বনপর্ব: ১। যুধিষ্ঠির ও জনমেজয় বিপ্রগণ — সূর্য্যদত্ত তাম্রস্থালী

পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী হস্তিনাপুর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে উত্তরমুখে যাত্রা করলেন। ইন্দ্রসেন প্রভৃতি চৌদ্দ জন ভৃত্য স্ত্রীদের নিয়ে রথে চড়ে তাঁদের পশ্চাতে গেল। পুরবাসীরা কৃতাঞ্জলি হয়ে পাণ্ডবগণকে বললে, আমাদের ত্যাগ করে আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? নিষ্ঠুর শত্রুরা অধর্ম ক'রে আপনাদের জয় করেছে এই সংবাদ শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে আমরা এসেছি। আমরা আপনাদের ভক্ত অনুরক্ত ও হিতকামী, দুরাত্মার অধিষ্ঠিত রাজ্যে আমরা বাস করব না। ধর্ম-অর্থ-কাম এই ত্রিবর্গের সাধক এবং লোকাচারসম্মত ও বেদোক্ত সকল গুণ আপনাদের আছে, আমরা আপনাদের সঙ্গেই থাকব।

যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা ধন্য, ব্রাহ্মণপ্রমুখ প্রজারা আমাদের স্নেহ করেন, তাই যে গুণ আমাদের নেই তাও আজ বলছেন। আমরা আপনাদের কাছে এই অনুরোধ করছি, স্নেহ ও অনুকম্পার বশবর্তী হয়ে অন্যথা করবেন না। — পিতামহ ভীষ্ম, রাজা ধৃতরাষ্ট্র, বিদুর, আমাদের জননী, এবং বহু সুহৃৎ হস্তিনাপুরে রয়েছেন, তাঁরা শোকে বিহ্বল হয়ে আছেন, আপনারা তাঁদের সযত্নে পালন করুন, তাতেই আমাদের মঙ্গল হবে। আপনারা বহুদূরে এসে পড়েছেন, এখন ফিরে যান। আমাদের স্বজনবর্গের ভার আপনাদের উপর রইল, তাঁদের প্রতি স্নেহদৃষ্টি রাখবেন, তাতেই আমরা তুষ্ট হব।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের কথায় প্রজাবর্গ 'হা রাজা' ব'লে আর্তনাদ ক'রে উঠল এবং অনিচ্ছায় বিদায় নিয়ে শোকাতুরচিত্তে ফিরে গেল। তারা চ'লে গেলে পাণ্ডবগণ রথারোহণে যাত্রা করলেন এবং দিনশেষে গঙ্গাতীরে প্রমাণ নামক মহাবট-বৃক্ষের নিকট উপস্থিত হলেন। সেই রাত্রিতে তাঁরা কেবল জলপান ক’রে রইলেন। শিষ্য ও পরিজন সহ কয়েকজন ব্রাহ্মণ পাণ্ডবদের অনুগমন করেছিলেন, তাঁরা সেই রমণীয় ও ভয়সংকুল সন্ধ্যাকালে হোমাগ্নি জ্বেলে বেদধ্বনি ও বিবিধ আলাপ করতে লাগলেন এবং মধুর বাক্যে যুধিষ্ঠিরকে আশ্বাস দিয়ে সমস্ত রাত্রি যাপন করলেন।

পরদিন প্রভাতকালে যুধিষ্ঠির বললেন, আমরা হৃতসৰ্ব্বস্ব হয়ে দুঃখিতমনে বনে যাচ্ছি, সেখানে ফলমূল আর মাংস খেয়ে থাকব। হিংস্রপ্রাণিসমাকুল বনে বহু কষ্ট, আপনারা এখন ফিরে যান। ব্রাহ্মণরা বললেন, রাজা, আপনার যে গতি আমাদেরও সেই গতি হবে। আমাদের ভরণপোষণের জন্য ভাববেন না, নিজেরাই আহার সংগ্রহ ক'রে নেব। আমরা ধ্যান ও জপ করে আপনার মঙ্গল-বিধান করব, মনোহর কথায় চিত্তবিনোদন করব। যুধিষ্ঠির বললেন, আপনারা আহার সংগ্রহ ক'রে ভোজন করবেন তা আমি কি করে দেখব? আপনারা ক্লেশভোগের যোগ্য নন। ধৃতরাষ্ট্রপুত্রদের ধিক, আমাদের প্রতি স্নেহবশেই আপনারা ক্লেশভোগ করতে চাচ্ছেন।

