সভাপর্ব: ১১। শিশুপালবধ — রাজসূয় যজ্ঞের সমাপ্তি

শিশুপাল বললেন, জনার্দন, তোমাকে আহ্বান করছি, আমার সঙ্গে যুদ্ধ কর, সমস্ত পাণ্ডবদের সঙ্গে আজ তোমাকেও বধ করব। তুমি রাজা নও, কংসের দাস, পূজার অযোগ্য। যে পাণ্ডবরা বাল্যকাল থেকে তোমার অর্চনা করছে তারাও আমার বধ্য।

কৃষ্ণ মৃদু বাক্যে সমবেত নৃপতিবৃন্দকে বললেন, রাজগণ, যাদবরা এই শিশুপালের কোনও অপকার করে নি তথাপি এ আমাদের শত্রুতা করেছে। আমরা যখন প্রাগ্জ্যোতিষপুরে যাই তখন আমাদের পিতৃষসার পুত্র হয়েও এই নৃশংস দ্বারকা দগ্ধ করেছিল। ভোজরাজ রৈবতকে বিহার করছিলেন, তার সহচরগণকে শিশুপাল হত্যা ও বন্ধন ক'রে নিজ রাজ্যে চ'লে যায়। এই পাপিষ্ঠ আমার পিতার অশ্বমেধ যজ্ঞের অশ্ব হরণ করেছিল। বভ্রুর ভার্যা দ্বারка থেকে সৌবীর দেশে যাচ্ছিলেন, সেই অকামা নারীকে এ হরণ করেছিল। এই নৃশংস ছদ্মবেশে মাতুলকন্যা ভদ্রাকে নিজ মিত্র করূষ রাজার জন্য হরণ করেছিল। আমার পিতৃষসার জন্য আমি সব সয়েছি, কিন্তু শিশুপাল আজ আপনাদের সমক্ষে আমার প্রতি যে আচরণ করলে তা আপনারা দেখলেন। এই অন্যায় আমি ক্ষমা করতে পারব না। এই মূঢ় রুক্মিণীকে প্রার্থনা করেছিল, কিন্তু শূদ্র যেমন বেদবাক্য শুনতে পায় না এও তেমনি রুক্মিণীকে পায় নি।

বাসুদেবের কথা শুনে রাজারা শিশুপালের নিন্দা করতে লাগলেন। শিশুপাল উচ্চ হাস্য ক'রে বললেন, কৃষ্ণ, পূর্বে রুক্মিণীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ হয়েছিল এই কথা এখানে বলতে তোমার লজ্জা হ'ল না? নিজের স্ত্রী অন্যাপূর্বা ছিল এই কথা তুমি ভিন্ন আর কে সভায় প্রকাশ করতে পারে? তুমি ক্ষমা কর বা না কর, ক্রুদ্ধ হও বা প্রসন্ন হও, তুমি আমার কি করতে পার?

তখন ভগবান মধুসূদন চক্র দ্বারা শিশুপালের দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করলেন, বজ্রাহত পর্বতের ন্যায় মহাবাহু শিশুপাল ভূপতিত হলেন। রাজারা দেখলেন, আকাশ থেকে সূর্যের ন্যায় একটি উজ্জ্বল তেজ শিশুপালের দেহ থেকে নির্গত হ'ল এবং কমলপলাশাক্ষ কৃষ্ণকে প্রণাম ক'রে তাঁর দেহে প্রবেশ করলে। বিনা মেঘে বৃষ্টি ও বজ্রপাত হ'ল, বসুন্ধরা কেঁপে উঠলেন, রাজারা কৃষ্ণকে দেখতে লাগলেন কিন্তু তাঁদের বাক্‌স্ফূর্তি হ'ল না। কেউ ক্রোধে দন্তপেষণ ও ওষ্ঠ-দংশন করলেন, কেউ নির্জন স্থানে গিয়ে কৃণের প্রশংসা করলেন, কেউ মধ্যস্থ হয়ে রইলেন। মহর্ষিগণ, মহাত্মা ব্রাহ্মণগণ এবং মহাবল নৃপতিগণ কৃষ্ণের স্তুতি করতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের আজ্ঞা দিলেন যেন সদ্য শিশুপালের সৎকার করা হয়। তার পর যুধিষ্ঠির ও সমবেত রাজারা শিশুপাল-পুত্রকে চেদিরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন।

যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ সমাপ্ত হ’ল; ভগবান শৌরি (কৃষ্ণ) শার্ঙ্গধনু, চক্র ও গদা নিয়ে শেষ পর্যন্ত যজ্ঞ রক্ষা করলেন। যুধিষ্ঠির অবভৃথ স্নান (যজ্ঞান্ত স্নান) করলে সমস্ত ক্ষত্রিয় রাজারা তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, মহারাজ, ভাগ্যক্রমে আপনি সাম্রাজ্য পেয়েছেন এবং অজমীঢ় বংশের যশোবৃদ্ধি করেছেন। এই যজ্ঞে সমূদ্যৎ ধর্মকার্য করা হয়েছে, আমরাও সর্বপ্রকারে সংস্কৃত হয়েছি। এখন আজ্ঞা করুন আমরা নিজ নিজ রাজ্যে যাই। যুধিষ্ঠিরের আদেশে তাঁর ভ্রাতারা, ধৃষ্টদ্যুম্ন, অভিমন্যু এবং দ্রৌপদীর পুত্রগণ প্রধান প্রধান রাজাদের অনুগমন করলেন। কৃষ্ণ বিদায় চাইলে যুধিষ্ঠির বললেন, গোবিন্দ, তোমার প্রসাদেই আমার যজ্ঞ সম্পন্ন হয়েছে, সমগ্র ক্ষত্রিয়মণ্ডল আমার বশে এসেছে। কি ব’লে তোমাকে বিদায় দেব? তোমার অভাবে আমি শান্তি পাব না। তার পর সুভদ্রা ও দ্রৌপদীকে মিষ্টবাক্যে তুষ্ট করে কৃষ্ণ মেঘবর্ণ গরুড়ধ্বজ রথে দ্বারকায় প্রস্থান করলেন।