বনপর্ব: ১৫। নল-দময়ন্তীর বিচ্ছেদ — দময়ন্তীর পর্য্যটন
নলের রাজ্য ও সমস্ত ধন অক্ষক্রীড়ায় জিতে নিয়ে পুষ্কর হেসে বললেন, আপনার সর্বস্ব আমি জয় করেছি, কেবল দময়ন্তী অবশিষ্ট আছেন, যদি ভাল মনে করেন তবে এখন তাঁকেই পণ রাখুন। পুণ্যশ্লোক নলের মন দুঃখে বিদীর্ণ হ'ল, তিনি কিছু না বলে তাঁর সকল অলঙ্কার খুলে ফেললেন এবং বিপুল ঐশ্বর্য ত্যাগ করে একবস্ত্রে অনাবৃতদেহে রাজ্য থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। দময়ন্তীও একবস্ত্রে তাঁর সঙ্গে গেলেন।
পুষ্করের শাসনে কোনও লোক নল-দময়ন্তীর সমাদর করলে না। তাঁরা কেবল জলপান ক'রে নগরের উপকণ্ঠে ত্রিরাত্র বাস করলেন। ক্ষুধার্ত নল ঘুরতে ঘুরতে কতকগুলি পাখি দেখতে পেলেন, তাদের পালক স্বর্ণবর্ণ। নল ভাবলেন, এই পাখিগুলিই আজ আমাদের ভক্ষ্য হবে আর তাদের পক্ষই ধন হবে। তিনি তাঁর পরিধানের বস্ত্র খুলে ফেলে পাখিদের উপর চাপা দিলেন। পাখিরা বস্ত্র নিয়ে আকাশে উঠে বললে, দূর্বুদ্ধি নল, যা নিয়ে দ্যূতক্রীড়া করেছিলে আমরাই সেই পাশা। তুমি সবস্ব গেলে আমাদের প্রীতি হবে না। বিবস্ত্র নল দময়ন্তীকে বললেন, অনিন্দিতা, যাদের প্রকোপে আমি ঐশ্বর্যহীন হয়েছি, যাদের জন্য আমরা প্রাণযাত্রার উপযুক্ত খাদ্য আর নিষধবাসীর সাহায্য পাচ্ছি না তারাই পক্ষী হয়ে আমার বস্ত্র হরণ করেছে। আমি দুঃখে জ্ঞানহীন হয়েছি। আমি তোমার স্বামী, তোমার ভালর জন্য যা বলছি শোন। — এখান থেকে কতকগুলি পথ অবন্তী ও ঋক্ষবান পর্বত পার হয়ে দক্ষিণাপথে গেছে। ওই বিন্ধ্য পর্বত, ওই পয়োষ্ণী নদী, ওখানে প্রচুর ফলমূল সমন্বিত ঋষিদের আশ্রম আছে। এই বিদর্ভ দেশের পথ, এই কোশল দেশের, ওই দক্ষিণাপথের. নল কাতর হয়ে এই সব কথা বার বার দময়ন্তীকে বললেন।
দময়ন্তী বললেন, তোমার অভিপ্রায় অনুমান ক'রে আমার হৃদয় কাঁপছে, সর্বাঙ্গ অবসন্ন হচ্ছে। তোমাকে ত্যাগ ক'রে আমি কি করে অন্যত্র যাব? ভিষকরা বলেন, সকল দুঃখে ভার্যার সমান ঔষধ নেই। নল বললেন, তুমি কেন আশঙ্কা করছ, আমি নিজেকে ত্যাগ করতে পারি কিন্তু তোমাকে পারি না। দময়ন্তী বললেন, মহারাজ, তবে বিদর্ভের পথ দেখাচ্ছ কেন? যদি আমার আত্মীয়দের কাছেই আমাকে পাঠাতে চাও তবে তুমিও চল না কেন? আমার পিতা বিদর্ভরাজ তোমাকে সসম্মানে আশ্রয় দেবেন, তুমি আমাদের গৃহে সুখে থাকতে পারবে। নল বললেন, পূর্বে সেখানে সমৃদ্ধ অবস্থায় গিয়েছিলাম, এখন নিঃস্ব হয়ে কি ক'রে যাব?
