বনপর্ব: ২৬। প্রভাস — চ্যবন ও সুকন্যা — অশ্বিনীকুমারদ্বয়

পাণ্ডবগণ গোদাবরী নদী, দ্রবিড় দেশ, অগস্ত্য তীর্থ, সূর্পারক তীর্থ প্রভৃতি দর্শন ক'রে সুবিখ্যাত প্রভাসতীর্থে উপস্থিত হলেন। তাঁদের আগমনের সংবাদ পেয়ে বলরাম ও কৃষ্ণ সসৈন্যে যুধিষ্ঠিরের কাছে এলেন। পাণ্ডবগণ ভূমিতে শয়ন করেন, তাঁদের গাত্ৰ মলিন, এবং সুকুমারী দ্রৌপদীও কষ্টভোগ করছেন দেখে সকলে অতিশয় দুঃখিত হলেন। বলরাম কৃষ্ণ প্রদ্যুম্ন শাম্ব সাত্যকি প্রভৃতি বৃষ্ণিবংশীয় বীরগণ যুধিষ্ঠির কর্তৃক যথাবিধি সম্মানিত হয়ে তাঁকে বেষ্টন ক'রে উপবেশন করলেন।

গোদুগ্ধ কুন্দপুষ্প ইন্দু মৃণাল ও রজতের ন্যায় শুভ্রবর্ণ বলরাম বললেন, ধর্মচরণ করলেই মঙ্গল হয় না, অধর্ম করলেই অমঙ্গল হয় না। মহাত্মা যুধিষ্ঠির জটা ও চীর ধারণ ক'রে বনবাসী হয়ে ক্লেশ পাচ্ছেন, আর দুর্যোধন পৃথিবী শাসন করছেন, এই দেখে অল্পবুদ্ধি লোকে মনে করবে ধর্মের চেয়ে অধর্মের আচরণই ভাল। ভীষ্ম কৃপ দ্রোণ ও ধৃতরাষ্ট্রকে ধিক, পাণ্ডবদের বনে পাঠিয়ে তাঁরা কি সুখ পাচ্ছেন? ধর্মপথে যুধিষ্ঠিরের নির্বাসন আর দুর্যোধনের বৃদ্ধি দেখে পৃথিবী বিদীর্ণ হচ্ছেন না কেন?

সাত্যকি বললেন, এখন বিলাপের সময় নয়, যুধিষ্ঠির কিছু না বললেও আমাদের যা কর্তব্য তা করব। আমরা ত্রিলোক জয় করতে পারি, বৃষ্ণি ভোজ অন্ধক প্রভৃতি যদুবংশের বীরগণ আজই সসৈন্যে যাত্রা ক'রে দুর্যোধনকে যমালয়ে পাঠান। ধর্মাত্মা যুধিষ্ঠির তাঁর প্রতিজ্ঞা পালন করুন, তাঁর বনবাসের কাল সমাপ্ত না হওয়া পর্য্যন্ত অভিমন্যু রাজ্য শাসন করবে।

কৃষ্ণ বললেন, সাত্যকি, আমরা তোমার মতে চলতাম, কিন্তু যা নিজ ভুজবলে বিজিত হয় নি এমন রাজ্য যুধিষ্ঠির চান না। ইনি, এঁর ভ্রাতারা, এবং দ্রুপদকন্যা, কেউ স্বধর্ম ত্যাগ করবেন না।

যুধিষ্ঠির বললেন, সত্যই রক্ষণীয়, রাজ্য নয়। একমাত্র কৃষ্ণই আমাকে যথার্থভাবে জানেন, আমিও তাঁকে জানি। সাত্যকি, পুরুষশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণ যখন মনে করবেন যে বলপ্রকাশের সময় এসেছে তখন তোমরা দুর্যোধনকে জয় করো।

যাদবগণ বিদায় নিয়ে চ'লে গেলেন। যুধিষ্ঠিরাদি পুনর্বার যাত্রা ক'রে পুণ্যতোয়া পয়োষ্ণী নদী অতিক্রম ক'রে নর্মদার নিকটস্থ বৈদূর্য পর্বতে উপস্থিত হলেন। লোমশ এই আখ্যান বললেন।—মহর্ষি ভৃগুর পুত্র চ্যবন এই স্থানে দীর্ঘকাল তপস্যা করেছিলেন, তাঁর দেহ বল্মীক পিপীলিকা ও লতায় আবৃত হয়ে যায়। একদিন রাজা শর্য্যাতি এখানে বিহার করতে এলেন, তাঁর চার হাজার স্ত্রী এবং সুকন্যা নামে এক রূপবতী কন্যা ছিল। সুকন্যাকে সেই মনোরম স্থানে বিচরণ করতে দেখে চ্যবন আনন্দিত হয়ে ক্ষীণকন্ঠে তাঁকে ডাকলেন। সুকন্যা শুনতে পেলেন না, তিনি বল্মীকস্তূপের ভিতরে চ্যবনের দুই চক্ষু দেখতে পেয়ে বললেন, একি! তার পর কৌতূহল ও মোহের বশে কাঁটা দিয়ে বিদ্ধ করলেন। চ্যবন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে শর্যাতির সৈন্যদের মলমূত্র রুদ্ধ করলেন। সৈন্যদের কষ্ট দেখে রাজা সকলকে জিজ্ঞাসা করলেন, বৃদ্ধ ক্রোধী চ্যবন ঋষি এখানে তপস্যা করেন, কেউ তাঁর অপকার করে নি তো? সুকন্যা বললেন, বল্মীকস্তূপের ভিতরে খদ্যোতের ন্যায় দীপ্যমান কি রয়েছে দেখে আমি কন্টক দিয়ে বিদ্ধ করেছি। শর্যাতি তখনই চ্যবনের কাছে গিয়ে কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, আমার বালিকা কন্যা অজ্ঞানবশে আপনাকে পীড়া দিয়েছে, ক্ষমা করুন। চ্যবন বললেন, রাজা, তোমার কন্যা দর্প ও অবজ্ঞার বশে আমাকে বিদ্ধ করেছে, তাকে যদি দান কর তবে ক্ষমা করব। শর্যাতি বিচার না করেই তাঁর কন্যাকে সমর্পণ করলেন।

