বনপর্ব: ৩। ধৃতরাষ্ট্র-সকাশে ব্যাস ও মৈত্রেয়

বিদুর আবার এসেছেন এবং ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছেন শুনে দুয্যোধন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে কর্ণ শকুনি ও দুঃশাসনকে বললেন, পাণ্ডবদের যদি ফিরে আসতে দেখি তবে আমি বিষ খেয়ে, উদ্বন্ধনে, অস্ত্রাঘাতে বা অগ্নিপ্রবেশে প্রাণ বিসর্জ্জন দেব। শকুনি বললেন, তুমি মূর্খের ন্যায় ভাবছ কেন? পাণ্ডবরা প্রতিজ্ঞা ক’রে গেছে, তারা সত্যনিষ্ঠ, তোমার পিতার অনুরোধে ফিরে আসবে না। কর্ণ বললেন, যদি ফিরে আসে তবে আবার দ্যুতক্রীড়ায় তাদের জয় করবেন। দুয্যোধন তুষ্ট হলেন না, মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তখন কর্ণ বললেন, আমরা দুয্যোধনের প্রিয়কামনায় কেবল কিঙ্করের ন্যায় কৃতাঞ্জলি হয়ে থাকব, অথচ স্বাধীনতার অভাবে প্রকৃত প্রিয়কার্য করতে পারব না, এ ঠিক নয়। আমরা সশস্ত্র হয়ে রথারোহণে গিয়ে পাণ্ডবদের বধ করব। সকলেই কর্ণের এই প্রস্তাবের প্রশংসা করলেন এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে পৃথক পৃথক রথে চড়ে যাত্রার উপক্রম করলেন।

কৃষ্ণদ্বৈপায়ন দিব্যদৃষ্টিতে সমস্ত জানতে পেরে ধৃতরাষ্ট্রের কাছে এসে বললেন, পাণ্ডবগণ কপটদ্যূতে পরাজিত হয়ে বনে গেছে — এই ঘটনা আমার প্রীতিকর নয়। তারা তের বৎসর পরে ফিরে এসে কৌরবদের উপর বিষ মোচন করবে। তোমার পাপাত্মা মূঢ় পুত্রকে বারণ কর, সে পাণ্ডবদের মারতে গিয়ে নিজেই প্রাণ হারাবে। রাজা, পাণ্ডবদের প্রতি দুর্যোধনের এই বিদ্বেষ যদি তুমি উপেক্ষা কর তবে ঘোর বিপদ উৎপন্ন হবে। ধৃতরাষ্ট্র বললেন, ভগবান, দ্যূতক্রীড়ায় আমার এবং ভীষ্ম দ্রোণ বিদুর গান্ধারীর মত ছিল না, দৈবের আকর্ষণেই আমি তা হতে দিয়েছিলাম। নির্বোধ দুর্যোধনের স্বভাব জেনেও পুত্রস্নেহবশে তাকে ত্যাগ করতে পারি না।

ব্যাসদেব বললেন, তোমার কথা সত্য, পুত্রের চেয়ে প্রিয় কিছু নেই। আমি একটি আখ্যান বলছি শোন। — পুরাকালে একদা গোমাতা সুরভীকে কাঁদতে দেখে ইন্দ্র তাঁর শোকের কারণ জিজ্ঞাসা করেছিলেন। সুরভী বললেন, দেখুন আমার ওই দুর্বল ক্ষুদ্র পুত্র লাঙ্গলের ভারে পীড়িত হয়ে আছে, কৃষক তাকে কশাঘাত করছে। দুই বৃষের মধ্যে একটি বলবান, সে অধিক ভার বইছে; অন্যটি দুর্বল ও কৃশ, তার দেহের সর্বত্র শিরা দেখা যাচ্ছে, বার বার কশাঘাত হয়েও সে ভার বইতে পারছে না। তার জন্যই আমি শোকার্ত হয়েছি। ইন্দ্র বললেন, তোমার তো সহস্র সহস্র পুত্র নিপীড়িত হয়, একটির জন্য এত কৃপা কেন? সুরভী বললেন, সহস্র পুত্রকে আমি সমদৃষ্টিতে দেখি, কিন্তু যে দীন ও সৎ তারই উপর আমার অধিক কৃপা। তখন ইন্দ্র প্রবল জলবর্ষণ ক'রে কৃষককে বাধা দিলেন। ধৃতরাষ্ট্র, সুরভীর ন্যায় তুমিও সকল পুত্রকে সমভাবে দেখো, কিন্তু দুর্বলকে অধিক কৃপা ক'রো। পুত্র, তুমি পাণ্ডু ও বিদুর সকলেই আমার কাছে সমান। তোমার একশত এক পুত্র; পাণ্ডুর কেবল পাঁচ পুত্র, তারা হীনদশাগ্রস্ত ও দুঃখার্ত। কি উপায়ে তারা জীবিত থাকবে এবং সমৃদ্ধি লাভ করবে এই চিন্তায় আমি সন্তপ্ত আছি। যদি কৌরবগণের জীবনরক্ষা করতে চাও তবে দুর্যোধন যাতে পাণ্ডবদের সঙ্গে শান্তভাবে থাকে সেই চেষ্টা কর।

