বনপর্ব: ৩০। চ্যবনজ, যবক্রীত, রৈভ্য, অর্ব্বাবসু ও পরাবসু
লোমশ বললেন, যুধিষ্ঠির, এই সেই সমঙ্গা বা মধুবিল্ব নদী, বৃত্রবধের পর ইন্দ্র যাতে স্নান ক’রে সর্ব পাপ থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। এই ঋষিগণের প্রিয় কনখল পর্বত, এই মহানদী গঙ্গা, ওই রৈভ্যাশ্রম যেখানে ভরদ্বাজপুত্র যবক্রীত বিনষ্ট হয়েছিলেন। সেই ইতিহাস শোন।—
ভরদ্বাজ তাঁর সখা রৈভ্যের নিকটেই বাস করতেন। রৈভ্য এবং তাঁর দুই পুত্রে অর্বাবসু ও পরাবসু বিদ্বান্ ছিলেন, ভরদ্বাজ শুধু তপস্বী ছিলেন। ব্রাহ্মণগণ ভরদ্বাজকে সম্মান করেন না কিন্তু রৈভ্য ও তাঁর দুই পুত্রকে করেন দেখে ভরদ্বাজপুত্র যবক্রীত কঠোর তপস্যায় নিরত হলেন। ইন্দ্র উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তপস্যা করছ? যবক্রীত বললেন, দেবরাজ, গুরুমুখ থেকে বহুকাল বেদবিদ্যা লাভ করতে হয়; অধ্যয়ন না করেই যাতে বেদবিৎ হওয়া যায় সেই কামনায় আমি তপস্যা করছি। ইন্দ্র বললেন, তুমি কুপথে যাচ্ছ, আত্মহত্যা করো না, ফিরে গিয়ে গুরুর নিকট বেদবিদ্যা শেখ। যবক্রীত তথাপি তপস্যা করতে লাগলেন। ইন্দ্র আবার এসে তাঁকে নিরস্ত হতে বললেন কিন্তু যবক্রীত শুনলেন না। তখন ইন্দ্র অতিজরাগ্রস্ত দুর্বল যক্ষ্মাক্রান্ত ব্রাহ্মণের রূপে গঙ্গাতীরে এসে নিরন্তর বালুকামুষ্টি ফেলতে লাগলেন। যবক্রীত তাঁকে সহাস্যে প্রশ্ন করলেন ব্রাহ্মণ, নিরর্থক একি করছেন? ইন্দ্র বললেন, বৎস, আমি গঙ্গার সেতু বাঁধছি, লোকে যাতে অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে। যবক্রীত বললেন, তপোধন, এই অসাধ্য কার্যের চেষ্টা করবেন না। ইন্দ্র বললেন, তুমি যেমন বেদজ্ঞ হবার আশায় তপস্যা করছ আমিও সেইরূপ বৃথা চেষ্টা করছি। যবক্রীত বললেন, দেবরাজ, যদি আমার তপস্যা নিরর্থক মনে করেন তবে বর দিন যেন আমি বিদ্বান হই। ইন্দ্র বর দিলেন—তোমরা পিতা-পুত্রে বেদজ্ঞান লাভ করবে।
যবক্রীত পিতার কাছে এসে বরলাভের বিষয় জানালেন। ভরদ্বাজ বললেন, বৎস, অভীষ্ট বর পেয়ে তোমার দর্প হবে, মন ক্ষুব্ধ হবে, তার ফলে তুমি বিনষ্ট হবে। মহর্ষি রৈভ্য কোপনস্বভাব, তিনি যেন তোমার অনিষ্ট না করেন। যবক্রীত বললেন, আপনি ভয় পাবেন না, রৈভ্য আপনার তুল্যই আমার মান্য। পিতাকে এইরূপে সান্ত্বনা দিয়ে যবক্রীত মহানন্দে অন্যান্য ঋষিদের অনিষ্ট করতে লাগলেন।
একদিন বৈশাখ মাসে যবক্রীত রৈভ্যের আশ্রমে গিয়ে কিন্নরীর ন্যায় রূপবতী পরাবসুর পত্নীকে দেখতে পেলেন। যবক্রীত নির্লজ্জ হয়ে তাঁকে বললেন, আমাকে ভজনা কর। পরাবসুপত্নী ভয় পেয়ে 'তাই হবে' বলে পালিয়ে গেলেন। রৈভ্য আশ্রমে এসে দেখলেন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রবধূ কাঁদছেন। যবক্রীতের আচরণ শুনে রৈভ্য অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর দুই গাছি জটা ছিঁড়ে অগ্নিতে নিক্ষেপ করলেন, তা থেকে পরাবসুপত্নীর তুল্য রূপবতী এক নারী এবং এক ভয়ঙ্কর রাক্ষস উৎপন্ন হ'ল। রৈভ্য তাদের আজ্ঞা দিলেন, যবক্রীতকে বধ কর। তখন সেই নারী যবক্রীতের কাছে গিয়ে তাঁকে মুগ্ধ করে কমণ্ডলু হরণ করলে। যবক্রীতের মুখ তখন উচ্ছিষ্ট ছিল। রাক্ষস শূল উদ্যত করে তাঁর দিকে ধাবিত হ'ল। যবক্রীত তাঁর পিতার অগ্নিহোত্রগৃহে আশ্রয় নিতে গেলেন, কিন্তু সেই গৃহের রক্ষী এক অন্ধ শূদ্র তাঁরে সবলে দ্বারদেশে ধরে রাখলে। তখন রাক্ষস শূলের আঘাতে যবক্রীতকে বধ করলে।
