বনপর্ব: ২১। ইল্বল-বাতাপি — অগস্ত্য ও লোপামুদ্রা — ভৃগুতীর্থ

পাণ্ডবগণ নৈমিষারণ্য প্রয়াগ প্রভৃতি তীর্থ দর্শন করে অগস্ত্যের আশ্রম মণিমতী পুরীতে এলেন। লোমশ বললেন, পুরাকালে এখানে ইল্বল নামে এক দৈত্য বাস করত, তার কনিষ্ঠ ভ্রাতার নাম বাতাপি। একদিন ইল্বল এক তপস্বী ব্রাহ্মণকে বললে, আমাকে একটি ইন্দ্রতুল্য পুত্র দিন। ব্রাহ্মণ তাঁর প্রার্থনা পূর্ণ করলেন না। ইল্বল অতিশয় ক্রুদ্ধ হ’ল এবং মায়াবলে বাতাপিকে ছাগ বা মেষে রূপান্তরিত ক’রে তার মাংস রেঁধে ব্রাহ্মণভোজন করাতে লাগল। ভোজনের পর ইল্বল তার ভ্রাতাকে উচ্চস্বরে ডাকত, তখন ব্রাহ্মণের পার্শ্ব ভেদ ক’রে বাতাপি হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসত। দুরাত্মা ইল্বল এইরূপে বহু ব্রাহ্মণ হত্যা করলে।

এই সময়ে অগস্ত্য মুনি একদিন দেখলেন, একটি গর্তের মধ্যে তাঁর পিতৃপুরুষগণ অধোমুখে ঝুলছেন। অগস্ত্যের প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা বললেন, বংশলোপের সম্ভাবনায় আমরা এই অবস্থায় আছি; যদি তুমি সৎপুত্রের জন্ম দিতে পার তবে আমরা নরক থেকে মুক্ত হব, তুমিও সদ্গতি লাভ করবে। অগস্ত্য বললেন, পিতৃগণ, নিশ্চিন্ত হ’ন, আমি আপনাদের অভিলাষ পূর্ণ করব।

অগস্ত্য নিজের যোগ্য স্ত্রী খুঁজে পেলেন না। তখন তিনি সর্ব প্রাণীর শ্রেষ্ঠ অঙ্গের সমবায়ে এক অত্যুত্তমা স্ত্রী কল্পনা করলেন। সেই সময়ে বিদর্ভ দেশের রাজা সন্তানের জন্য তপস্যা করছিলেন, তাঁর মহিষীর গর্ভ থেকে অগস্ত্যের সেই সংকল্পিত ভার্যা ভূমিষ্ঠ হলেন। সৌদামিনীর ন্যায় সুন্দরী সেই কন্যার নাম রাখা হ’ল লোপামুদ্রা। লোপামুদ্রা বিবাহযোগ্যা হ’লে অগস্ত্য বিদর্ভরাজকে বললেন, আপনার কন্যা আমাকে দিন। অগস্ত্যকে কন্যাদান করতে রাজার ইচ্ছা হ’ল না, শাপের ভয়ে প্রত্যাখ্যান করতেও তিনি পারলেন না। মহিষীও নিজের মত বললেন না। তখন লোপামুদ্রা বললেন, আমার জন্য দুঃখ করবেন না, অগস্ত্যের হাতে আমাকে দিন। রাজা যথাবিধি কন্যা সম্প্রদান করলেন।

বিবাহের পর অগস্ত্য তাঁর পত্নীকে বললেন, তোমার মহার্ঘ বসন ও আভরণ ত্যাগ কর। লোপামুদ্রা চীর বল্কল ও মৃগচর্ম ধারণ ক’রে পতির ন্যায় ব্রতচারিণী হলেন। অনেক দিন গঙ্গাদ্বারে কঠোর তপস্যার পর একদিন অগস্ত্য পত্নীর নিকট সহবাস প্রার্থনা করলেন। লোপামুদ্রা কৃতাঞ্জলি হয়ে লজ্জিতভাবে বললেন, পিতার প্রাসাদে আমার যেমন শয্যা ছিল সেইরূপ শয্যায় আমাদের মিলন হ’ক। আপনি মাল্য ও ভূষণ ধারণ করুন, আমিও দিব্য আভরণে ভূষিত হই। আমি চীর আর কাষায় বস্ত্র প’রে আপনার কাছে যাব না, এই পরিচ্ছদ অপবিত্র করা উচিত নয়। অগস্ত্য বললেন, কল্যাণী, তোমার পিতার যে ধন আছে তা আমার নেই। আমার তপস্যার যাতে ক্ষয় না হয় এমন উপায়ে আমি ধন আহরণ করতে যাচ্ছি।

শ্রুতর্বা রাজার কাছে এসে অগস্ত্য বললেন, আমি ধনার্থী, অন্যের ক্ষতি না ক’রে আমাকে যথাশক্তি ধন দিন। রাজা বললেন, আমার যত আয় তত ব্যয়। এই রাজার কাছে ধন নিলে অপরের কষ্ট হবে এই বুঝে অগস্ত্য শ্রুতর্বাকে সঙ্গে নিয়ে একে একে ব্রধ্নশ্ব ও ত্রসদস্যু রাজার কাছে গেলেন। তাঁরা জানালেন যে তাঁদেরও আয়-ব্যয় সমান, উদ্বৃত্ত কিছু থাকে না। তার পর রাজারা পরামর্শ ক’রে বললেন, ইল্বল দানব সর্বাপেক্ষা ধনী, চলুন আমরা তার কাছে যাই।

