সভাপর্ব: ১৮। পাণ্ডবগণের বনযাত্রা

বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র, তাঁর পুত্রগণ, দ্রোণ, কৃপ, অশ্বত্থামা, সোমদত্ত, বাহ্লীকরাজ, বিদুর, যযুৎসু, সঞ্জয় প্রভৃতিকে সম্বোধন ক’রে যুধিষ্ঠির বললেন, আমি বনগমনের অনুমতি চাচ্ছি, ফিরে এসে আবার আপনাদের দর্শনলাভ করব। সভাসদ্‌গণ লজ্জায় কিছু বলতে পারলেন না, কেবল মনে মনে যুধিষ্ঠিরের কল্যাণ কামনা করলেন। বিদুর বললেন, আর্যা কুন্তী বৃদ্ধা এবং সুখভোগে অভ্যস্তা, তিনি সসম্মানে আমার গৃহেই বাস করবেন। পাণ্ডবগণ, তোমাদের সর্ব-বিষয়ে মঙ্গল হ'ক। যুধিষ্ঠিরাদি বললেন, নিষ্পাপ পিতৃব্য, আপনি আমাদের পিতার সমান, যা আজ্ঞা করবেন তাই পালন করব।

বিদুর বললেন, যুধিষ্ঠির, অধর্ম দ্বারা বিজিত হ'লে পরাজয়ের দুঃখ হয় না। তুমি ধর্মজ্ঞ, অর্জুন যুদ্ধজ্ঞ, ভীম শত্রুহন্তা, নকুল অর্থসংগ্রহী, সহদেব নিয়মপালক, ধৌম্য শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিৎ, দ্রৌপদী ধর্মচারিণী। তোমরা পরস্পরের প্রিয়, প্রিয়ভাষী, তোমাদের মধ্যে কেউ ভেদ জন্মাতে পারবে না। আপৎকালে এবং সর্ব কার্যে তোমরা বিবেচনা করে চলো। তোমাদের মঙ্গল হ’ক, নির্বিঘ্নে ফিরে এস, আবার তোমাদের দেখব।

কুন্তী ও অন্যান্য নারীদের কাছে গিয়ে দ্রৌপদী বিদায় চাইলেন। অন্তঃপুরে রোদনধ্বনি উঠল। কুন্তী শোকাকুল হয়ে বললেন, বৎসে, তুমি সর্ব-গুণান্বিতা, আমার কোনও উপদেশ দেওয়া অনাবশ্যক। কৌরবগণ ভাগ্যবান তাই তারা তোমার কোপে দগ্ধ হয় নি। তুমি নির্বিঘ্নে যাত্রা কর, আমি সর্বদাই তোমার শুভচিন্তা করব। আমার পুত্র সহদেবকে দেখো, যেন সে এই বিপদে অবসন্ন না হয়।

দ্রৌপদী আলুলায়িত কেশে রক্তাক্ত একবস্ত্রে সরোদনে যাত্রা করলেন। নিরাভরণ পুত্রগণকে আলিঙ্গন ক'রে কুন্তী বললেন, তোমরা ধার্মিক সচ্চরিত্র উদারপ্রকৃতি ভগবৎভক্ত ও যজ্ঞপরায়ণ, তোমাদের ভাগ্যে এই বিপর্যয় কেন হ'ল? তোমাদের পিতা ধন্য, এই বিপদ তাঁকে দেখতে হ'ল না, স্বর্গগতা মাদ্রীও ভাগ্যবতী। আমি তোমাদের ছেড়ে থাকতে পারব না, সঙ্গে যাব। হা কৃষ্ণ দ্বারকাবাসী, কোথায় আছ, আমাদের দুঃখ থেকে ত্রাণ করছ না কেন?

পাণ্ডবগণ কুন্তীকে সান্ত্বনা দিয়ে যাত্রা করলেন। দুর্য্যোধনাদির পত্নীরা দ্রৌপদীর অপমানের বিবরণ শুনে কৌরবগণের নিন্দা ক'রে উচ্চকণ্ঠে রোদন করতে লাগলেন। পুত্রদের অন্যায়ের কথা ভেবে ধৃতরাষ্ট্র উদ্বেগ ও অশান্তি ভোগ করছিলেন। তিনি বিদুরকে ডাকিয়ে বললেন, পাণ্ডবগণ কি ভাবে যাচ্ছেন তা আমি জানতে চাই, তুমি বর্ণনা কর।

বিদুর বললেন, ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির বস্ত্রে মুখ আবৃত ক'রে চলেছেন। মহারাজ, আপনার পুত্রেরা কপট উপায়ে রাজ্য হরণ করলেও যুধিষ্ঠিরের ধর্মবুদ্ধি বিচলিত হয় নি। তিনি দয়ালু, তাই ক্রুদ্ধ হয়েও চক্ষু উন্মীলন করছেন না, পাছে আপনার পুত্রগণ দগ্ধ হয়। শত্রুদের উপর বাহুবল প্রয়োগ করবেন তা জানাবার জন্য ভীম তাঁর বাহুদ্বয় প্রসারিত ক'রে চলেছেন। বাণবর্ষণের পূর্বাভাসরূপে অর্জুন বালুকা বর্ষণ করতে করতে যাচ্ছেন। সহদেব মুখ ঢেকে এবং নকুল সর্বাঙ্গে ধূলি মেখে বিহ্বলচিত্তে চলেছেন। দ্রৌপদী তাঁর কেশজালে মুখ আচ্ছাদিত করে সরোদনে অনুগমন করছেন। পুরোহিত ধৌম্য হাতে কুশ নিয়ে যমদেবতার সাম মন্ত্র গান ক'রে পুরোভাগে চলেছেন। পুরবাসিগণ বিলাপ করছে— হায়, আমাদের রক্ষকগণ চলে যাচ্ছেন! মহারাজ, পাণ্ডবগণের যাত্রাকালে বিনা মেঘে বিদ্যুৎ, ভূমিকম্প, অকালে সূর্য্যগ্রহণ প্রভৃতি দুর্লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

দেবর্ষি নারদ সভামধ্যে বললেন, দুর্য্যোধনের অপরাধে এবং ভীমার্জ্জুনের বলে এখন থেকে চতুর্দ্দশ বর্ষে কৌরবগণ বিনষ্ট হবে। এই বলে তিনি অন্তর্হিত হলেন। বিপৎসাগরে দ্রোণাচার্য্যই দ্বীপস্বরূপ এই মনে ক'রে দুর্য্যোধন কর্ণ ও শকুনি তাঁকেই রাজ্য নিবেদন করলেন। দ্রোণ বললেন, তোমরা আমার শরণাগত তাই তোমাদের ত্যাগ করতে পারব না। পাণ্ডবরা ফিরে এসে তোমাদের উপর প্রতিশোধ নেবে। বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনর সঙ্গে আমার যুদ্ধ করতে হবে এর চেয়ে অধিক দুঃখ আর কি হ'তে পারে। যে ধৃষ্টদ্যুম্ন আমার মৃত্যুর কারণ ব'লে প্রসিদ্ধ আছে, সে পাণ্ডবপক্ষেই থাকবে। দুর্যোধন, তোমার সুখ হেমন্তকালে তালচ্ছায়ার ন্যায় ক্ষণস্থায়ী; অতএব যজ্ঞ দান আর ভোগ ক'রে নাও, এখন থেকে চতুর্দশ বৎসরে তোমাদের মহাবিনাশ হবে।

॥ আরণ্যকপবাধ্যায় ॥