ধৃতরাষ্ট্র বললেন, মহাপ্রাজ্ঞ মুনি, আপনি যা বললেন তা সত্য। যদি আমরা আপনার অনুগ্রহের যোগ্য হই তবে আপনি নিজেই দুরাত্মা দুর্যোধনকে উপদেশ দিন। ব্যাস বললেন, ভগবান মৈত্রেয় ঋষি পাণ্ডবদের সঙ্গে দেখা করে এখানে আসছেন, তিনিই দুর্যোধনকে উপদেশ দেবেন। এই বলে ব্যাস চলে গেলেন।

মুনিশ্রেষ্ঠ মৈত্রেয় এলে ধৃতরাষ্ট্র অর্ঘ্যাদি দিয়ে তাঁর পূজা করলেন। মৈত্রেয় বললেন, মহারাজ, আমি তীর্থপর্যটন করতে করতে কাম্যকবনে গিয়েছিলাম, সেখানে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আমি শুনলাম আপনার পুত্রদের বিভ্রান্তির ফলে দ্যূতরূপে মহদ্ভয় উপস্থিত হয়েছে। আপনি আর ভীষ্ম জীবিত থাকতে আপনার পুত্রদের (১) মধ্যে বিরোধ হওয়া উচিত নয়। দ্যূতসভায় দস্যুবৃত্তির ন্যায় যা ঘটেছে তাতে আপনি তপস্বীদের সমক্ষে আর মুখ দেখাতে পারেন না। তার পর মৈত্রেয় মিষ্টবাক্যে দুর্যোধনকে বললেন, মহাবাহু, আমি তোমার হিতের জন্য বলছি শোন, পাণ্ডবদের সঙ্গে বিরোধ করো না। তাঁরা সকলেই বিক্রমশালী সত্যব্রত ও তেজস্বী এবং হিড়িম্ব বক প্রভৃতি রাক্ষসগণের হন্তা। ব্যাঘ্র যেমন ক্ষুদ্র মৃগকে বধ করে সেইরূপ বলিশ্রেষ্ঠ ভীম কির্ম্মীর রাক্ষসকে বধ করেছেন। আরও দেখ, দিগ্বিজয়ের পূর্বে ভীম মহাবলদর্পী জরাসন্ধকেও যুদ্ধে নিহত করেছেন। বাসুদেব যাঁদের আত্মীয়, ধৃষ্টদ্যুম্নাদি যাঁদের শ্যালক, তাঁদের সঙ্গে কে যুদ্ধ করতে পারে? রাজা দুর্যোধন, তুমি পাণ্ডবদের সঙ্গে শান্ত আচরণ কর, আমার কথা শোন, ক্রোধের বশবর্ত্তী হয়ো না।

(১) পাণ্ডবরাও ধৃতরাষ্ট্রের পুত্ররূপে গণ্য।

দুর্যোধন তাঁর উরুতে চপেটাঘাত করলেন এবং ঈষৎ হাস্য করে অধোবদনে অঙ্গুষ্ঠ দিয়ে ভূমিতে রেখা কাটতে লাগলেন। দুর্যোধনের এই অবস্থা দেখে মৈত্রেয় ক্রোধে রক্তলোচন হলেন এবং জলস্পর্শ করে অভিশাপ দিলেন, তুমি আমার কথা অগ্রাহ্য করছ, এই অহংকারের ফল শীঘ্রই পাবে, মহাযুদ্ধে গদাঘাতে ভীম তোমার উরু ভগ্ন করবেন। ধৃতরাষ্ট্র প্রসন্ন করবার চেষ্টা করলে মৈত্রেয় বললেন, রাজা, দুর্যোধন যদি শান্তভাবে চলে তবে আমার শাপ ফলবে না, নতুবা ফলবে। ধৃতরাষ্ট্র জিজ্ঞাসা করলেন, কির্ম্মীরকে ভীম কি করে বধ করেছেন? মৈত্রেয় উত্তর দিলেন, আমি আর কিছু বলব না, আপনার পুত্র আমার কথা শুনতে চায় না। আমি চলে গেলে বিদুরের কাছে শুনবেন।