বনপর্ব: ৩৮। কৃষ্ণ ও মার্কণ্ডেয়ের আগমন — অরিষ্টনেমি ও অত্রি
বিশাখা যূপ বনে বর্ষা ও শরৎ ঋতু কাটিয়ে পাণ্ডবগণ আবার কাম্যকবনে এসে বাস করতে লাগলেন। একদিন সত্যভামাকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণ তাঁদের দেখতে এলেন। অর্জুনকে, সুভদ্রা ও অভিমন্যুর কুশলসংবাদ দিয়ে কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে বললেন, যাজ্ঞসেনী, ভাগ্যক্রমে অর্জুন ফিরে এসেছেন, তোমার স্বজনবর্গ এখন পূর্ণ হ’ল। তোমার বালক পুত্রগণ ধনুর্বেদে অনুরক্ত ও সুশীল হয়েছে। তোমার পিতা ও ভ্রাতা নিমন্ত্রণ করলেও তারা মাতুলালয়ের ঐশ্বর্য ভোগ করতে চায় না, তারা দ্বারকাতেই সুখে আছে। আর্যা কুন্তী আর তুমি যেমন পার সেইরূপ সুভদ্রাও - Page Number: ২১৬ - Header: মহাভারত সর্বদা তাদের সদাচার শিক্ষা দিচ্ছেন। রুক্মিণী তনয় প্রদ্যুম্ন ও কুমার অভিমন্যু তাদের রথ ও অশ্বচালনা এবং বিবিধ অস্ত্রের প্রয়োগ শেখাচ্ছেন। তার পর কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, যাদবসেনা আপনার আদেশের অপেক্ষা করছে, আপনি পাপী দুর্যোধনকে অবিলম্বে বিনষ্ট করুন। অথবা আপনি দ্যুতসভায় যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাই পালন করুন, যাদবসেনাই আপনার শত্রু সংহার করবে, আপনি বৃথাকালে হস্তিনাপুর অধিকার করবেন।
যুধিষ্ঠির কৃতাঞ্জলি হয়ে বললেন, কেশব, তুমিই আমাদের গতি, উপযুক্ত কালে তুমি আমাদের সর্বপ্রকারে সাহায্য করবে তাতে সংশয় নেই। আমরা প্রায় দ্বাদশ বৎসর বনবাসে কাটিয়েছি, অজ্ঞাতবাস শেষ ক'রেই তোমার শরণ নেব।
এমন সময়ে মহাতপা মার্কণ্ডেয় মুনি সেখানে এলেন। তাঁর বয়স বহু সহস্র বৎসর কিন্তু তিনি দেখতে পঁচিশ বৎসরের যুবার ন্যায়। তিনি পূজা গ্রহণ করে উপবিষ্ট হ'লে কৃষ্ণ তাঁকে বললেন, আমরা সকলে আপনার কাছে পুণ্যকথা শুনতে ইচ্ছা করি। এই সময়ে দেবর্ষি নারদও পাণ্ডবদের দেখতে এলেন, তিনিও মার্কণ্ডেয়কে অনুরোধ করলেন।
মার্কণ্ডেয় ধর্ম অধর্ম কর্মফল ইহলোক পরলোক প্রভৃতি সম্বন্ধে অনেক ব্যাখ্যান করলেন। পাণ্ডবগণ বললেন, আমরা ব্রাহ্মণমাহাত্ম্য শুনতে ইচ্ছা করি, আপনি বলুন। মার্কণ্ডেয় এই আখ্যান বললেন।—হৈহয় বংশের এক রাজকুমার মৃগয়া করতে গিয়ে কৃষ্ণমৃগচর্মধারী এক ব্রাহ্মণকে দেখে তাঁকে মৃগ মনে করে বধ করেন। তিনি ব্যাকুল হয়ে রাজধানীতে ফিরে এসে তাঁর পাপকর্মের কথা জানালেন। তখন হৈহয়রাজগণ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহত মুনিকে দেখলেন এবং তাঁর সম্বন্ধে অনুসন্ধান করতে করতে মহর্ষি অরিষ্টনেমার আশ্রমে এলেন। মহর্ষি তাদের পাদ্য-অর্ঘ্যাদি দিতে গেলে তাঁরা বললেন, আমরা ব্রহ্মহত্যা করেছি, সংস্কৃত হবার যোগ্য নই। তার পর সকলে পুনর্বার ঘটনাস্থলে গেলেন কিন্তু মৃতদেহ দেখতে পেলেন না। তখন অরিষ্টনেমা বললেন, দেখুন তো, আমার এই পুত্রই সেই নিহত ব্রাহ্মণ কিনা। রাজারা অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, সেই মৃত মুনিকুমার কি ক'রে জীবিত হলেন? অরিষ্টনেমা বললেন, আমরা স্বধর্মের অনুষ্ঠান করি, ব্রাহ্মণদের যাতে মঙ্গল হয় তাই বলি, যাতে দোষ হয় এমন কথা বলি না। অতিথি ও পরিচারকদের ভোজনের পর যা অবশিষ্ট থাকে তাই আমরা খাই। আমরা শান্ত, সংযতেন্দ্রিয়, ক্ষমাশীল, তীর্থ পর্যটক ও দানপরায়ণ, পুণ্যদেশে তেজস্বী ঋষিগণের সংসর্গে বাস করি। যেসকল কারণে আমাদের মৃত্যুভয় নেই - Page Number: ২১৭ তার অল্পমাত্র আপনাদের বললাম। আপনারা এখন ফিরে যান, পাপের ভয় করবেন না। রাজারা হৃষ্ট হয়ে অরিষ্টনেমাকে প্রণাম ক’রে চ’লে গেলেন।
তার পর মার্কণ্ডেয় এই উপাখ্যান বললেন। — মহর্ষি অত্রি বনগমনের ইচ্ছা করলে তাঁর ভার্যা বললেন, রাজর্ষি বৈণ্য অশ্বমেধ যজ্ঞ করছেন, তুমি তাঁর কাছে প্রার্থনা ক’রে প্রচুর ধন নিয়ে এস, এবং সেই ধন পুত্র ও ভৃত্যদের ভাগ ক’রে দিয়ে যেখানে ইচ্ছা হয় যেয়ো। অত্রি সম্মত হয়ে বৈণ্য রাজার কাছে গিয়ে তাঁর এই স্তুতি করলেন — রাজা, আপনি ধন্য, প্রজাগণের নিয়ন্তা ও পৃথিবীর প্রথম নরপতি; মুনিরা বলেন, আপনি ভিন্ন আর কেউ ধর্মজ্ঞ নেই। এই স্তুতি শুনে গৌতম ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, অত্রি, এমন কথা আর বলো না, ইন্দ্রই রাজাদের মধ্যে প্রথম। তুমি মূঢ় অপরিণতবুদ্ধি, রাজাকে তুষ্ট করবার জন্য স্তুতি করছ। অত্রি ও গৌতম কলহ করছেন দেখে সভাস্থ ব্রাহ্মণগণ দুজনকে ধর্মজ্ঞ সনৎকুমারের কাছে নিয়ে গেলেন। সনৎকুমার বললেন, রাজাকে ধর্ম ও প্রজাপতি বলা হয়, তিনিই ইন্দ্র ধাতা প্রজাপতি বিরাট প্রভৃতি নামে স্তুত হন, সকলেই তাঁর অর্চনা করে। অত্রি রাজাকে যে প্রথম বা প্রধান বলেছেন তা শাস্ত্রসম্মত। বিচারে অত্রিকে জয়ী দেখে বৈণ্য রাজা প্রীত হয়ে তাঁকে বহু ধন দান করলেন।