বনপর্ব: ৬। শাল্ববধের বৃত্তান্ত — দ্বৈতবন
যুধিষ্ঠির জিজ্ঞাসা করলেন, কৃষ্ণ, তুমি দ্বারকা ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলে? তোমার কি প্রয়োজন ছিল?
কৃষ্ণ বললেন, আমি শাল্ব রাজার সৌভনগর বিনাশ করতে গিয়েছিলাম। আপনার রাজসূয় যজ্ঞে আমি শিশুপালকে বধ করেছি শুনে শাল্ব ক্রুদ্ধ হয়ে দ্বারকাপুরী আক্রমণ করেন। তিনি তাঁর সৌভবিমানে ব্যূহ রচনা করে আকাশে অবস্থান করলেন। এই বৃহৎ বিমানই তাঁর নগর। যাদববীরগণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে দ্বারকাপুরী সর্বপ্রকারে সুরক্ষিত করলেন। উগ্রসেন (১) উদ্ধব (২) প্রভৃতি ঘোষণা করলেন, কেউ সুরাপান করতে পাবে না। আনৰ্ত (৩) দেশবাসী নট নর্তক ও গায়কগণকে অন্যত্র পাঠানো হ'ল। সমস্ত সেতু ভেঙে দেওয়া হ'ল এবং নৌকার যাতায়াত নিষিদ্ধ হ'ল। সৈন্যদের বেতন খাদ্য ও পরিচ্ছদ দিয়ে সন্তুষ্ট করা হ'ল। শাল্বের চতুরঙ্গিণী সেনা সর্বদিক বেষ্টন ক'রে দ্বারকা অবরোধ করলে। তখন চারুদেষ্ণ প্রদ্যুম্ন শাম্ব (৪) প্রভৃতি বীরগণ রথারোহণে শাল্বের সম্মুখীন হলেন। জাম্ববতীপুত্র শাম্ব শাল্বের সেনাপতি ক্ষেমবৃদ্ধির সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগলেন। ক্ষেমবৃদ্ধি আহত হয়ে পালিয়ে গেলে বেগবান নামে এক দৈত্য শাম্বকে আক্রমণ করলে, কিন্তু সে শাল্বের গদাঘাতে নিহত হ’ল। বিবিন্ধ্য নামক এক মহাবল দানবকে চারুদেশ্ন বধ করলেন।
প্রদ্যুম্ন শাল্বের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। তিনি শরাঘাতে মূর্ছিত হয়ে প’ড়ে গেলে সারথি দারুকপুত্র তাঁকে দ্রুতগামী রথে যুদ্ধভূমি থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। সংজ্ঞালাভ করে প্রদ্যুম্ন বললেন, তুমি রথ ফিরিয়ে নাও, যুদ্ধ থেকে পালানো বৃষ্ণিকুলের রীতি নয়। আমাকে পশ্চাৎপদ দেখলে কৃষ্ণ বলরাম সাত্যকি প্রভৃতি কি বলবেন? কৃষ্ণ আমাকে দ্বারকারক্ষার ভার দিয়ে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে গেছেন, তিনি আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন না। রুক্মিণীপুত্র প্রদ্যুম্ন আবার রণস্থলে গেলেন এবং শাল্বকে শরাঘাতে ভূপাতিত করে এক ভয়ংকর শর ধনুতে সন্ধান করলেন। তখন ইন্দ্রাদি দেবগণের আদেশে নারদ ও পবনদেব দ্রুতবেগে এসে প্রদ্যুম্নকে বললেন, বীর, শাল্বরাজ তোমার বধ্য নন, বিধাতা সংকল্প করেছেন যে কৃষ্ণের হাতে এ’র মৃত্যু হবে। প্রদ্যুম্ন নিবৃত্ত হলেন, শাল্বও দ্বারকা ত্যাগ ক’রে সৌভবিমানে আকাশে উঠলেন।
মহারাজ যুধিষ্ঠির, আপনার রাজসূয় যজ্ঞ শেষ হ’লে আমি দ্বারকায় ফিরে এসে দেখলাম যে শাল্বের আক্রমণে নগরী বিধ্বস্ত হয়েছে। উগ্রসেন বসুদেব প্রভৃতিকে অক্ষত ক’রে চতুরঙ্গ বল নিয়ে আমি মার্ত্তিকাবত দেশে গেলাম এবং সেখান থেকে শাল্বের অনুসরণ করলাম। শাল্ব সমুদ্রের উপরে আকাশে অবস্থান করছিলেন। আমার শার্ঙ্গধনু থেকে নিক্ষিপ্ত শর তাঁর সৌভবিমান স্পর্শ করতে পারল না। তখন আমি মন্ত্রাহূত অসংখ্য শর নিক্ষেপ করলাম, তাঁর আঘাতে সৌভমধ্যস্থ যোদ্ধারা কোলাহল ক’রে মহার্ণবে নিপাতিত হ’ল। সৌভপতি শাল্ব মায়াযুদ্ধ আরম্ভ করলেন, আমি প্রজ্ঞাস্ত্ৰ দ্বারা তাঁর মায়া অপসারিত করলাম।
