বনপর্ব: ১২। ভীমের অন্বেষ — মহর্ষি বৃহদশ্ব
একদিন পাণ্ডবরা দ্রৌপদীর সঙ্গে দুঃখিতমনে কাম্যকবনে উপস্থিত ছিলেন। ভীম যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, আমাদের পৌরুষ আছে, বলবানদের সাহায্য নিয়ে আমরা আরও বলশালী হ’তে পারি, কিন্তু আপনার দ্যূতদোষের জন্য সকলে কষ্ট পাচ্ছি। রাজ্যশাসনই ক্ষত্রিয়ের ধর্ম, বনবাস নয়। আমরা অর্জুনকে ফিরিয়ে এনে এবং জনার্দন কৃষ্ণের সহায়তায় বার বৎসরের পূর্বেই ধার্তরাষ্ট্রদের বধ করব। শত্রুরা দূরে হলে আপনি বন থেকে ফিরে যাবেন, তা হলে আপনার দোষ হবে না। তার পর আমরা অনেক যত্ন করে পাপমুক্ত হয়ে উত্তম স্বর্গে যাব। রাজা, এইরূপই হ’তে পারে যদি আপনি নির্বুদ্ধিতা দীর্ঘসূত্রতা আর ধর্মপরায়ণতা ত্যাগ করেন। শঠতার দ্বারা শঠকে বধ করা পাপ নয়। ধর্মজ্ঞ লোকের বিচারে দুঃসহ দুঃখের কালে এক অহোরাত্রই এক বৎসরের সমান গণ্য হয়—এইরূপ বেদবচনও শোনা যায়। অতএব আমাদের তের দিনেই তের বৎসর পূর্ণ হয়েছে, দুর্যোধনাদিকে বধ করবার সময় এসেছে। দুর্যোধনের চর সর্বত্র আছে, অজ্ঞাতবাসকালেও সে আমাদের সন্ধান পেয়ে আবার বনবাসে পাঠাবে। যদি অজ্ঞাতবাস থেকে উত্তীর্ণ হই তবে সে আবার আপনাকে দ্যূতক্রীড়ায় ডাকবে। আপনার নিপুণতা নেই, খেলতে খেলতে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন, সেজন্য আবার আপনি হারবেন।
যুধিষ্ঠির ভীমকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, মহাবাহু, তের বৎসর উত্তীর্ণ হ’লে তুমি আর অর্জুন মিলিত হয়ে দুর্যোধনকে বধ করবে। তুমি বলছ, সময় এসেছে, কিন্তু আমি মিথ্যা বলতে পারব না। শঠতা না করেও তুমি শত্রুবধ করবে।
এমন সময় মহর্ষি বৃহদশ্ব সেখানে এলেন। যুধিষ্ঠির যথাশাস্ত্র মধুপর্ক দিয়ে তাঁকে পূজা করলেন। বৃহদশ্ব বিশ্রামের পর উপবিষ্ট হলে যুধিষ্ঠির তাঁকে বললেন, ভগবান, ধূর্ত দ্যুতকারগণ আমার রাজ্য ও ধন শঠতার দ্বারা হরণ করেছে। আমি সরলস্বভাব অক্ষনিপুণ নই। তারা আমার প্রিয়তমা ভার্যাকে দ্যুতসভায় নিয়ে গিয়েছিল, তার পর দ্বিতীয়বার দ্যূতে জয়লাভ ক’রে আমাদের বনে পাঠিয়েছে। দ্যুতসভায় কর্ণ যে দারুণ কটূবাক্য বলেছে এবং আমার দুঃখার্ত সুহৃদ্গণ যা বলেছিলেন তা আমার হৃদয়ে নিহিত আছে, সমস্ত রাত্রি আমি সেইসকল কথা চিন্তা করি। অর্জুনের বিরহেও আমি যেন প্রাণহীন হয়ে আছি। আমার চেয়ে মন্দভাগ্য ও দুঃখার্ত কোনও রাজাকে আপনি জানেন কি?
মহর্ষি বৃহদশ্ব বললেন, যদি শুনতে চাও তবে এক রাজার কথা বলব যিনি তোমার চেয়েও দুঃখী ছিলেন। যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে বৃহদশ্ব নল রাজার এই উপাখ্যান বললেন —