পুত্রের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ভরদ্বাজ বিলাপ করতে লাগলেন — পরে, তুমি ব্রাহ্মণদের জন্য তপস্যা করেছিলে যাতে তাঁরা অধ্যয়ন না করেই বেদজ্ঞ হতে পারেন। ব্রাহ্মণের হিতার্থী ও নিরপরাধ হয়েও কেন তুমি বিনষ্ট হলে? আমার নিষেধ সত্ত্বেও কেন রৈভ্যের আশ্রমে গিয়েছিলে? আমি বৃদ্ধ, তুমি আমার একমাত্র পুত্র, তথাপি দুৰ্মতি রৈভ্য আমাকে পুত্রহীন করলেন। রৈভ্যও শীঘ্র তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র কর্তৃক নিহত হবেন। এইরূপ অভিশাপ দিয়ে ভরদ্বাজ পুত্রের অগ্নিসংস্কার করে নিজেও অগ্নিতে প্রাণ বিসর্জন দিলেন।
এই সময়ে রাজা বৃহদ্যুম্ন এক যজ্ঞ করছিলেন। সাহায্যের জন্য রৈভ্যের দুই পুত্র সেখানে গিয়েছিলেন, আশ্রমে কেবল রৈভ্য ও তাঁর পুত্রবধূ ছিলেন। একদিন পরাবসু আশ্রমে আসছিলেন, তিনি শেষরাত্রে বনমধ্যে কৃষ্ণাজিনধারী পিতাকে দেখে মৃগ মনে করে আত্মরক্ষার্থ তাঁকে বধ করলেন। পিতার অন্ত্যেষ্টি ক’রে পরাবসু যজ্ঞস্থানে ফিরে গিয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অর্বাবসুকে বললেন, আমি মৃগ মনে ক'রে পিতাকে বধ করেছি। আপনি আশ্রমে ফিরে গিয়ে আমার হয়ে ব্রহ্মহত্যার প্রায়শ্চিত্ত করুন, আমি একাকীই এই যজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারব। অর্বাবসু সম্মত হয়ে আশ্রমে গেলেন এবং প্রায়শ্চিত্তের পর যজ্ঞস্থানে ফিরে এলেন। তখন পরাবসু হৃষ্ট হয়ে রাজা বৃহদ্যুম্নকে বললেন, এই ব্রহ্মহত্যাকারী যেন আপনার যজ্ঞ না দেখে ফেলে, তা হ’লে আপনার অনিষ্ট হবে। রাজা অর্বাবসুকে তাড়িয়ে দেবার জন্য ভৃত্যদের আজ্ঞা দিলেন। অর্বাবসু বার বার বললেন, আমার এই ভ্রাতাই ব্রহ্মহত্যা করেছে, আমি তাকে সেই পাপ থেকে মুক্ত করেছি। তাঁর কথায় কেউ বিশ্বাস করলে না দেখে অর্বাবসু বনে গিয়ে সূর্য্যের আরাধনায় নিরত হলেন। মূর্ত্তিমান সূর্য্য ও অন্যান্য দেবগণ প্রীত হয়ে অর্বাবসুকে সম্বর্ধনা এবং পরাবসুকে প্রত্যাখ্যান করলেন। অর্বাবসুর প্রার্থনায় দেবগণ বর দিলেন, তার ফলে রৈভ্য ভরদ্বাজ ও যবক্রীত পুনর্জীবিত হলেন, পরাবসুর পাপ দূর হ’ল, রৈভ্য বিস্মৃত হলেন যে পরাবসু তাঁকে হত্যা করেছিলেন, এবং সূর্য্যমন্ডলে প্রীতি হ’ল।
জীবিত হয়ে যবক্রীত দেবগণকে বললেন, আমি বেদাধ্যায়ী তপস্বী ছিলাম তথাপি রৈভ্য আমাকে কি করে বধ করতে পারলেন? দেবতারা বললেন, তুমি গুরুর সাহায্য না নিয়ে (কেবল তপস্যার প্রভাবে) বেদপাঠ করেছিলে, আর রৈভ্য অতি কষ্টে গরুড়কে তুষ্ট ক'রে দীর্ঘকালে বেদজ্ঞান লাভ করেছিলেন, সেজন্য তাঁর জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ।