বনপর্ব: ৩১। নরকাসুর — বরাহরূপী বিষ্ণু — বদরিকাশ্রম

উশীনরবীজ ও মৈনাক পর্বত, শ্বেতগিরি এবং কালশৈল অতিক্রম ক'রে যুধিষ্ঠিরাদি সপ্তধারা গঙ্গার নিকট উপস্থিত হলেন। লোমশ বললেন, এখন আমরা মণিভদ্র ও যক্ষরাজ কুবেরের স্থান কৈলাসে যাব। সেই দুর্গম প্রদেশ গন্ধর্ব কিন্নর যক্ষ ও রাক্ষসগণ কর্তৃক রক্ষিত, তোমরা সতর্ক হয়ে চল। যুধিষ্ঠির বললেন, ভীম, তুমি দ্রৌপদী ও অন্য সকলের সঙ্গে এই গঙ্গাদ্বারে অপেক্ষা কর, কেবল আমি নকুল ও মহাতপা লোমশ এই তিনজন লঘু আহার করে ও সংযত হয়ে এই দুর্গম পথে যাত্রা করব। ভীম বললেন, অর্জুনকে দেখবার জন্য দ্রৌপদী এবং আমরা সকলেই উৎসুক হয়ে আছি। এই রাক্ষসসঙ্কুল দুর্গম স্থানে আপনাকে আমি ছেড়ে দিতে পারি না। পাঞ্চালী বা নকুল-সহদেব যেখানে চলতে পারবেন না সেখানে আমি তাঁদের বহন ক'রে নিয়ে যাব দ্রৌপদী সহাস্যে বললেন, আমি চলতে পারব, আমার জন্য ভেবো না।

যুধিষ্ঠিরাদি সকলে পুলিন্দরাজ সুবাহুর বিশাল রাজ্যে উপস্থিত হলেন এবং সসম্মানে গৃহীত হয়ে সেখানে সুখে রাত্রিযাপন করলেন। পরদিন সূর্যোদয় হ'লে পাচক ও ভৃত্যদের পুলিন্দরাজের নিকট রেখে তাঁরা পদব্রজে হিমালয় পর্বতের দিকে যাত্রা করলেন। যেতে যেতে এক স্থানে এসে লোমশ বললেন, দূরে ওই যে কৈলাসশিখরতুল্য সুবিশাল সদৃশ স্তূপ দেখছ তা নরকাসুরের অস্থি। নরকাসুর তপস্যার প্রভাবে ও বাহুবলে দুর্ধর্ষ হয়ে দেবগণের উপর উৎপীড়ন করত। ইন্দ্রের প্রার্থনায় বিষ্ণু হস্তদ্বারা স্পর্শ করে সেই অসুরের প্রাণহরণ করেন।

তার পর লোমশ বরাহরূপী বিষ্ণুর এই আখ্যান বললেন। সত্যযুগে এক ভয়ংকর কালে আদিদেব বিষ্ণু যমের কার্য করতেন। তখন কেউ মরত না, কেবল জন্মগ্রহণ করত। পশু পক্ষী মানুষ প্রভৃতির সংখ্যা এত হ'ল যে তাদের গুরুভারে বসুমতী শত যোজন নিম্নে চ'লে গেলেন। তিনি সর্বাংশে ব্যথিত হয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন। তখন বিষ্ণু রক্তনয়ন একদন্ত ভীষণাকার বরাহের রূপে পৃথিবীকে দন্তে ধারণ ক'রে শত যোজন ঊর্ধ্বে তুললেন। চরাচর সংক্ষোভিত হ'ল, দেবতা ঋষি প্রভৃতি সকলেই কম্পিত হয়ে বহ্ণির নিকটে গেলেন, বহ্ণি আশ্বাস দিয়ে তাঁদের ভয় দূর করলেন।

পাণ্ডবগণ গন্ধমাদন পর্বতে উপস্থিত হ’লে প্রবল ঝড়বৃষ্টি হ’তে লাগল, সকলে ভীত হয়ে বৃক্ষ বল্মীকস্তূপ প্রভৃতির নিকট আশ্রয় নিলেন। দুর্যোগ থেমে গেলে তাঁরা আবার চলতে লাগলেন। এক ক্রোশ গিয়ে দ্রৌপদী শ্রান্ত ও অবশ হয়ে ভূমিতে পড়ে গেলেন। যুধিষ্ঠির তাঁকে কোলে নিয়ে বিলাপ করতে লাগলেন — আমি পাপী, আমার কর্মের ফলেই ইনি শোকে ও পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে ভূপতিত হয়েছেন। ধৌম্য প্রভৃতি ঋষিগণ শান্তির জন্য মন্ত্র জপ করলেন, পাণ্ডবগণ দ্রৌপদীকে মৃগচর্মের উপর শুইয়ে নানাপ্রকারে তাঁর সেবা করতে লাগলেন। যুধিষ্ঠির ভীমকে বললেন, তুষারাবৃত দুর্গম গিরিপথে দ্রৌপদী কি করে যাবেন? ভীম স্মরণ করা মাত্র মহাবাহু ঘটোৎকচ সেখানে এসে করজোড়ে বললেন, আজ্ঞা করুন কি করতে হবে। ভীম বললেন, বৎস, তোমার মাতা পরিশ্রান্ত হয়েছেন, একে বহন ক’রে নিয়ে চল। তুমি একে স্কন্ধে নিয়ে আমাদের নিকটবর্তী হয়ে আকাশমার্গে চল, যেন এর কষ্ট না হয়।

ঘটোৎকচ দ্রৌপদীকে বহন ক’রে নিয়ে চললেন, তাঁর অনুচর রাক্ষসরা পাণ্ডব ও ব্রাহ্মণদের নিয়ে চলল, কেবল মহর্ষি লোমশ নিজের প্রভাবে সিদ্ধমার্গে দ্বিতীয় ভাস্করের ন্যায় অগ্রসর হলেন। বদরিকাশ্রমে উপস্থিত হয়ে সকলে রাক্ষসদের স্কন্ধ থেকে নেমে নরনারায়ণের রমণীয় আশ্রম দর্শন করলেন। সেখানকার মহর্ষিগণ যুধিষ্ঠিরাদিকে সাদরে গ্রহণ ক’রে যথাবিধি আতিথ্যসৎকার করলেন। সেই আনন্দ-জনক অতি দুর্গম স্থানে বিশাল বদরী তরুর নিকটে ভাগীরথী নদী প্রবাহিত হচ্ছে। যুধিষ্ঠিরাদি সেখানে পিতৃগণের তর্পণ করলেন।