নল-দময়ন্তী একই বস্ত্র পরিধান ক'রে বিচরণ করতে করতে একটি পথিকদের বিশ্রামস্থানে এলেন এবং ভূতলে শয়ন করলেন। দময়ন্তী তখনই নিদ্রিত হলেন। নল ভাবলেন, দময়ন্তী আমার জন্যই দুঃখভোগ করছেন, আমি না থাকলে ইঁনি হয়তো পিতৃগৃহে যাবেন। কলির দুষ্ট প্রভাবে নল দময়ন্তীকে ত্যাগ করাই স্থির করলেন এবং যে বস্ত্র তাঁরা দুজনেই প'রে ছিলেন তা দ্বিখণ্ড করবার জন্য ব্যগ্র হলেন। নল দেখলেন, আশ্রয়স্থানের এক প্রান্তে একটি কোষমুক্ত খড়্গ রয়েছে। সেই খড়্গ দিয়ে বস্ত্রের অর্দ্ধভাগ কেটে নিয়ে নিদ্রিতা দময়ন্তীকে পরিত্যাগ ক'রে নল দ্রুতবেগে নিষ্ক্রান্ত হলেন, কিন্তু আবার ফিরে এসে পত্নীকে দেখে বিলাপ করতে লাগলেন। এইরূপে নল আন্দোলিতহৃদয়ে বার বার ফিরে এসে অবশেষে প্রস্থান করলেন।
নিদ্রা থেকে উঠে নলকে না দেখে দময়ন্তী শোকার্ত ও ভয়ার্ত হয়ে কাঁদতে লাগলেন। তিনি পতির অন্বেষণে শ্বাপদসংকুল বনে প্রবেশ করলেন। সহসা কুম্ভীরের ন্যায় মহাকায় এক ক্ষুধার্ত অজগর তাঁকে ধরলে। দময়ন্তীর আর্তনাদ শুনে এক ব্যাধ তখনই সেখানে এল এবং তীক্ষ্ণ অস্ত্রে অজগরের মুখ চিরে দময়ন্তীকে উদ্ধার করলে। অজগরকে বধ ক’রে ব্যাধ দময়ন্তীকে প্রক্ষালনের জন্য জল এনে দিলে এবং আহারও দিলে। দময়ন্তী আহার করলে ব্যাধ বললে, মৃগশাবকাক্ষী, তুমি কে, কেন এখানে এসেছ? দময়ন্তী সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন। অর্ধবসনধারিণী দময়ন্তীর রূপ দেখে ব্যাধ কামার্ত হয়ে তাঁকে ধরতে গেল। দময়ন্তী বললেন, যদি আমি নিষধরাজ ভিন্ন অন্য পুরুষকে মনে মনেও চিন্তা না করে থাকি তবে এই ক্ষুদ্র মৃগয়াজীবী গতাসু হয়ে প’ড়ে থাক। ব্যাধ তখনই প্রাণহীন হয়ে ভূপতিত হ’ল।
দময়ন্তী ঝিল্লীনাদিত বহুবৃক্ষসমাকীর্ণ ঘোর অরণ্যে প্রবেশ করলেন, সিংহ-ব্যাঘ্র-মহিষ-ভল্লুকাদি প্রাণী এবং ম্লেচ্ছ-তস্কর প্রভৃতি জাতি সেখানে বাস করে। তিনি উন্মত্তর ন্যায় শ্বাপদ পশু ও অচেতন পর্বতকে নলের সংবাদ জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। তিন অহোরাত্র উত্তর দিকে চলে তিনি এক রমণীয় তপোবনে উপস্থিত হলেন। তপস্বীরা বললেন, সর্বাঙ্গসুন্দরী, তুমি কে? শোক ক’রো না, আশ্বস্ত হও। তুমি কি এই অরণ্যের বা পর্বতের বা নদীর দেবী? দময়ন্তী তাঁর ইতিহাস