বনপর্ব: ২৫। পরশুরামের ইতিহাস
পাণ্ডবগণ কৌশিকী নদীর তটদেশ থেকে যাত্রা করে গঙ্গাসাগরসংগম, কলিঙ্গদেশস্থ বৈতরণী নদী প্রভৃতি তীর্থ দেখে মহেন্দ্র পর্বতে এলেন। যুধিষ্ঠির পরশুরামের অনুচর অকৃতব্রণকে বললেন, ভগবান পরশুরাম কখন তাপসদের দর্শন দেন? আমি তাঁকে দেখতে ইচ্ছা করি। অকৃতব্রণ বললেন, আপনার আগমন তিনি জানেন, শীঘ্রই তাঁর দেখা পাবেন। চতুর্দশী ও অষ্টমী তিথিতে তিনি দেখা দেন, এই রাত্রি অতীত হ'লেই চতুর্দশী পড়বে। তার পর যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে অকৃতব্রণ পরশুরামের এই ইতিহাস বললেন। —
হৈহয়রাজ কার্তবীর্যের সহস্র বাহু ছিল, মহর্ষি দত্তাত্রেয়র বরে তিনি স্বর্ণময় বিমান এবং পৃথিবীর সকল প্রাণীর উপর আধিপত্য লাভ করেছিলেন। তাঁর উপদ্রবে পীড়িত হয়ে দেবগণ ও ঋষিগণ বিষ্ণুকে বললেন, আপনি কার্তবীর্যকে বধ করে প্রাণীদের রক্ষা করুন। বিষ্ণু সম্মত হয়ে তাঁর স্বকীয় আশ্রম বদরিকায় গেলেন। এই সময়ে খ্যাতনামা মহাবল গাধি কান্যকুব্জে রাজত্ব করতেন, তাঁর অপ্সরার ন্যায় রূপবতী একটি কন্যা ছিল। ভৃগুপুত্র ঋচীক সেই কন্যাকে চাইলে গাধি বললেন, কৌলিক রীতি রক্ষা করা আমার কর্তব্য, আপনি যদি শুল্কস্বরূপ আমাকে এক সহস্র দ্রুতগামী অশ্ব দেন যাদের কর্ণের এক দিক শ্যামবর্ণ এবং দেহ পাণ্ডুবর্ণ, তবে কন্যা দান করতে পারি। ঋচীক বরুণের নিকট ওইরূপ সহস্র অশ্ব চেয়ে নিয়ে গাধিকে দিলেন এবং তাঁর কন্যা সত্যবতীকে বিবাহ করলেন।
একদিন সপত্নীক মহর্ষি ভৃগু তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূকে দেখতে এলেন। ভৃগু হৃষ্ট হয়ে বধূকে বললেন, সৌভাগ্যবতী, তুমি বর চাও। সত্যবতী নিজের এবং তাঁর মাতার জন্য পুত্র চাইলেন। ভৃগু বললেন, ঋতুস্নানের পর তোমার মাতা অশ্বত্থ বৃক্ষকে আলিঙ্গন করবেন, তুমি উডুম্বর বৃক্ষকে করবে, এবং দুজনে এই দুই চরু ভক্ষণ করবে। সত্যবতী ও তাঁর মাতা (গাধির মহিষী) বৃক্ষ আলিঙ্গন ও চরু ভক্ষণে বিপর্যয় করলেন। ভৃগু তা দিব্যজ্ঞানে জানতে পেরে সত্যবতীকে বললেন, তোমরা বিপরীত কার্য করেছ, তোমার মাতাই তোমাকে বঞ্চনা করেছেন। তোমার পুত্র ব্রাহ্মণ হলেও বৃত্তিতে ক্ষত্রিয় হবে, তোমার মাতার পুত্র ক্ষত্রিয় হলেও আচারে ব্রাহ্মণ হবে। সত্যবতী বারবার অনুনয় করলেন, আমার পুত্র যেন ক্ষত্রিয়াচারী না হয়, বরং আমার পৌত্র সেইরূপ হোক। ভৃগু বললেন, তাই হবে। জমদগ্নি নামে খ্যাত এই পুত্র কালক্রমে সমগ্র ধনুর্বেদ ও অস্ত্রপ্রয়োগবিধি আয়ত্ত করলেন। তাঁর সঙ্গে রাজা প্রসেনজিতের কন্যা রেণুকার বিবাহ হল। রেণুকার পাঁচ পুত্র, তাঁদের মধ্যে কনিষ্ঠ রাম (বিষ্ণুর অবতার পরশুরাম) গুণে শ্রেষ্ঠ।
