বনপর্ব: ১৩। নিষধরাজ নল — দময়ন্তীর স্বয়ংবর

নিষধ দেশে নল নামে এক বলশালী সদ্গুণান্বিত রূপবান অশ্বতত্ত্বজ্ঞ রাজা ছিলেন। তিনি বীরসেনের পুত্র, ব্রাহ্মণপালক, বেদজ্ঞ, দ্যূতপ্রিয়, সত্যবাদী, এবং বৃহৎ অক্ষৌহিণী সেনার অধিপতি। তাঁর সমকালে বিদর্ভ দেশে ভীম নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি ও তাঁর মহিষী ব্রহ্মর্ষি দমনকে সেবায় তুষ্ট ক’রে একটি কন্যা ও তিনটি পুত্র লাভ করেন। কন্যার নাম দময়ন্তী, তিন পুত্রের নাম দম, দান্ত ও দমন। দময়ন্তীর ন্যায় সুন্দরী মনুষ্যলোকে কেউ ছিল না, দেবতাঃ ও তাঁকে দেখে আনন্দিত হতেন।

লোকে নল ও দময়ন্তীর নিকট পরস্পরের রূপগুণের প্রশংসা করত, তার ফলে দেখা না হলেও তাঁরা পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত হলেন। একদিন নল নির্জন উদ্যানে বেড়াতে বেড়াতে কতকগুলি কনকবর্ণ হংস দেখতে পেলেন। তিনি একটিকে ধরলে সে বললে, রাজা, আমাকে মারবেন না, আমি আপনার প্রিয়কার্য করব, দময়ন্তীর কাছে গিয়ে আপনার সম্বন্ধে এমন ক’রে বলব যে তিনি অন্য পুরুষ কামনা করবেন না। নলের কাছে মুক্তি পেয়ে সেই হংস তার সহচরদের সঙ্গে বিদর্ভ দেশে দময়ন্তীর নিকট উপস্থিত হ’ল। রাজকন্যা ও তাঁর সখীরা সেই সকল আশ্চর্য হংস দেখে হৃষ্ট হয়ে তাদের ধরবার চেষ্টা করলেন। দময়ন্তী যাকে ধরতে গেলেন সেই হংস মানুষের ভাষায় বললে, নিষধরাজ নল মূর্ত্তিমান কন্দর্পের ন্যায় রূপবান, তাঁর সমান আর কেউ নেই। আপনি যেমন নারীরত্ন, নলও সেইরূপ পুরুষশ্রেষ্ঠ, উত্তমার সঙ্গে উত্তমের মিলন অতিশয় শুভকর হবে। দময়ন্তী উত্তর দিলেন, তুমি নলের কাছে গিয়ে তাঁকেও এই কথা ব’লো। তখন হংস নিষধরাজ্যে গিয়ে নলকে সকল কথা জানালে।

দময়ন্তী চিন্তাগ্ৰস্ত বিবর্ণ ও কৃশ হ’তে লাগলেন। সখীদের মুখে কন্যার অসুস্থতার সংবাদ শুনে বিদর্ভরাজ ভীম ভাবলেন, কন্যা যৌবনলাভ করেছে, এখন তার স্বয়ম্বর হওয়া উচিত। রাজা স্বয়ম্বরের আয়োজন করলেন, তাঁর নিমন্ত্রণে বহু রাজা বিদর্ভ দেশে সমবেত হলেন।

এই সময়ে নারদ ও পর্বত দেবর্ষিদ্বয় দেবরাজ ইন্দ্রের নিকটে গেলেন। কুশলজিজ্ঞাসার পর ইন্দ্র বললেন, যে ধর্মজ্ঞ রাজারা সমরে পরাঙ্মুখ না হয়ে জীবন ত্যাগ করেন তাঁরা অক্ষয় স্বর্গলোক লাভ করেন। সেই ক্ষত্রিয় বীরগণ কোথায়? সেই প্রিয় অতিথিগণকে আর এখানে আসতে দেখি না কেন? নারদ বললেন, দেবরাজ, তার কারণ শুনুন। — বিদর্ভরাজকন্যা দময়ন্তী তাঁর সৌন্দর্য্যে পৃথিবীর সমস্ত নারীকে অতিক্রম করেছেন, শীঘ্রই তাঁর স্বয়ম্বর হবে। সেই নারীরত্নকে পাবার আশায় সকল রাজা আর রাজপুত্র স্বয়ম্বর সভায় যাচ্ছেন। এমন সময় অগ্নি প্রভৃতি লোকপালগণ ইন্দ্রের কাছে এলেন এবং নারদের কথা শুনে হৃষ্ট হয়ে সকলে বললেন, আমরাও যাব।

