সভাপর্ব: ১২। দুর্য্যোধনের দুঃখ — শকুনির মন্ত্রণা
ইন্দ্রপ্রস্থে বাসকালে শকুনির সঙ্গে দুর্যোধন পাণ্ডবসভার সমস্ত ঐশ্বর্য ক্রমে ক্রমে দেখলেন। স্ফটিকময় এক স্থানে জল আছে মনে ক’রে তিনি পরিধেয় বস্ত্র টেনে তুললেন, পরে ভ্রম বুঝতে পেরে লজ্জায় বিমর্ষ হলেন। আর এক স্থানে পদ্মশোভিত সরোবর ছিল, স্ফটিকনির্মিত মনে ক’রে দুর্যোধন চলতে গিয়ে তাতে পড়ে গেলেন, ভৃত্যেরা হেসে তাঁকে অন্য বস্ত্র এনে দিলে। তিনি বস্ত্র পরিবর্তন করে এলে ভীমার্জুন প্রভৃতিও হাসলেন, দুর্যোধন ক্রোধে তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন না। অন্য এক স্থানে তিনি দ্বার আছে মনে করে স্ফটিকময় প্রাচীরের ভিতর দিয়ে যেতে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলেন। আর এক স্থানে কপাট আছে ভেবে ঠেলতে গিয়ে সম্মুখে পড়ে গেলেন, এবং অন্যত্র দ্বার খোলা থাকলেও বন্ধ আছে ভেবে ফিরে এলেন। এইরূপ নানা প্রকারে বিড়ম্বিত হয়ে তিনি অপ্রসন্নমনে হস্তিনাপুরে প্রস্থান করলেন।
শকুনি জিজ্ঞাসা করলেন, দুর্যোধন, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলছ কেন? দুর্যোধন বললেন, মাতুল, অর্জুনের অস্ত্রপ্রভাবে সম্পন্ন পৃথিবী যুধিষ্ঠিরের বশে এসেছে এবং তাঁর রাজসূয় যজ্ঞও সম্পন্ন হয়েছে দেখে আমি ঈর্ষায় দিবারাত্র দগ্ধ হচ্ছি। কৃষ্ণ শিশুপালকে বধ করলেন, কিন্তু এমন কোনও পুরুষ ছিল না যে তার শোধ নেয়। বৈশ্য যেমন কর দেয় সেইরূপ রাজারা বিবিধ রত্ন এনে যুধিষ্ঠিরকে উপহার দিয়েছেন। আমি অগ্নিপ্রবেশ করব, বিষ খাব, জলে ডুবব, জীবনধারণ করতে পারব না। যদি পাণ্ডবদের সমৃদ্ধি দেখে সহ্য করি তবে আমি পুরুষ নই, স্ত্রী নই, ক্লীবও নই। তাদের রাজশ্রী আমি একাকী আহরণ করতে পারব না, আমার সহায়ও দেখছি না, তাই মৃত্যুচিন্তা করছি। পাণ্ডবদের বিনাশের জন্য আমি পূর্বে বহু যত্ন করেছি, কিন্তু তারা সবই অতিক্রম করেছে। পুরুষকারের চেয়ে দৈবই প্রবল, তাই আমরা ক্রমশ হীন হচ্ছি আর পাণ্ডবরা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাতুল, আমাকে মরতে দিন, আমার দুঃখের কথা পিতাকে জানাবেন।
শকুনি বললেন, যুধিষ্ঠিরের প্রতি ক্রোধ করা তোমার উচিত নয়, পাণ্ডবরা নিজেদের ভাগ্যফলই ভোগ করছে। তারা পৈতৃক রাজ্যের অংশই পেয়েছে এবং নিজের শক্তিতে সমৃদ্ধ হয়েছে, তাতে তোমার দুঃখ হচ্ছে কেন? ধনঞ্জয় অগ্নিকে তুষ্ট ক’রে গাণ্ডীব ধনু, দুই অক্ষয় তূণীর আর ভয়ংকর অস্ত্র সকল পেয়েছে, সে তার কার্মুক আর বাহুর বলে রাজাদের বশে এনেছে, তাতে খেদের কি আছে? ময় দানবকে দিয়ে সে সভা করিয়েছে, কিঙ্কর নামক রাক্ষসেরা সেই সভা রক্ষা করে, তাতেই বা তোমার দুঃখ হবে কেন? তুমি অসহায় নও, তোমার ভ্রাতারা আছেন, মহাধনুর্ধর দ্রোণ, অশ্বত্থামা, সূতপুত্র কর্ণ, কৃপাচার্য, আমি ও আমার ভ্রাতারা, আর রাজা সোমদত্ত—এদের সঙ্গে মিলে তুমি সমগ্র বসুন্ধরা জয় করতে পার।
দুর্যোধন বললেন, যদি অনুমতি দেন তবে আপনাদের সাহায্যে আমি পৃথিবী জয় করব, সকল রাজা আমার বশে আসবে, পাণ্ডবসভাও আমার হবে। শকুনি বললেন, পঞ্চপাণ্ডব, বাসুদেব এবং সপুত্র দ্রুপদ—দেবতারাও এদের হারাতে পারেন না। যুধিষ্ঠিরকে যে উপায়ে জয় করা যায় তা আমি বলছি শোন। সে দ্যূতক্রীড়া ভালবাসে কিন্তু খেলতে জানে না, তথাপি তাকে ডাকলে আসবেই। দ্যূতক্রীড়ায় আমার তুল্য নিপুণ তিনলোকে নেই। তুমি যুধিষ্ঠিরকে আহ্বান কর, আমি তার রাজ্য আর রাজলক্ষ্মী জয় ক’রে নিশ্চয় তোমাকে দেব। এখন তুমি ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি নাও। দুর্যোধন বললেন, সুবলনন্দন, আপনিই তাঁকে বলুন, আমি পারব না।