্ণনীয়, তার রূপ ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তিত হয়। সেখানে ক্ষুৎপিপাসা বা গ্লানি নেই, তার প্রভা ভাস্করকে অতিক্রম করে। দক্ষ প্রচেতা কশ্যপ বশিষ্ঠ দুর্বাসা সনৎকুমার অসিতদেবল প্রভৃতি মহাত্মা, আদিত্য বসু রুদ্র প্রভৃতি গণদেবতা, এবং শরীরী ও অশরীরী পিতৃগণ সেখানে ব্রহ্মার উপাসনা করেন। ভরতনন্দন যুধিষ্ঠির, দেবতাদের এইসকল সভা আমি দেখেছি, মনুষ্যলোকে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ তোমার সভাও এখন দেখলাম।
যুধিষ্ঠির বললেন, মহামুনি, ইন্দ্রসভার বর্ণনায় আপনি একমাত্র রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্রের নামই বললেন। তিনি কোন্ কর্ম্মের ফলে সেখানে গেলেন? আপনি যমের সভায় আমার পিতা পাণ্ডুকে দেখেছেন। তিনি কি বললেন তাও জানতে আমার পরম কৌতূহল হচ্ছে।
নারদ বললেন, রাজা হরিশ্চন্দ্র সকল নরপতির অধীশ্বর সম্রাট ছিলেন, তিনি রাজসূয় যজ্ঞে ব্রাহ্মণগণকে বিস্তর ধন দান করেছিলেন। যে রাজারা রাজসূয় যজ্ঞ করেন, যাঁরা পলায়ন না করে সংগ্রামে নিহত হন, এবং যাঁরা তীব্র তপস্যায় কলেবর ত্যাগ করেন, তাঁরা ইন্দ্রসভায় নিত্য বিরাজ করেন। হরিশ্চন্দ্রের শ্রীবৃদ্ধি দেখে তোমার পিতা পাণ্ডু বিস্মিত হয়েছেন এবং আমাকে অনুরোধ করেছেন যেন মর্ত্যলোকে এসে তাঁর এই কথা আমি তোমাকে বলি — পুত্র, তুমি পৃথিবী জয় করতে সমর্থ, ভ্রাতারা তোমার বশবর্ত্তী, এখন তুমি শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ রাজসূয়ের অনুষ্ঠান কর, তা হ'লে আমি হরিশ্চন্দ্রের ন্যায় ইন্দ্রসভায় বহুকাল সুখভোগ করতে পারব। অতএব যুধিষ্ঠির, তুমি তোমার পিতার এই সংকল্প সিদ্ধ কর। এই উপদেশ দিয়ে নারদ তাঁর সঙ্গী ঋষিদের নিয়ে দ্বারকার অভিমুখে যাত্রা করলেন।