এই সময়ে উগ্রসেনের এক ভৃত্য এসে আমাকে তাঁর প্রভুর এই বার্তা জানালে। — কেশব, শাল্ব দ্বারকায় গিয়ে তোমার পিতা বসুদেবকে বধ করেছে, আর যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, তুমি ফিরে এস। এই সংবাদ শুনে আমি বিহ্বল হয়ে যুদ্ধ করতে লাগলাম। সহসা দেখলাম, আমার পিতা হস্তপদ প্রসারিত করে সৌভবিমান থেকে নিপতিত হচ্ছেন। কিছুক্ষণ সংজ্ঞাহীন হয়ে থাকবার পর প্রকৃতিস্থ হয়ে দেখলাম, সৌভবিমান নেই, শাল্ব নেই, আমার পিতাও নেই। তখন বুঝলাম সমস্তই মায়া। দানবগণ অদৃশ্য বিমান থেকে শিলাবর্ষণ করতে লাগল। অবশেষে আমি ক্ষুরধার নির্মল কালান্তক যমতুল্য সুদর্শন চক্রকে অভিমন্ত্রিত ক’রে বললাম, তুমি সৌভবিমান এবং তার অধিবাসী রিপুগণকে বিনষ্ট কর। তখন যুগান্তকালীন দ্বিতীয় সূর্য্যের ন্যায় সুদর্শন চক্র আকাশে উঠল, এবং ক্বকচ (করাত) যেমন কাষ্ঠ বিদারিত করে সেইরূপ সৌভবিমানকে বিদারিত করলে। সুদর্শন চক্র আমার হাতে ফিরে এলে তাকে আবার আদেশ দিলাম, শাল্বের অভিমুখে যাও। সুদর্শনের আঘাতে শাল্ব দ্বিভণ্ডিত হলেন, তাঁর অনুচর দানবগণ হা হা রব করে পালিয়ে গেল।
শাল্ববধের বিবরণ শেষ ক'রে কৃষ্ণ বললেন, মহারাজ, আমি দ্যূতসভায় কেন যেতে পারি নি তার কারণ বললাম। আমি গেলে দ্যূতক্রীড়া হত না। তার পর কৃষ্ণ পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদীর কাছে বিদায় নিয়ে সুভদ্রা ও অভিমন্যুর সঙ্গে রথারোহণে দ্বারকায় যাত্রা করলেন। ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রৌপদীর পুত্রদের নিয়ে পাঞ্চালরাজ্যে এবং ধৃষ্টকেতু নিজের ভগিনী(১)র সঙ্গে চেদিরাজ্যে গেলেন, কেকয়গণ(২) ও স্বরাজ্যে প্রস্থান করলেন।
ব্রাহ্মণগণকে বহু ধন দান করে এবং কুরুজাঙ্গলবাসী প্রজাবর্গের নিকট বিদায় নিয়ে পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদী ও ধৌম্য রথারোহণে অন্য বনে এলেন। যুধিষ্ঠির তাঁর ভ্রাতাদের বললেন, আমাদের বার বৎসর বনবাস করতে হবে, তোমরা এই মহারণ্যে এমন একটি স্থান দেখ যেখানে বহু মৃগ পক্ষী পুষ্প ফল পাওয়া যায় এবং যেখানে সাধুলোকে বাস করেন। অর্জুন বললেন, দ্বৈতবন রমণীয় স্থান, ওখানে সরোবর আছে, পুষ্পফল পাওয়া যায়, ঋষিগণও বাস করেন। আমরা ওখানেই বার বৎসর কাটাব।
পাণ্ডবগণ দ্বৈতবনে সরস্বতী নদীর নিকটে আশ্রম নির্মাণ ক'রে বাস করতে লাগলেন। একদিন মহামুনি মার্কণ্ডেয় তাঁদের আশ্রমে এলেন। তিনি পাণ্ডবগণের পূজা গ্রহণ ক'রে তাঁদের দিকে চেয়ে একটু হাসলেন। যুধিষ্ঠির দুঃখিত হয়ে বললেন, আমাদের দুর্ভাগ্যের জন্য এই তপস্বীরা সকলেই অপ্রফুল্ল হয়ে আছেন, কিন্তু আপনি হৃষ্ট হয়ে হাসলেন কেন? মার্কণ্ডেয় বললেন, বৎস আমি আনন্দের জন্য হাসি নি, তোমার বিপদ দেখে আমার সত্যব্রত দাশরথি রামকে মনে পড়েছে, আমি তাঁকে ঋষ্যমৃক পর্বতে দেখেছিলাম। তিনি ইন্দ্রতুল্য-মহাপ্রভাব এবং সমরে অজেয় হয়েও ধর্মের জন্য রাজভোগ ত্যাগ ক'রে বনে গিয়েছিলেন। নিজেকে শক্তিমান ভেবে অধর্ম করা কারও উচিত নয়। যুধিষ্ঠির, তোমার প্রতিজ্ঞা অনুসারে বনবাসের কষ্ট সয়ে তুমি আবার রাজশ্রী লাভ করবে।
মার্কণ্ডেয় চলে গেলে দাল্ভ্যগোত্রীয় বক মুনি এলেন। তিনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, কুন্তীপুত্র, অগ্নি ও বায়ু মিলিত হয়ে যেমন বন দগ্ধ করে, সেইরূপ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় মিলিত হয়ে শত্রুবিনাশ করতে পারেন। ব্রাহ্মণের উপদেশ না পেলে ক্ষত্রিয় চালকহীন হস্তীর ন্যায় সংগ্রামে দুর্ব্বল হয়। যুধিষ্ঠির, অলব্ধ বিষয়ের লাভের জন্য, লব্ধ বিষয়ের বৃদ্ধির জন্য, এবং যোগ্যপাত্রে দানের জন্য তুমি যশস্বী বেদবিৎ ব্রাহ্মণগণের সংসর্গ কর।