বনপর্ব: ৫। কৃষ্ণের আগমন — দ্রৌপদীর ক্ষোভ

পাণ্ডবগণের বনবাসের সংবাদ পেয়ে ভোজ বৃষ্ণি ও অন্ধক বংশীয়গণ তাঁদের দেখতে এলেন। পাঞ্চালরাজের পুত্রগণ, চেদিরাজ ধৃষ্টকেতু এবং কেকয়-রাজপুত্রগণও এলেন। সেই ক্ষত্রিয়বীরগণ বাসুদেব কৃষ্ণকে পুরোবর্তী করে যুধিষ্ঠিরের চতুর্দিকে উপবেশন করলেন।

বিষণ্ণমনে যুধিষ্ঠিরকে অভিবাদন করে কৃষ্ণ বললেন, যুদ্ধভূমি দুরাত্মা দুর্যোধন কর্ণ শকুনি আর দুঃশাসনের শোণিত পান করবে। তাদের নিহত এবং দলের সকলকে পরাজিত করে আমরা ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজ্যে অভিষিক্ত করব। অনিষ্টকারী শঠকে বধ করাই সনাতন ধর্ম।

পাণ্ডবগণের পরাজয়ে জনার্দন কৃষ্ণ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, তিনি যেন সবলোকে দগ্ধ করতে উদ্যত হলেন। অর্জুন তাঁকে শান্ত করে তাঁর পূর্বজন্মের কার্যকলাপ কীর্তন করলেন।— কৃষ্ণ, তুমি পুরাকালে গন্ধমাদন পর্বতে যযাসায়ংগৃহ (১) মুনি হয়ে দশ সহস্র বৎসর বিচরণ করেছিলে। আমি ব্যাসদেবের কাছে শুনেছি, তুমি বহু বৎসর পুষ্কর তীর্থে, বিশাল বদ্রিকায়, সরস্বতীনদীতীরে ও প্রভাস তীর্থে কৃচ্ছ্রসাধন করেছিলে। তুমি ক্ষেত্রজ্ঞ, সর্বভূতের আদি ও অন্ত, তপস্যার নিধান, সনাতন যজ্ঞস্বরূপ। তুমি সমস্ত দৈত্যদানব বধ করে শচীপতিকে সর্বেশ্বর করেছিলে। তুমিই নারায়ণ হরি রহস্য। সূর্য চন্দ্র কাল আকাশ পৃথিবী। তুমি শিশু বামনরূপে তিন পদক্ষেপে স্বর্গ আকাশ ও মর্ত্য আক্রমণ করেছিলে। তুমি নিশুন্ত নরকাসুর শিশুপাল জরাসন্ধ শৈব্য শতধন্বা প্রভৃতিকে জয় করেছ, রুক্মীকে পরাস্ত করে ভীষ্মকদুহিতা রুক্মিণীকে হরণ করেছ; ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজা, যবন কসেরুমান ও শাল্বকে বধ করেছ। জনার্দন, তুমি দ্বারকা নগরী আত্মসাৎ করে সমুদ্রে নিমগ্ন করবে। তোমাতে ক্রোধ বিদ্বেষ অসত্য নৃশংসতা কুটিলতা নেই। ব্রহ্মা তোমার নাভিপদ্ম থেকে উৎপন্ন, তুমি মধুকৈটভহন্তা, শূলপাণি শম্ভু তোমার ললাট থেকে জন্মেছেন।

কৃষ্ণ বললেন, অর্জুন, তুমি আমারই, আমি তোমারই, যা আমার তাই তোমার, যে তোমাকে দ্বেষ করে সে আমাকেও করে, যে তোমার অনুগত সে আমারও অনুগত। তুমি নর আর আমি নারায়ণ ঋষি ছিলাম, আমরা এখন নরলোকে এসেছি।