সুকন্যা সযত্নে চ্যবনের সেবা করতে লাগলেন। একদিন অশ্বিনীকুমারদ্বয় সুকন্যাকে স্নানের পর নগ্নাবস্থায় দেখতে পেয়ে তাঁকে বললেন, ভাবিনী, তোমার ন্যায় সুন্দরী, দেবতাদের মধ্যেও নেই। তোমার পিতা তোমাকে বৃদ্ধের হস্তে দিয়েছেন কেন? তুমি শ্রেষ্ঠ বেশভূষা ধারণের যোগ্যা, জরাজর্জরিত অক্ষম চ্যবনকে ত্যাগ করে আমাদের একজনকে বরণ কর। সুকন্যা বললেন, আমি আমার স্বামীর প্রতি অনুরক্ত। অশ্বিনীকুমারদ্বয় বললেন, আমরা দেবচিকিৎসক, তোমার পতিকে যুবা ও রূপবান করে দেব, তার পর তিনি এবং আমরা এই তিন জনের মধ্যে একজনকে তুমি পতিত্বে বরণ করো। সুকন্যা চ্যবনকে জানালে তিনি এই প্রস্তাবে সম্মত হলেন। তখন অশ্বিনীকুমারদ্বয় চ্যবনকে নিয়ে জলে প্রবেশ করলেন এবং মুহূর্তকাল পরে তিন জনেই দিব্য রূপ ও সমান বেশ ধারণ করে জল থেকে উঠলেন। সকলে তুল্যরূপধারী হলেও সুকন্যা চ্যবনকে চিনতে পেরে তাঁকেই বরণ করলেন। চ্যবন হৃষ্ট হয়ে অশ্বিনীদ্বয়কে বললেন, আপনারা আমাকে রূপবান যুবা করেছেন, আমি এই ভার্যাকেও পেয়েছি। আমি দেবরাজের সমক্ষেই আপনাদের সোমপায়ী করব।

চ্যবনের অনুরোধে রাজা শর্যাতি এক যজ্ঞ করলেন। চ্যবন যখন অশ্বিনীদ্বয়কে দেবার জন্য সোম রসের পাত্র নিলেন তখন ইন্দ্র তাঁকে বারণ করে বললেন, এঁরা দেবতাদের চিকিৎসক ও কর্মচারী মাত্র, মর্তলোকেও বিচরণ করেন, এঁরা সোমপানের অধিকারী নন। চ্যবন নিরস্ত হলেন না, ঈষৎ হাস্য করে অশ্বিনীদ্বয়ের জন্য সোমপাত্র তুলে নিলেন। ইন্দ্র তখন বজ্রপ্রহারে উদ্যত হলেন। চ্যবন ইন্দ্রের বাহু স্তম্ভিত করে মন্ত্রপাঠ করে অগ্নিতে আহুতি দিলেন, অগ্নি থেকে এক নামক এক মহাবীর্য মহাকায় ঘোরদর্শন কৃত্যা (১) উদ্ভূত হয়ে মুখব্যাদান ক'রে ইন্দ্রকে গ্রাস করতে গেল। ভয়ে ওষ্ঠ লেহন করতে করতে ইন্দ্র চ্যবনকে বললেন, ব্রহ্মর্ষি, প্রসন্ন হ'ন, আজ থেকে দুই অশ্বিনীকুমারও সোমপানের অধিকারী হবেন। চ্যবন প্রসন্ন হয়ে ইন্দ্রের স্তম্ভিত বাহুদ্বয় মুক্ত করলেন এবং মদকে বিভক্ত ক'রে সুরাপান, স্ত্রী, দ্যূত ও মৃগয়ায় স্থাপিত করলেন। শর্যাতির যজ্ঞ সমাপ্ত হ'ল চ্যবন তাঁর ভার্যার সঙ্গে বনে চলে গেলেন।

(১) অভিচার ক্রিয়ার জন্য আবির্ভূত দেবতা।