বনপর্ব: ২। ধৃতরাষ্ট্রের অস্থির মতি
বরলাভ ক'রে যুধিষ্ঠির ধৌম্যকে প্রণাম এবং ভ্রাতাদের আলিঙ্গন করলেন, এবং তখনই দ্রৌপদীর সঙ্গে পাকশালায় গিয়ে রন্ধন করলেন। চৰ্ব্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় এই চতুৰ্ব্বিধ খাদ্য প্রস্তুত হ'ল, অল্প হলেও তা প্রয়োজনমত বাড়তে লাগল। ব্রাহ্মণভোজন শেষ হ'লে যুধিষ্ঠিরের ভ্রাতারা খেলেন, তার পর বিঘস নামক অবশিষ্ট অন্ন যুধিষ্ঠির এবং সৰ্ব্বশেষে দ্রৌপদী খেলেন। তখন অন্ন নিঃশেষ হয়ে গেল। সূর্য্যের বরপ্রভাবে এইরূপে যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণগণকে অভিলষিত বস্তু দান করতে লাগলেন। কিছু কাল পরে পাণ্ডবগণ ধৌম্য ও অন্য ব্রাহ্মণদের সঙ্গে কাম্যকবনে যাত্রা করলেন।
২। ধৃতরাষ্ট্রের অস্থির মতি পাণ্ডবদের বনযাত্রার পর প্রজ্ঞাচক্ষু(১) ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে বললেন, তোমার বুদ্ধি নির্ম্মল, ধৰ্ম্মের সূক্ষ্ম তত্ত্ব তুমি জান, কুরুবংশীয়গণকে তুমি সমদৃষ্টিতে দেখ; যাতে কুরুপাণ্ডবের হিত হয় এমন উপায় বল। বিদুর বললেন, মহারাজ, অর্থ কাম ও মোক্ষ এই ত্রিবর্গের মূল ধর্ম; রাজ্যেরও মূল ধর্ম। সেই ধর্মকে বঞ্চিত করে শকুনি প্রভৃতি পাপাত্মারা যুধিষ্ঠিরকে পরাজিত করেছে। আপনি পূর্বে যেমন পাণ্ডবদের সমস্ত সম্পত্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এখন আবার সেইরূপ দিন। পাণ্ডবদের তোষণ এবং শকুনির অবমাননা—এই আপনার সর্বপ্রধান কার্য; এই যদি করেন তবেই আপনার পুত্রদের কিছু রাজ্য রক্ষা পাবে। দুর্যোধন যদি সন্তুষ্ট হয়ে পাণ্ডবদের সঙ্গে একযোগে রাজ্য ভোগ করে তবে আপনার দুঃখ থাকবে না। যদি তা না হয় তবে দুর্যোধনকে নিগৃহীত ক’রে যুধিষ্ঠিরকে রাজ্যের আধিপত্য দিন, দুর্যোধন শকুনি আর কর্ণ পাণ্ডবগণের অনুগত হোক, দুঃশাসন সভামধ্যে ভীমসেন আর দ্রৌপদীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুক। এ ছাড়া আর কি পরামর্শ আমি দিতে পারি?
ধৃতরাষ্ট্র বললেন, তুমি পূর্বে দ্যুতসভায় যা বলেছিলে এখন আবার তাই বলছ। তোমার কথা পাণ্ডবদের হিতকর, আমাদের অহিতকর। পাণ্ডবদের জন্য নিজের পুত্রকে কি করে ত্যাগ করব? পাণ্ডবরাও আমার পুত্র বটে, কিন্তু দুর্যোধন আমার দেহ থেকে উৎপন্ন। বিদুর, আমি তোমার বহু সম্মান করে থাকি, কিন্তু তুমি যা বলছ সবই কুটিলতাময়। তুমি চ’লে যাও বা থাক, যা ইচ্ছা কর। অসতী স্ত্রীর সঙ্গে মিষ্ট ব্যবহার করলেও সে স্বামীত্যাগ করে। ধৃতরাষ্ট্র এই ব’লে সহসা অন্তঃপুরে চ’লে গেলেন। বিদুর হতাশ হয়ে পাণ্ডবদের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
পাণ্ডবগণ পশ্চিম দিকে যাত্রা করে সরস্বতী নদীর তীরে সমতল মরূপ্রদেশের নিকটবর্তী কাম্যকবনে এলেন। পশুপক্ষিসমাকুল সেই বনে তাঁরা মুনিগণের সঙ্গে বাস করতে লাগলেন। বিদুর রথারোহণে আসছেন দেখে যুধিষ্ঠির ভীমকে বললেন, ইনি কি আবার আমাদের দ্যুতক্রীড়ায় ডাকতে এসেছেন? শকুনি কি আমাদের অস্ত্রশস্ত্রও জয় করে নিতে চায়?