জানিয়ে বললেন, ভগবান, যদি কয়েক দিনের মধ্যে নল রাজার দেখা না পাই তবে আমি দেহত্যাগ করব। তপস্বীরা বললেন, কল্যাণী, তোমার মঙ্গল হবে, আমরা দেখছি তুমি শীঘ্রই নিষধরাজের দর্শন পাবে। তিনি সর্ব পাপ থেকে মুক্ত হয়ে সর্বরত্নসমন্বিত হয়ে নিজ রাজ্য শাসন করবেন, শত্রুদের ভয় উৎপাদন ও সুহৃদগণের শোক নাশ করবেন। এই ব’লে তপস্বিগণ অন্তর্হিত হলেন। দময়ন্তী বিস্মিত হয়ে ভাবলেন, আমি কি স্বপ্ন দেখলাম? তাপসগণ কোথায় গেলেন? তাঁদের আশ্রম, পুণ্যসলিলা নদী, ফলপুষ্পশোভিত বৃক্ষ প্রভৃতি কোথায় গেল?
নলের অন্বেষণে আবার যেতে যেতে দময়ন্তী এক নদীতীরে এসে দেখলেন, এক বৃহৎ বণিকের দল অনেক হস্তী অশ্ব রথ নিয়ে নদী পার হচ্ছে। দময়ন্তী সেই যাত্রিদলের মধ্যে প্রবেশ করলেন। তাঁর উন্মত্তের ন্যায় অর্ধবসনাবৃত কুশ মলিন মূর্তি দেখে কতগুলি লোক ভয়ে পালিয়ে গেল, কেউ অন্য লোককে ডাকতে গেল, কেউ হাসতে লাগল। একজন বললে, কল্যাণী, তুমি কি মানবী, দেবতা যক্ষী, না - Footer Note: (১) যে নারী পরগৃহে স্বাধীনভাবে থেকে শিল্পাদির দ্বারা জীবিকানির্বাহ করে।
রাক্ষসী? আমরা তোমার শরণ নিলাম, আমাদের রক্ষা কর, যাতে এই বণিক্দের দল নিরাপদে যেতে পারে তা কর। দময়ন্তী তাঁর পরিচয় দিলেন এবং নলের সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন। তখন শুচি নামক সার্থবাহ (বণিক্সঙ্ঘের নায়ক) বললেন, যশস্বিনী, নলকে আমরা দেখি নি, এই বনে আপনি ভিন্ন কোনও মানুষও দেখি নি। আমরা বাণিজ্যের জন্য চেদিরাজ সুবাহুর রাজ্যে যাচ্ছি।
নলের দেখা পাবেন এই আশায় দময়ন্তী সেই বণিক্সঙ্ঘের সঙ্গে চলতে লাগলেন। কিছু দূর গিয়ে সকলে এক বৃহৎ জলাশয়ের তীরে উপস্থিত হলেন। পরিশ্রান্ত বণিকের দল সেখানে রাত্রিযাপনের আয়োজন করলে। সকলে নিদ্রিত হ’লে অর্ধরাত্রে এক দল মদমত্ত বন্য হস্তী বণিক্সঙ্ঘের পালিত হস্তীদের মারবার জন্য সবেগে এল। সহসা আক্রান্ত হয়ে বণিকরা ভয়ে উদভ্রান্ত হয়ে পালাতে লাগল, বন্য হস্তীর দন্তাঘাতে ও পদের পেষণে অনেকে নিহত হ’ল, বহু উষ্ট্র ও অশ্বও বিনষ্ট হ’ল। হতাশাবশিষ্ট বণিকরা বলতে লাগল, আমরা বাণিজ্যদেবতা মণিভদ্রের এবং যক্ষাধিপ কুবেরের পূজা করি নি তারই এই ফল। কয়েকজন বললে, সেই উন্মত্তদর্শনা বিকৃতরূপা নারীই মায়াবলে এই বিপদ ঘটিয়েছে। নিশ্চয় সে রাক্ষসী যক্ষী বা পিশাচী, তাকে দেখলে আমরা হত্যা করব।