অগস্ত্য ও তাঁর সঙ্গী তিন রাজাকে ইল্বল সসম্মানে গ্রহণ করলে। রাজারা ব্যাকুল হয়ে দেখলেন, বাতাপি মেষ হয়ে গেল, ইল্বল তাকে কেটে অতিথি-সেবার জন্য রন্ধন করলে। অগস্ত্য বললেন, আপনারা বিষণ্ণ হবেন না, আমিই এই অসুরকে খাব। তিনি প্রধান আসনে উপবিষ্ট হ’লে ইল্বল তাঁকে সহাস্যে মাংস পরিবেশন করলে। অগস্ত্য সমস্ত মাংস খেয়ে ফেললে ইল্বল তার ভ্রাতাকে ডাকতে লাগল। তখন মহামেঘের ন্যায় গর্জন ক’রে মহাত্মা অগস্ত্যের অধোদেশ থেকে বায়ু নির্গত হ’ল। ইল্বল বার বার বললে, বাতাপি, নিষ্ক্রান্ত হও। অগস্ত্য হেসে বললেন, কি করে নিষ্ক্রান্ত হবে, আমি তাকে জীর্ণ করে ফেলেছি।

ইল্বল বিষাদগ্রস্ত হয়ে কৃতাঞ্জলিপুটে বললে, আপনারা কি চান বলুন।

অগস্ত্য বললেন, আমরা জানি যে তুমি মহাধনী। অন্যের ক্ষতি না ক'রে আমাদের যথাসাধ্য ধন দাও। ইল্বল বললে, আমি যা যা দান করতে চাই তা যদি বলতে পারেন তবেই দেব। অগস্ত্য বললেন, তুমি এই রাজাদের প্রত্যেককে দশ হাজার গরু আর দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা এবং আমাকে তার দ্বিগুণ দিতে চাও, তা ছাড়া একটি হিরণ্ময় রথ ও দুই অশ্বও আমাকে দিতে ইচ্ছা করেছ। ইল্বল দুঃখিতমনে এই সকল ধন এবং তারও অধিক দান করলে। তখন সমস্ত ধন নিয়ে অগস্ত্য তাঁর আশ্রমে এলেন, রাজারাও বিদায় নিয়ে চ'লে গেলেন।

লোপামুদ্রাকে তাঁর অভীষ্ট শয্যা ও বসনভূষণাদি দিয়ে অগস্ত্য বললেন, তুমি কি চাও — সহস্র পুত্র, শত পুত্র, দশ পুত্র, না সহস্র পুত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এক পুত্র? লোপামুদ্রা এক পুত্র চাইলেন। তিনি গর্ভবর্তী হয়ে সাত মাস পরে দৃঢ়স্যু নামে পুত্র প্রসব করলেন। এই পুত্র মহাকার্য মহাতপা এবং বেদাদি শাস্ত্রে অভিজ্ঞ হয়েছিলেন। এঁ র অন্য নাম ইধ্মবাহ।

উপাখ্যান শেষ ক'রে লোমশ বললেন, যুধিষ্ঠির, অগস্ত্য এইরূপে প্রহ্লাদ-বংশজাত বাতাপিকে বিনষ্ট করেছিলেন। এই তাঁর আশ্রম। এই পুণ্যসলিলা ভাগীরথী, পতাকার ন্যায় বায়ুতে আন্দোলিত এবং পর্বতশৃঙ্গে প্রতিহত হয়ে শিলাতলে নাগিনীর ন্যায় নিপতিত হচ্ছেন। তোমরা এই নদীতে ইচ্ছানুসারে অবগাহন কর।

তার পর পাণ্ডবগণ ভৃগু তীর্থে এলে লোমশ বললেন, পুরাকালে রামরূপে বিষ্ণু ভার্গব পরশুরামের তেজোহরণ করেছিলেন। পরশুরাম ভীত ও লজ্জিত হয়ে মহেন্দ্র পর্বতে গিয়ে বাস করতে লাগলেন। এক বৎসর পরে পিতৃগণ তাঁকে নিস্তেজ গর্বহীন ও দুঃখিত দেখে বললেন, পুত্র, বিষ্ণুর নিকটে তোমার দর্পপ্রকাশ উচিত হয় নি। তুমি দীপ্তোদ তীর্থে যাও, সেখানে সত্যযুগে তোমার প্রপিতামহ ভৃগু তপস্যা করেছিলেন। সেই তীর্থে পবিত্র বধূসর নদীতে স্নান করলে তোমার পূর্বের তেজ ফিরে পাবে। পিতৃগণের উপদেশ অনুসারে পরশুরাম এই ভৃগু তীর্থে স্নান ক'রে তাঁর পূর্বতেজ লাভ করেছিলেন।