যুধিষ্ঠিরাদি আসন থেকে উঠে বিদুরের সংবর্ধনা করলেন। বিশ্রামের পর বিদুর বললেন, ধৃতরাষ্ট্র আমার কাছে হিতকর মন্ত্রণা চেয়েছিলেন, কিন্তু আমার কথা তাঁর রুচিকর হয় নি, তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে বললেন, যেখানে ইচ্ছা চ’লে যাও, রাজ্যশাসনের জন্য তোমার সাহায্য আর আমি চাই না। যুধিষ্ঠির, ধৃতরাষ্ট্র আমাকে ত্যাগ করেছেন, এখন আমি তোমাকে সদুপদেশ দিতে এসেছি। পূর্বে তোমাকে যা বলেছিলাম এখনও তাই বলছি। — শত্রু কর্তৃক নির্যাতিত হয়েও যে সহিষ্ণু হয়ে কালপ্রতীক্ষা করে সে একাকীই সমস্ত পৃথিবী ভোগ করে। সহায়দের সঙ্গে যে সমভাবে বিষয় ভোগ করে, সহায়রা তার দুঃখেরও অংশভাগী হয়। সহায়সংগ্রহের এই উপায়, তাতেই রাজ্যলাভ হয়। পাণ্ডুপুত্র, অন্নাদি সমস্তই সমভাবে সহায়দের সঙ্গে ভোগ করবে, অনর্থক কথা বলবে না, আত্মশ্লাঘা করবে না, এইরূপ আচরণেই রাজারা সমৃদ্ধি লাভ করেন।
বিদুর চ’লে গেলে ধৃতরাষ্ট্রের অনুতাপ হ’ল। তিনি সঞ্জয়কে বললেন, — বিদুর আমার ভ্রাতা সুহৃৎ এবং সাক্ষাৎ ধর্ম্ম, তাঁর বিচ্ছেদে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে, তুমি শীঘ্র তাঁকে নিয়ে এস। যাও সঞ্জয়, তিনি বেঁচে আছেন কি না দেখ। আমি পাপী তাই ক্রোধবশে তাঁকে দূর ক’রে দিয়েছি, তিনি না এলে আমি প্রাণত্যাগ করব। সঞ্জয় অবিলম্বে কাম্যকবনে উপস্থিত হলেন। কুশলজিজ্ঞাসার পর সঞ্জয় বললেন, ক্ষমা, রাজা ধৃতরাষ্ট্র আপনাকে স্মরণ করেছেন, পাণ্ডবদের অনুমতি নিয়ে সত্বর হস্তিনাপুরে চলুন, রাজার প্রাণরক্ষা করুন।
বিদুর ফিরে গেলেন। ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে ক্রোড়ে নিয়ে মস্তক আঘ্রাণ ক’রে বললেন, ধর্ম্মজ্ঞ, আমার ভাগ্যক্রমে তুমি ফিরে এসেছ, তোমার জন্য আমি দিবারাত্র অনিদ্রায় আছি, অসুস্থ বোধ করছি। যা বলেছি তার জন্য ক্ষমা কর। বিদুর বললেন, মহারাজ, আপনি আমার পরম গুরু, আপনাকে দেখবার জন্য আমি ব্যগ্র হয়ে সত্বর চ’লে এসেছি। আপনার আর পাণ্ডুর পুত্রেরা আমার কাছে সমান — পাণ্ডবরা এখন দুর্দশাগ্রস্ত তাই আমার মন তাদের দিকে গেছে।