ইন্দ্র অগ্নি বরুণ ও যম তাঁদের বাহন ও অনুচর সহ বিদর্ভ দেশে যাত্রা করলেন। পথে তাঁরা সাক্ষাৎ মন্মথতুল্য নলকে দেখে বিস্মিত হলেন, তাঁদের দময়ন্তীলাভের আশা দূর হ’ল। দেবগণ তাঁদের বিমান আকাশে রেখে ভূতলে নেমে নলকে বললেন, নিষধরাজ, তুমি সত্যরত, দূত হয়ে আমাদের সাহায্য কর। নল কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, করব। আপনারা কে? আমাকে কার দৌত্য করতে হবে? ইন্দ্র বললেন, আমরা অমর, দময়ন্তীর জন্য এসেছি। ‘তুমি গিয়ে তাঁকে বল যে দেবতারা তাঁকে চান, তিনি ইন্দ্র অগ্নি বরুণ ও যম এই চারজনের একজনকে বরণ করুন। নল বললেন, আমিও তাঁকে চাই, নিজেই যখন প্রার্থী তখন পরের জন্য কি ক’রে বলব? দেবগণ, আমাকে ক্ষমা করুন। দেবতারা বললেন, তুমি করব ব’লে প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, এখন তার অন্যথা করতে পার না, অতএব শীঘ্র যাও। নল বললেন, সুরক্ষিত অন্তঃপুরে আমি কি ক’রে প্রবেশ করব? ইন্দ্র বললেন, তুমি প্রবেশ করতে পারবে।

সখীগণে পরিবেষ্টিত দময়ন্তীর কাছে নল উপস্থিত হলেন। দময়ন্তী স্মিতমুখে বললেন, সর্বাঙ্গসুন্দর, তুমি কে? আমার হৃদয় হরণ করতে কেন এখানে এসেছ? নল বললেন, কল্যাণী, আমি নল, ইন্দ্র অগ্নি বরুণ ও যম এই চার দেবতার দূত হয়ে তোমার কাছে এসেছি, তাঁদের একজনকে পতিরূপে বরণ কর। দময়ন্তী বললেন, রাজা, আমি এবং আমার যা কিছু আছে সবই তোমার, তুমিই আমার প্রতি প্রণয়শীল হও। হংসদের কাছে সংবাদ পেয়ে তোমাকে পাবার জন্যই আমি স্বয়ংবরে রাজাদের আনিয়েছি। তুমি যদি আমাকে প্রত্যাখ্যান কর তবে বিষ অগ্নি জল বা রজ্জুর দ্বারা আত্মহত্যা করব। নল বললেন, দেবতারা থাকতে মানুষকে চাও কেন? আমি তাঁদের চরণধূলির তুল্যও নই, তাঁদের প্রতিই তোমার মন দেওয়া উচিত। দময়ন্তী অশ্রুপ্লাবিতনয়নে কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, দেবগণকে প্রণাম করি; মহারাজ, আমি তোমাকেই পতিরূপে বরণ করব। নল বললেন, কল্যাণী, আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে দেবগণের দূত রূপে এসেছি, এখন স্বার্থসাধন কি ক’রে করব? দময়ন্তী বললেন, আমি নির্দোষ উপায় বলছি শোন। ইন্দ্রাদি লোকপালগণের সঙ্গে তুমিও স্বয়ংবর সভায় এস, আমি তাঁদের সম্মুখেই তোমাকে বরণ করব।

নল ফিরে এসে দেবগণকে বললেন, আমি আপনাদের বার্তা দময়ন্তীকে জানিয়েছি, কিন্তু তিনি আমাকেই বরণ করতে চান। তিনি আপনাদের সকলকে এবং আমাকেও স্বয়ংবরসভায় আসতে বলেছেন।

