বনপর্ব: ২৯। উদ্দালক, শ্বেতকেতু, কহোড়, অষ্টাবক্র ও বন্দী
লোমশ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, এই দেশ উদ্দালকপুত্র শ্বেতকেতুর আশ্রম। ত্রেতাযুগে অষ্টাবক্র ও তাঁর মাতুল শ্বেতকেতু শ্রেষ্ঠ বেদজ্ঞ ছিলেন, তাঁরা জনক রাজার যজ্ঞে গিয়ে বরুণপুত্র বন্দীকে বিতর্কে পরাস্ত করেছিলেন। উদ্দালক ঋষি তাঁর শিষ্য কহোড়কে সঙ্গে নিজের কন্যা সুজাতার বিবাহ দেন। সুজাতা গর্ভবতী হ’লে গর্ভস্থ শিশু বেদপাঠরত কহোড়কে বললে, পিতা, আপনার প্রসাদে আমি গর্ভে থেকেই সব শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছি, আপনার পাঠ ঠিক হচ্ছে না। মহর্ষি কহোড় ক্রুদ্ধ হয়ে গর্ভস্থ শিশুকে শাপ দিলেন—তোর দেহ অষ্ট স্থানে বক্র হবে। কহোড়ের এই পুত্র অষ্টাবক্র নামে খ্যাত হন, তিনি তাঁর মাতুল শ্বেতকেতুর সমবয়স্ক ছিলেন।
গর্ভের দশম মাসে সুজাতা তাঁর পতিকে বললেন, আমি নিঃস্ব, আমাকে অর্থসাহায্য করে এমন কেউ নেই, কি করে সন্তানপালন করব? কহোড় ধনের জন্য জনক রাজার কাছে গেলেন, সেখানে তর্ককুশল বন্দী তাঁকে বিচারে পরাস্ত ক’রে জলে ডুবিয়ে দিলেন। এই সংবাদ পেয়ে উদ্দালক তাঁর কন্যা সুজাতাকে বললেন, গর্ভস্থ শিশু যেন জানতে না পারে। জন্মগ্রহণ ক’রে অষ্টাবক্র তাঁর পিতার বিষয় কিছুই জানলেন না, তিনি উদ্দালককে পিতা এবং শ্বেতকেতুকে ভ্রাতা মনে করতে লাগলেন। বার বৎসর বয়সে একদিন অষ্টাবক্র তাঁর মাতামহের কোলে ব’সে আছেন এমন সময় শ্বেতকেতু তাঁর হাত ধরে টেনে বললেন, এ তোমার পিতার কোল নয়। অষ্টাবক্র দুঃখিত হয়ে তাঁর মাতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার পিতা কোথায়? তখন সুজাতা পূর্বঘটনা বললেন।
অষ্টাবক্র তাঁর মাতুল শ্বেতকেতুকে বললেন, চল, আমরা জনক রাজার যজ্ঞে যাই, সেখানে ব্রাহ্মণদের বিতর্ক শুনব, উত্তম অন্ন ও ভোজন করব। মাতুল ও ভাগিনেয় যজ্ঞসভার নিকটে এলে দ্বারপাল বাধা দিয়ে বললে, আমরা বন্দীর আজ্ঞাধীন, এই সভায় বালকরা আসতে পারে না, কেবল বিদ্বান বৃদ্ধ ব্রাহ্মণরাই পারেন। অষ্টাবক্র বললেন, আমরা ব্রতচারী, বেদজ্ঞ, জিতেন্দ্রিয়, জ্ঞানশাস্ত্রে পারদর্শী, অতএব আমরা বৃদ্ধই। দ্বারপাল পরীক্ষা করবার জন্য কতকগুলি প্রশ্ন করলে। অষ্টাবক্র তার যথাযথ উত্তর দিয়ে জনক রাজাকে সম্বোধন ক’রে বললেন, মহারাজ, শুনেছি বন্দীর সঙ্গে বিতর্কে যারা হেরে যান আপনার আজ্ঞায় তাদের জলে ডোবানো হয়। কোথায় সেই বন্দী? আমি তাকে পরাস্ত করব। জনক বললেন, বৎস, তুমি না জেনেই বন্দীকে জয় করতে চাচ্ছ, জ্ঞানগর্বিত অনেক পণ্ডিত তাঁর সঙ্গে বিচার করতে এসে পরাস্ত হয়েছেন। অষ্টাবক্র বললেন, বন্দী আমার তুল্য প্রতিপক্ষ পান নি তাই বিচারসভায় সিংহের ন্যায় আস্ফালন করেন। আমার সঙ্গে বিতর্কে তিনি পরাস্ত হয়ে ভগ্নচক্র শকটের ন্যায় পথে প’ড়ে থাকবেন।
তখন রাজা জনক অষ্টাবক্রকে বিবিধ দুরূহ প্রশ্ন করলেন এবং তার সদুত্তর পেয়ে বললেন, দেবতুল্য বালক, বাক্পটুতায় তোমার সমান কেউ নেই, তুমি বালক নও, স্থবির। তোমাকে আমি পথ ছেড়ে দিচ্ছি। অষ্টাবক্র সভায় প্রবেশ ক’রে বন্দীর সঙ্গে বিচারে প্রবৃত্ত হলেন। অনেক প্রশ্ন উত্তর ও প্রত্যুত্তরের পর বন্দী অধোমুখে নীরব হলেন। সভায় মহা কোলাহল উঠল, ব্রাহ্মণগণ কৃতাঞ্জলি হয়ে সসম্মানে অষ্টাবক্রের কাছে এলেন। অষ্টাবক্র বললেন, এই বন্দী ব্রাহ্মণদের জয় ক’রে জলে ডুবিয়েছিলেন, এখন একেই আপনারা ডুবিয়ে দিন। বন্দী বললেন, আমি বরুণের পুত্র, জনক রাজার এই যজ্ঞের সমকালে বরুণও এক যজ্ঞ আরম্ভ করেছেন, আমি ব্রাহ্মণদের জলমজ্জিত করে সেই যজ্ঞ দেখতে পাঠিয়েছি, তাঁরা এখন ফিরে আসছেন। আমি অষ্টাবক্রকে সম্মান করছি, তাঁর জন্যই আমি জলমজ্জিত হয়ে পিতার সঙ্গে মিলিত হব। অষ্টাবক্রও তাঁর পিতা কহোড়কে এখনই দেখতে পাবেন।
অনন্তর কহোড় ও অন্যান্য ব্রাহ্মণগণ বরুণের নিকট পূজা লাভ ক’রে জনকের সভায় ফিরে এলেন। কহোড় বললেন, মহারাজ, এই জনই লোকে পুত্র-কামনা করে, আমি যা করতে পারি নি আমার পুত্র তা করেছে। তার পর বন্দী সমুদ্রে প্রবেশ করলেন, পিতা ও মাতুলের সঙ্গে অষ্টাবক্রও উদ্দালকের আশ্রমে ফিরে এলেন। কহোড় তাঁর পুত্রকে বললেন, তুমি শীঘ্র এই নদীতে প্রবেশ কর। পিতার আজ্ঞা পালন ক’রে অষ্টাবক্র নদী থেকে অবিকল সমান-অঙ্গ হয়ে উত্থিত হলেন। সেই কারণে এই নদী সমঙ্গা নামে খ্যাত।