যোগ ও সাংখ্য শাস্ত্রে বিশারদ শৌনক নামক এক ব্রাহ্মণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, রাজা, সহস্র শোকস্থান(১) আছে, শত ভয়স্থান(১) আছে, মূর্খরাই প্রতিদিন তাতে অভিভূত হয়, পণ্ডিতজন হন না। শাস্ত্রসম্মত অমঙ্গলনাশিনী বুদ্ধি আপনার আছে, অর্থকষ্ট, দুর্গমস্থানে বাস বা স্বজনবিচ্ছেদের জন্য শারীরিক বা মানসিক দুঃখে অবসন্ন হওয়া আপনার উচিত নয়। মহাত্মা জনক বলেছেন, রোগ, শ্রম, অপ্রিয় বিষয়ের প্রাপ্তি ও প্রিয় বিষয়ের বিরহ, এই চার কারণে শারীরিক দুঃখ উৎপন্ন হয়। শারীরিক দুঃখের প্রতিবিধান করা এবং মানসিক দুঃখ সম্বন্ধে চিন্তা না করাই দুঃখনিবারণের উপায়। অগ্নি যেমন জলে নির্বাপিত হয় সেইরূপ জ্ঞান দ্বারা মানসিক দুঃখ দূরীকৃত হয়, মন প্রশান্ত হ'লে শারীরিক কষ্টের ও উপশম হয়। স্নেহ(২)ই মানসিক দুঃখের মূল, দুঃখ ভয় শোক হর্ষ আয়াস সবই স্নেহ থেকে উৎপন্ন। জ্ঞানী যোগী ও শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি স্নেহে লিপ্ত হন না। আপনি কোনও বিষয় স্পৃহা করবেন না, যদি ধৰ্ম্ম চান তবে স্পৃহা ত্যাগ করুন।

(১) শোক ও ভয়ের কারণ।
(২) অনুরাগ, আসক্তি।

যুধিষ্ঠির বললেন, ব্রাহ্মণদের ভরণ্যের জন্যই আমি অর্থ কামনা করি, আমার নিজের লোভ নেই। অনুগত জনকে পালন না ক'রে আমার ন্যায় গৃহাশ্রমবাসী কি ক'রে থাকতে পারে? তৃণাসন ভূমি জল ও মধুর বাক্য, এই চারটির অভাব সজ্জনের গৃহে কখনও হয় না। আর্ত ব্যক্তিকে শয্যা, শ্রান্তকে আসন, তৃষিতকে জল এবং ক্ষুধিতকে আহার দিতে হবে। গৃহস্থের পক্ষে এইরূপ আচরণই পরম ধৰ্ম্ম।

শৌনক বললেন, মহারাজ এই বেদবচন আছে—কৰ্ম্ম কর, ত্যাগও কর; অতএব কোনও ধৰ্ম্মকাৰ্য্য কামনাপূৰ্ব্বক করা উচিত নয়। ব্রাহ্মণদের ভরণের জন্য আপনি তপ ও যোগ দ্বারা সিদ্ধিলাভের চেষ্টা করুন, সিদ্ধ ব্যক্তি যা ইচ্ছা করেন তপস্যার প্রভাবে তাই করতে পারেন।

যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের কাছে গিয়ে পুরোহিত ধৌম্যকে বললেন, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ আমার সঙ্গে যাচ্ছেন, কিন্তু আমি দুঃখী, তাঁদের পালন করতে অক্ষম, পরিত্যাগ করতেও পারছি না। কি কৰ্ত্তব্য বলুন। ক্ষণকাল চিন্তা ক'রে ধৌম্য বললেন, সূর্যই সৰ্ব্বভূতের পিতা, প্রাণীদের প্রাণধারণের নিমিত্ত তিনিই অন্নস্বরূপ, তুমি তাঁর শরণাপন্ন হও। ধৌম্য সূর্য্যের অষ্টোত্তর-শত নাম শিখিয়ে দিলে যুধিষ্ঠির পুষ্প ও নৈবেদ্য দিয়ে সূর্য্যের পূজা করলেন এবং কঠোর তপস্যা ও স্তবপাঠে রত হলেন। সূর্য্যদেব প্রসন্ন হয়ে দীপ্যমান মূর্ত্তিতে আবির্ভূত হয়ে বললেন, রাজা, তোমার যা অভীষ্ট আছে সবই তুমি পাবে, বনবাসের দ্বাদশ বৎসর আমি তোমাকে অন্ন দেব। এই তাম্রময় স্থালী নাও, পাঞ্চালী পাকশালায় গিয়ে এই পাত্রে ফল মূল আমিষ শাকাদি রন্ধন ক'রে যতক্ষণ অনাহারে থাকবেন ততক্ষণ চতুৰ্ব্বিধ অন্ন অক্ষয় হয়ে থাকবে। চতুর্দশ বৎসর পরে তুমি আবার রাজ্যলাভ করবে। এই ব'লে সূর্য্য অন্তৰ্হিত হলেন।