এই কথা শুনতে পেয়ে দময়ন্তী বেগে বনমধ্যে পলায়ন করলেন। তিনি বিলাপ ক’রে বললেন, এই নির্জন অরণ্যে যে জনসঙ্ঘে আশ্রয় পেয়েছিলাম তাও হস্তিবৃন্দ এসে বিধ্বস্ত করলে, এও আমার মন্দভাগ্যের ফল। আমি স্বয়ম্বরে ইন্দ্রাদি লোকপালগণকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম, তাঁদেরই কোপে আমার এই দুর্দ্দশা হয়েছে। হতাশাবশিষ্ট লোকদের মধ্যে কয়েকজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ছিলেন, দময়ন্তী তাঁদের সঙ্গে যেতে লাগলেন। বহুকাল পর্যটনের পর দময়ন্তী একদিন সায়াহ্নকালে চেদিরাজ সুবাহুর নগরে উপস্থিত হলেন। তাঁকে উন্মত্তার ন্যায় দেখে গ্রাম্য বালকগণ কৌতূহলের বশে তাঁর অনুসরণ করতে লাগল। দময়ন্তী রাজপ্রাসাদের নিকটে এলে রাজমাতা তাঁকে দেখতে পেয়ে এক ধাত্রীকে বললেন, ওই দুঃখিনী শরণার্থিনী নারীকে লোকে কষ্ট দিচ্ছে, তুই ওকে নিয়ে আয়।
দময়ন্তী এলে রাজমাতা বললেন, এই দশাতেও তোমাকে রূপবতী দেখছি, মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের ন্যায় তুমি কে? দময়ন্তী বললেন, আমি পতিব্রতা সদ্বংশীয়া সৈরিন্ধ্রী (১)। আমার ভর্তার গুণের সংখ্যা করা যায় না, কিন্তু দুর্দ্দৈববশে দ্যূতক্রীড়ায় পরাজিত হয়ে তিনি বনে এসেছিলেন, সেখানে আমাকে নিদ্রিত অবস্থায় ত্যাগ ক'রে চ'লে গেছেন। বিরহতাপে দিবারাত্র দগ্ধ হয়ে আমি তাঁর অন্বেষণ করছি। রাজমাতা বললেন, কল্যাণী, তোমার উপর আমার স্নেহ হয়েছে, আমার কাছেই তুমি থাক। আমার লোকেরা তোমার পতির অন্বেষণ করবে, হয়তো তিনি ঘুরতে ঘুরতে নিজেই এখানে এসে পড়বেন।
দময়ন্তী বললেন, বীরজননী, আমি আপনার কাছে থাকব, কিন্তু কারও উচ্ছিষ্ট খাব না বা পা ধুইয়ে দেব না। পতির অন্বেষণের জন্য আমি ব্রাহ্মণদের সঙ্গে দেখা করব, কিন্তু অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলব না। যদি কোনও পুরুষ আমাকে প্রার্থনা করে তবে আপনি তাকে দণ্ড দেবেন। রাজমাতা সানন্দে সম্মত হলেন, এবং নিজ দুহিতা সুনন্দাকে ডেকে বললেন, এই দেবরূপিণী সৈরিন্ধ্রী তোমার সমবয়স্কা, ইনি তোমার সখী হবেন। সুনন্দা হৃষ্টচিত্তে দময়ন্তীকে নিজগৃহে নিয়ে গেলেন।