বনপর্ব: ২৭। মান্ধাতা, সোমক ও জন্তুর ইতিহাস

পাণ্ডবগণ নানা তীর্থ দর্শন ক'রে যমুনা নদীর তীরে উপস্থিত হলেন, যেখানে মান্ধাতা ও সোমক রাজা যজ্ঞ করেছিলেন। লোমশ এই ইতিহাস বললেন। —

ইক্ষ্বাকুবংশে যুবনাশ্ব নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি মন্ত্রীদের উপর রাজ্যভার দিয়ে বনে গিয়ে সন্তানকামনায় যোগসাধনা করতে লাগলেন। একদিন তিনি ক্লান্ত ও পিপাসার্ত হয়ে চ্যবন মুনির আশ্রমে প্রবেশ ক'রে দেখলেন যজ্ঞবেদীর উপর এক কলস জল রয়েছে। যুবনাশ্ব জল চাইলেন, কিন্তু তাঁর ক্ষীণ কণ্ঠস্বর কেউ শুনতে পেলেন না। তখন তিনি জলপান ক'রে অবশিষ্ট জল কলস থেকে ফেলে দিলেন। চ্যবন ও অন্যান্য মুনিরা নিদ্রা থেকে উঠে দেখলেন, কলস জলশূন্য। যুবনাশ্বের স্বীকারোক্তি শুনে চ্যবন বললেন, রাজা, আপনি অনুচিত কার্য করেছেন, আপনার পুত্রোৎপত্তির জন্যই এই তপঃসিদ্ধ জল রেখেছিলাম। জলপান করার ফলে আপনিই পুত্র প্রসব করবেন কিন্তু গর্ভধারণের ক্লেশ পাবেন না। শতবর্ষ পূর্ণ হলে যুবনাশ্বের বাম পার্শ্ব ভেদ করে এক সূর্যতুল্য তেজস্বী পুত্র নির্গত হ'ল। দেবতারা শিশুকে দেখতে এলেন। তাঁরা বললেন, এই শিশু কি পান করবে? 'মাং ধাস্যতি' — আমাকে পান করবে — এই বলে ইন্দ্র তার মুখে নিজের তর্জনী পুরে দিলেন, সে চুষতে লাগল। এজন্য তার নাম হল মান্ধাতা। মান্ধাতা বড় হয়ে ধনুর্বেদে পারদর্শী এবং বিবিধ দিব্যাস্ত্র ও অভেদ্য কবচের অধিকারী হলেন। স্বয়ং ইন্দ্র তাকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। মান্ধাতা ত্রিভুবন জয় এবং বহু যজ্ঞ ক'রে ইন্দ্রের অর্ধাসন লাভ করেছিলেন।

সোমক রাজার এক শ ভার্যা ছিল। বৃদ্ধ বয়সে জন্তু নামে তাঁর একটি মাত্র পুত্র হল, সোমককে শতপত্নী সর্বদা তাকে বেষ্টন করে থাকতেন। একদিন সেই বালক পিপীলিকা দংশনে কেঁদে উঠল, তার মাতারাও কাতর হয়ে কাঁদতে লাগলেন। রাজা সোমক সেই আর্তনাদ শুনে অন্তঃপুরে এসে পুত্রকে শান্ত করলেন। তার পর তিনি তাঁর পুরোহিত ও মন্ত্রীবর্গকে বললেন, এক পুত্রের চেয়ে পুত্র না থাকাই ভাল, এক পুত্রে কেবলই উদ্বেগ হয়। আমি পুত্রার্থী হয়ে শত ভার্যার পাণিগ্রহণ করেছি, কিন্তু শুধু একটি পুত্র হয়েছে, এর চেয়ে দুঃখ আর কি আছে। আমার ও পত্নীদের যৌবন অতীত হয়েছে, আমাদের প্রাণ এখন একটিমাত্র বালককে আশ্রয় ক’রে আছে। এমন উপায় কি কিছু নেই যাতে আমার শত পুত্র হ’তে পারে?

পুরোহিত বললেন, আমি এক যজ্ঞ করব, তাতে যদি আপনি আপনার পুত্র জন্তুকে আহূতি দেন তবে শীঘ্র শত পুত্র লাভ করবেন। জন্তুও আবার তার মাতৃগর্ভে জন্মগ্রহণ করবে, তার বাম পার্শ্বে একটি কনকবর্ণ চিহ্ন থাকবে। রাজা সম্মত হলে পুরোহিত যজ্ঞ আরম্ভ করলেন, রাজপত্নীরা জন্তুর হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে বিলাপ করতে লাগলেন। যাজক (পুরোহিত) তখন বালককে সবলে টেনে নিয়ে কেটে ফেললেন এবং তার বসা দিয়ে যথাবিধি হোম করলেন। তার গন্ধ আঘ্রাণ ক’রে রাজপত্নীরা শোকার্ত হয়ে সহসা ভূমিতে পড়ে গেলেন এবং সকলেই গর্ভবতী হলেন। যথাকালে সোমক শত পুত্র লাভ করলেন। জন্তু কনকবর্ণ চিহ্ন ধারণ ক’রে তার ভূতপূর্ব মাতার গর্ভ থেকেই ভূমিষ্ঠ হ’ল।

তার পর সেই যাজক ও সোমক দুজনেই পরলোকে গেলেন। যাজককে নরকভোগ করতে দেখে সোমক তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। যাজক বললেন, আমি আপনার জন্য যে যজ্ঞ করেছিলাম তারই এই ফল। তখন সোমক ধর্মরাজ যমকে বললেন, যাজককে মুক্তি দিন, এর পরিবর্তে আমিই নরকভোগ করব। যম বললেন, রাজা, একজনের পাপের ফল অন্যে ভোগ করতে পারে না। সোমক বললেন, এই ব্রহ্মবাদী যাজককে ছেড়ে আমি পুণ্যফল ভোগ করতে চাই না, এর সঙ্গেই আমি স্বর্গে বা নরকে বাস করব। আমরা একই কর্ম করেছি, আমাদের পাপপুণ্যের ফল সমান হ’ক। তখন যমের সম্মতিক্রমে যাজকের সঙ্গে সোমকও নরকভোগ করলেন এবং পাপক্ষয় হ’লে দুজনেই মুক্ত হয়ে শুভলোক লাভ করলেন।