একদিন রেণুকা স্নান করতে গিয়ে দেখলেন, মার্তিকাবত দেশের রাজা চিত্ররথ তাঁর পত্নীদের সঙ্গে জলক্রীড়া করছেন। চিত্তবিকারের জন্য বিহ্বল ও ত্রস্ত হয়ে রেণুকা আর্দ্রদেহে আশ্রমে ফিরে এলেন। পত্নীকে অধীর ও রাজ্যশ্রী-বর্জিত দেখে জমদগ্নি ধিক্কার দিয়ে ভর্ৎসনা করলেন এবং তাঁকে হত্যা করবার জন্য পুত্রদের একে একে আজ্ঞা দিলেন। মাতৃস্নেহে অভিভূত হয়ে চার পুত্র নীরবে রইলেন। জমদগ্নি ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁদের অভিশাপ দিলেন, তাঁরা পশুপক্ষীর ন্যায় জড়বুদ্ধি হয়ে গেলেন। তারপর পরশুরাম আশ্রমে এলে জমদগ্নি তাঁকে বললেন, পুত্র, দুশ্চরিত্রা মাতাকে বধ কর, ব্যথিত হয়ো না। পরশুরাম কুঠার দিয়ে তাঁর মাতার শিরচ্ছেদ করলেন। জমদগ্নি প্রসন্ন হয়ে বললেন, বৎস, আমার আজ্ঞায় তুমি দুষ্কর কর্ম করেছ, তোমার বাঞ্ছিত বর চাও। পরশুরাম এই বর চাইলেন— মাতা জীবিত হয়ে উঠুন, তাঁর হত্যার স্মৃতি যেন না থাকে, আমার যেন পাপ-স্পর্শ না হয়, আমার ভ্রাতারা যেন তাঁদের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পান, আমি যেন যুদ্ধে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হই, এবং দীর্ঘায়ু লাভ করি। জমদগ্নি এই সকল বর দিলেন।
একদিন জমদগ্নির পুত্রগণ অন্যত্র গেলে রাজা কার্তবীর্য আশ্রমে এসে সবলে হোমধেনুর বৎস হরণ করলেন এবং আশ্রমের বৃক্ষসকল ভগ্ন করলেন। পরশুরাম আশ্রমে ফিরে এসে পিতার নিকট সমস্ত শুনে কার্তবীর্যের প্রতি ধাবিত হলেন এবং তীক্ষ্ণ অস্ত্রের আঘাতে তাঁর সহস্র বাহু ছেদন ক'রে তাঁকে বধ করলেন। তখন কার্তবীর্যের পুত্রগণ আশ্রমে এসে জমদগ্নিকে আক্রমণ করলেন। তিনি তপোনিষ্ঠ ছিলেন সেজন্য মহাবলশালী হয়েও যুদ্ধ করলেন না, অনাথের ন্যায় 'রাম রাম' ব'লে পুত্রকে ডাকতে লাগলেন। কার্তবীর্যের পুত্রগণ তাঁকে বধ করে চ'লে গেলেন।
পরশুরাম আশ্রমে ফিরে এসে পিতাকে নিহত দেখে বহু বিলাপ করলেন এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন ক'রে একাকীই কার্তবীর্যের পুত্র ও অনুচরগণকে যুদ্ধে বিনষ্ট করলেন। তিনি একুশ বার পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করে সমস্তপঞ্চক প্রদেশে পাঁচটি রুধিরময় হ্রদ সৃষ্টি ক'রে পিতৃগণের তর্পণ করলেন। অবশেষে পিতামহ ঋচীকের অনুরোধে তিনি ক্ষাত্ৰহত্যা থেকে নিবৃত্ত হলেন এবং এক মহাযজ্ঞ সম্পন্ন করে মহাত্মা কশ্যপকে একটি প্রকাণ্ড স্বর্ণময় বেদী দান করলেন। কশ্যপের অনুমতিক্রমে ব্রাহ্মণগণ সেই বেদী খণ্ড খণ্ড করে ভাগ ক'রে নিলেন, সেজন্য তাঁদের নাম খাণ্ডবায়ন হ'ল। তার পর ক্ষত্রিয়ান্তক পরশুরাম সমগ্র পৃথিবী কশ্যপকে দান করলেন। তদবধি তিনি এই মহেন্দ্র পর্বতে বাস করছেন।
চতুর্দশী তিথিতে মহাত্মা পরশুরাম পাণ্ডব ও ব্রাহ্মণদের দর্শন দিলেন। তাঁর অনুরোধে যুধিষ্ঠির এক রাত্রি মহেন্দ্র পর্বতে বাস ক'রে পরদিন দক্ষিণ দিকে যাত্রা করলেন।