বিদর্ভরাজ ভীম শুভদিনে শুভক্ষণে স্বয়ংবরসভা আহ্বান করলেন। নানা দেশের রাজারা সুগন্ধ মাল্য ও মণিকুণ্ডলে ভূষিত হয়ে আসনে উপবিষ্ট হলেন। দময়ন্তী সভায় এলে তাঁর দেহেই রাজাদের দৃষ্টি লগ্ন হয়ে রইল, অন্যত্র গেল না। অনন্তর রাজাদের নামকীর্ত্তন আরম্ভ হ’ল। দময়ন্তী তখন দেখলেন, তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের আকৃতি একই প্রকার, প্রত্যেককেই নল বলে মনে হয়। দময়ন্তী ভাবতে লাগলেন, এঁদের মধ্যে কে দেবতা আর কে নল তা কোন্ উপায়ে বুঝব? বৃদ্ধদের কাছে দেবতার যেসব লক্ষণ শুনেছি তা এই পাঁচজনের মধ্যে কারও দেখছি না। তখন দময়ন্তী কৃতাঞ্জলি হয়ে দেবগণের উদ্দেশে নমস্কার ক’রে বললেন, আমি হংসগণের বাক্য শুনে নিষধরাজকে পতিরূপে বরণ করেছি, আমার সেই সত্য যেন রক্ষা পায়। দেবগণ নলকে দেখিয়ে দিন, তাঁরা নিজরূপ ধারণ করুন যাতে আমি নলকে চিনতে পারি।

দময়ন্তীর করুণ প্রার্থনা শুনে এবং নলের প্রতি তাঁর পরম অনুরাগ জেনে ইন্দ্রাদি চারজন লোকপাল তাঁদের দেবচিহ্ন ধারণ করলেন। দময়ন্তী দেখলেন, তাঁদের গাত্র স্বেদশূন্য, চক্ষু অপলক, দেহ ছায়াহীন। তাঁদের মাল্য অম্লান, অঙ্গ ধূলিশূন্য, ভূমি স্পর্শ না করেই তাঁরা বসে আছেন। কেবল একজনের এইসকল দেব লক্ষণ নেই দেখে দময়ন্তী বুঝলেন তিনিই নল। তখন লজ্জমানা দময়ন্তী বসনপ্রান্ত ধারণ ক'রে নলের স্কন্ধদেশে পরম শোভন মাল্য অর্পণ করলেন। রাজারা হা হা ক'রে উঠলেন, দেবতা ও মহর্ষিগণ সাধু সাধু বললেন। নল হৃষ্টমনে দময়ন্তীকে বললেন, কল্যাণী, তুমি দেবগণের সন্নিধিতে মানুষকেই বরণ করলে, আমাকে তোমার ভর্তা ও আজ্ঞানুবর্তী বলে জেনো। সুহাসিনী, যত দিন দেহে প্রাণ থাকবে তত দিন আমি তোমারই অনুরক্ত থাকব।

দেবতারা হৃষ্ট হয়ে নলকে বর দিলেন। ইন্দ্র বললেন, যজ্ঞকালে তুমি আমাকে প্রত্যক্ষ দেখবে এবং দেহান্তে উত্তম গতি লাভ করবে। অগ্নি বললেন, তুমি যেখানে ইচ্ছা করবে সেখানেই আমার আবির্ভাব হবে এবং অভিমত তুমি প্রভাময় দিবালোক পাবে। যম বললেন, তুমি যে খাদ্য পাক করবে তাই সুস্বাদু হবে, তুমি চিরকাল ধর্মপথে থাকবে। বরুণ বললেন, তুমি যেখানে জল চাইবে সেখানেই পাবে। দেবতারা সকলে মিলে নলকে উত্তম গন্ধমাল্য এবং যুগল সন্তান লাভের বর দিলেন।

বিবাহের পর কিছুকাল বিদর্ভ দেশে থেকে নল তাঁর পত্নীর সঙ্গে স্বরাজ্যে ফিরে গেলেন। তিনি অশ্বমেধাদি বিবিধ যজ্ঞ করলেন। যথাকালে দময়ন্তী একটি পুত্র ও একটি কন্যা প্রসব করলেন, তাদের নাম ইন্দ্রসেন ও ইন্দ্রসেনা।