বনপর্ব: ১৬। কর্কোটক নাগ — নলের রূপান্তর
দময়ন্তীকে ত্যাগ ক'রে নল গহন বনে গিয়ে দেখলেন, দাবাগ্নি জ্বলছে এবং কেউ তাঁকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকছে, পুণ্যশ্লোক নল, শীঘ্র আসুন। নল অগ্নির নিকটে এলে এক কুণ্ডলীকৃত নাগরাজ কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, রাজা, আমি কর্কোটক নাগ। মহর্ষি নারদকে প্রতারিত করেছিলাম সেজন্য তিনি শাপ দিয়েছেন — এই স্থানে স্থাবরের ন্যায় প'ড়ে থাক, নল যখন তোমাকে অন্যত্র নিয়ে যাবেন তখন শাপমুক্ত হবে। আপনি আমাকে রক্ষা করুন, আমি সখা হয়ে আপনাকে সৎপরামর্শ দেব। এই ব'লে নাগেন্দ্র কর্কোটক অঙ্গুষ্ঠ-প্রমাণ হলেন, নল তাঁকে নিয়ে দাবাগ্নিশূন্য স্থানে চললেন।
যেতে যেতে কর্কোটক বললেন, নিষধরাজ, আপনি পদক্ষেপ গণনা ক'রে চলুন, আমি আপনার মহোপকার করব। নল দশম পদক্ষেপ করবামাত্র কর্কোটক তাঁকে দংশন করলেন, তৎক্ষণাৎ নলের রূপ বিকৃত হয়ে গেল। কর্কোটক নিজ মুর্ত্তি ধারণ ক'রে বললেন, মহারাজ, লোকে আপনাকে যাতে চিনতে না পারে সেজন্য আপনার প্রকৃত রূপ অন্তর্হিত ক'রে দিলাম। যে কলি কর্তৃক আবিষ্ট হয়ে আপনি প্রতারিত ও মহাদুঃখে পতিত হয়েছেন সে এখন আমার বিষে আক্রান্ত হয়ে আপনার দেহে কষ্টে বাস করবে। আপনি অযোধ্যায় ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা ঋতুপর্ণের কাছে গিয়ে বলুন যে আপনি বাহুক নামক সারথি। তিনি আপনার নিকট অশ্বহৃদয় শিখে নিয়ে আপনাকে অক্ষহৃদয়(১) দান করবেন। ঋতুপর্ণ আপনার সখা হবেন, আপনিও দ্যূতক্রীড়ায় পারদর্শী হয়ে শ্রেয়োলাভ করবেন এবং পত্নী পুত্রকন্যা ও রাজ্য ফিরে পাবেন। যখন পূর্বরূপ ধারণের ইচ্ছা হবে তখন আমাকে স্মরণ করে এই বসন পরিধান করবেন। এই বলে কর্কোটক নলকে দিব্য বস্ত্রযুগল দান ক’রে অন্তর্হিত হলেন।
দশ দিন পরে নল ঋতুপর্ণ রাজার কাছে এসে বললেন, আমার নাম বাহুক, অশ্বচালনায় আমার তুল্য নিপুণ লোক পৃথিবীতে নেই। সংকটকালে এবং কোন্ও কার্য্যে নৈপুণ্যের প্রয়োজন হ’লে আমি মন্ত্রণা দিতে পারব, রন্ধনবিদ্যাও আমি বিশেষরূপে জানি। সর্বপ্রকার শিল্প ও দুরূহ কার্য্য সম্পাদনেও আমি যত্নশীল হব। ঋতুপর্ণ বললেন, বাহুক, তুমি আমার কাছে থাক, তোমার ভাল হবে। দশ সহস্র মুদ্রা বেতনে তুমি আমার অশ্বাধ্যক্ষ নিযুক্ত হলে বার্ষ্ণেয়(২) ও জীবল(৩) তোমার সেবা করবে।
ঋতুপর্ণের আশ্রয়ে নল সসম্মানে বাস করতে লাগলেন। দময়ন্তীকে স্মরণ করে তিনি প্রত্যহ সায়ংকালে এই শ্লোক বলতেন — > ক্ব নু সা ক্ষুধপিপাসার্তা শ্রান্তা শেতে তপস্বিনী। > স্মরন্তী তস্য মন্দস্য কং বা সাহদ্যপতিষ্ঠতি।।
— সেই ক্ষুধপিপাসার্তা শ্রান্তা দুঃখিনী আজ কোথায় শুয়ে আছে? এই হতভাগ্যকে স্মরণ করে সে আজ কার আশ্রয়ে বাস করছে?
একদিন জীবল বললে, বাহুক, কোন্ নারীর জন্য তুমি নিত্য এরূপ বিলাপ কর? নল বললেন, কোনও এক মন্দবুদ্ধি পুরুষ ঘটনাক্রমে তার অত্যন্ত আদরণীয়া পত্নীর সহিত বিচ্ছেদের ফলে শোকে দগ্ধ হয়ে ভ্রমণ করছে। নিশাকালে তার প্রিয়াকে স্মরণ করে সে এই শ্লোক গান করে। সেই পতিপরিত্যক্তা বালা ক্ষুধপিপাসায় কাতর হয়ে একাকী শ্বাপদসংকুল দারুণ বনে বিচরণ করছে, হায়, তার জীবনধারণ দুষ্কর।