শরণার্থিনী দ্রৌপদী পুণ্ডরীকাক্ষকে বললেন, হৃষীকেশ, ব্যাস বলেছেন তুমি দেবগণেরও দেব। তুমি সর্বভূতের ঈশ্বর, সেজন্য প্রণয়বশে আমি তোমাকে দুঃখ জানাচ্ছি। আমি পাণ্ডবগণের ভার্যা, তোমার সখী, ধৃষ্টদ্যুম্নের ভগিনী; দুঃশাসন কেন আমাকে কুরুসভায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল? আমার একমাত্র বস্ত্র শোণিতসিক্ত, আমি লজ্জায় কাঁপছি, আমাকে দেখে পাপাত্মা ধার্তরাষ্ট্রগণ হেসে উঠল। পাণ্ডুর পঞ্চপুত্রেরা, পাঞ্চালগণ ও বৃষ্ণিগণ জীবিত থাকতে তারা আমাকে দাসীরূপে ভোগ করতে চেয়েছিল। ধিক পাণ্ডবগণ, ধিক ভীমসেনের বল, ধিক অর্জুনের গাণ্ডীব! তাঁদের ধর্মপত্নীকে যখন নীচজন পীড়ন করছিল তখন তাঁরা নীরবে দেখছিলেন। স্বামী দুর্বল হলেও স্ত্রীকে রক্ষা করে, এই সনাতন ধর্ম। পাণ্ডবরা শরণাগতকে ত্যাগ করেন না, কিন্তু আমাকে রক্ষা করেন নি। কৃষ্ণ, আমি বহু ক্লেশ পেয়ে আর্যা-কুন্তীকে ছেড়ে পুরোহিত ধৌম্যের আশ্রমে বাস করছি। আমি যে নির্যাতন ভোগ করেছি তা এই সিংহবিক্রান্ত বীরগণ কেন উপেক্ষা করছেন? দেবতার বিধানে মহৎ কুলে আমার জন্ম, আমি পাণ্ডবদের প্রিয়া ভার্যা, মহাত্মা পাণ্ডুর পুত্রবধূ, তথাপি পঞ্চপাণ্ডবের সমক্ষেই দুঃশাসন আমার কেশাকর্ষণ করেছিল।

মৃদুভাষিণী কৃষ্ণা পদ্মকোষতুল্য হস্তে মুখ আবৃত করে সরোদনে বললেন, মধুসূদন, আমার পতি নেই, পুত্র নেই, বান্ধব ভ্রাতা পিতা নেই, তুমিও নেই। ক্ষুদ্রেরা আমাকে নির্যাতিত করেছে, কর্ণ আমাকে উপহাস করেছে, তোমরা তার কোনও প্রতিকার করছ না। কেশব, আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক (১) আছে, তোমার যশোগৌরব আছে, তুমি সখা ও প্রভু (২), এই চার কারণে আমাকে রক্ষা করা তোমার উচিত।

(১) কৃষ্ণ দ্রৌপদীর মামাতো দেওর।
(২) নিগ্রহ-অনুগ্রহ-সমর্থ।

কৃষ্ণ বললেন, ভামিনী, তুমি যাদের উপর ক্রুদ্ধ হয়েছ তারা অর্জুনের শরে আচ্ছন্ন হয়ে রক্তাক্তদেহে ভূমিতে শোবে, তা দেখে তাদের ভার্যারা রোদন করবে। পাণ্ডবদের জন্য যা সম্ভবপর তা আমি করব, তুমি শোক করো না। কৃষ্ণা, আমি সত্য প্রতিজ্ঞা করছি, তুমি রাজগণের রাজ্ঞী হবে। যদি আকাশ পতিত হয়, হিমালয় দীর্ণ হয়, পৃথিবী খণ্ড খণ্ড হয়, সমুদ্র শুষ্ক হয়, তথাপি আমার বাক্য ব্যর্থ হবে না।

দ্রৌপদী অর্জুনের দিকে বক্র দৃষ্টিপাত করলেন। অর্জুন তাঁকে বললেন, দেবী, রোদন ক'রো না, মধুসূদন যা বললেন তার অন্যথা হবে না। ধৃষ্টদ্যুম্ন বললেন, আমি দ্রোণকে বধ করব; শিখণ্ডী ভীষ্মকে, ভীমসেন দুৰ্য্যোধনকে এবং ধনঞ্জয় কর্ণকে বধ করবেন। ভগিনী, বলরাম আর কৃষ্ণকে সহায় রূপে পেলে আমরা ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধেও অজেয় হব।

কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, আমি যদি দ্বারকায় থাকতাম তবে আপনাদের এই কষ্ট হ'ত না। আমাকে না ডাকলেও আমি কুরুসভায় যেতাম এবং ভীষ্ম দ্রোণ ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতিকে বুঝিয়ে দ্যূতক্রীড়া নিবারণ করতাম। ধৃতরাষ্ট্র যদি মিষ্টি কথা না শুনতেন তবে তাঁকে সবলে নিগৃহীত করতাম, সুহৃদ্বেশী শঠ দ্যুতকারগণকে বধ করতাম। আমি দ্বারকায় ফিরে এসে সাত্যকির কাছে আপনার বিপদের কথা শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে আপনাকে দেখতে এসেছি। হা, আপনারা সকলেই বিষাদসাগরে নিমগ্ন হয়ে কষ্ট পাচ্ছেন।