বনপর্ব: ২০। যুধিষ্ঠিরাদির তীর্থযাত্রা

অর্জুনের বিরহে বিষণ্ণ হয়ে পাণ্ডবগণ কাম্যকবন ত্যাগ ক'রে অন্যত্র যাবার ইচ্ছা করলেন। একদিন দেবর্ষি নারদ এসে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, ধার্মিক-শ্রেষ্ঠ, তোমার কি প্রয়োজন বল। যুধিষ্ঠির প্রণাম ক'রে বললেন, আপনি প্রসন্ন থাকায় আমার সকল প্রয়োজন সিদ্ধ হয়েছে মনে করি। তীর্থপর্যটনে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করলে কি ফললাভ হয় তাই আপনি বলুন।

বহু শত তীর্থের(১) কথা সবিস্তারে বিবৃত ক'রে নারদ বললেন, যে লোক যথারীতি তীর্থ পরিভ্রমণ করে সে শত অশ্বমেধ যজ্ঞেরও অধিক ফল পায়। এখানকার ঋষিগণ তোমার প্রতীক্ষা করছেন, লোমশ মুনিও আসছেন, তুমি এঁদের সঙ্গে তীর্থ পর্যটন কর। নারদ চলে গেলে পুরোহিত ধৌম্যও বহু তীর্থের বর্ণনা করলেন। তার পর লোমশ মুনি এসে যুধিষ্ঠিরকে বললেন, বৎস, আমি একটি অতিশয় প্রিয় সংবাদ বলব, তোমরা শোন। আমি ইন্দ্রলোক থেকে আসছি, অর্জুন মহাদেবের নিকট ব্রহ্মশির নামক অস্ত্র লাভ করেছেন, যম কুবের বরুণ ইন্দ্রও তাঁকে বিবিধ দিব্যাস্ত্র দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাবসুর পুত্র চিত্রসেনের নিকট নৃত্য গীত বাদ্য ও সামগান যথাবিধি শিখেছেন। দেবরাজ ইন্দ্র তোমাকে এই কথা বলতে বলেছেন।— অর্জুনের অস্ত্রশিক্ষা শেষ হয়েছে, তিনি একটি মহৎ দেবকার্য সম্পাদন ক'রে শীঘ্র তোমাদের কাছে ফিরে যাবেন। আমি জানি যে সূর্যপুত্র কর্ণ সত্যপ্রতিজ্ঞ, মহোৎসাহী, মহাবল, মহাধনুর্ধর; কিন্তু তিনি এখন অর্জুনের ষোড়শাংশের একাংশের তুল্যও নন। কর্ণের যে সহজাত কবচকে তোমরা ভয় কর তাও আমি হরণ করব। তোমার যে তীর্থযাত্রার অভিলাষ হয়েছে তার সম্বন্ধে এই ব্রহ্মর্ষি লোমশই তোমাকে উপদেশ দেবেন।

(১) এই প্রসঙ্গে দ্বারবতীর পরে পিণ্ডারক তীর্থের বর্ণনা আছে— এখনও এই তীর্থে পদ্মচিহ্নিত ও ত্রিশূলাঙ্কিত বহু মুদ্রা (seal) পাওয়া যায়। বোধ হয় এইসকল মুদ্রা মহেঞ্জোদাড়োতে প্রাপ্ত মুদ্রার অনুরূপ।

এই বার্তা জানিয়ে লোমশ বললেন, ইন্দ্র আর অর্জুনের অনুরোধে আমি তোমার সঙ্গে তীর্থভ্রমণ করব এবং সকল ভয় থেকে তোমাকে রক্ষা করব। যুধিষ্ঠির, তুমি লঘু (২) হও, লঘু হ'লে স্বচ্ছন্দে ভ্রমণ করতে পারবে।

(২) অর্থাৎ বেশী লোকজন জিনিসপত্র সঙ্গে নিও না।

উপস্থিত সকল লোককে যুধিষ্ঠির বললেন, যে ব্রাহ্মণ ও যতিগণ ভিক্ষাভোজী, যাঁরা ক্ষুধা তৃষ্ণা পথশ্রম আর শীতের কষ্ট সইতে পারেন না, তাঁরা নিবৃত্ত হন। যাঁরা মিষ্টভোজী, বিবিধ পক্কান্ন লেহ্য পেয় মাংস প্রভৃতি খেতে চান, যাঁরা পাচকের পিছনে পিছনে থাকেন, তাঁরাও আমার সঙ্গে যাবেন না। যাঁদের জীবিকার ব্যবস্থা ক'রে দিয়েছি তাঁরাও নিবৃত্ত হন। যেসকল পুরবাসী রাজভক্তির বশে আমার সঙ্গে এসেছেন, তাঁরা মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কাছে যান, তিনিই সকলকে উপযুক্ত বৃত্তি দেবেন। যদি তিনি না দেন তবে আমার প্রীতির নিমিত্ত পাঞ্চালরাজ দেবেন। তখন বহু পুরবাসী দুঃখিতমনে হস্তিনাপুরে চলে গেলেন। ধৃতরাষ্ট্রও তাঁদের তুষ্ট করলেন।

কাম্যকবনবাসী ব্রাহ্মণগণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, আমাদেরও তীর্থভ্রমণে নিয়ে চলুন, আপনাদের সঙ্গে না হলে আমরা যেতে পারব না। লোমশ ও ধৌম্যের মত নিয়ে যুধিষ্ঠির ব্রাহ্মণদের প্রস্তাবে সম্মত হলেন। তার পর ব্যাস পর্বত ও নারদ ঋষি এসে স্বস্ত্যয়ন করলেন। তাঁদের প্রণাম ক’রে পাণ্ডবগণ ও দ্রৌপদী অগ্রহায়ণ-পূর্ণিমার শেষে পুষ্যা-নক্ষত্রযোগে ব্রাহ্মণদের সঙ্গে নিষ্ক্রান্ত হলেন। পাণ্ডবগণ চীর অজিন ও জটা ধারণ ক’রে এবং অভেদ্য কবচ ও অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পূর্বদিকে যাত্রা করলেন। ইন্দ্রসেন প্রভৃতি ভৃত্যগণ, চতুর্দ্দশাধিক রথ পাচকগণ ও পরিচারকগণ তাঁদের সঙ্গে গেল।