বনপর্ব: ৩৯। বৈবস্বত মনু ও মৎস্য — বালকরূপী নারায়ণ

যুধিষ্ঠিরের অনুরোধে মার্কণ্ডেয় বৈবস্বত মনুর এই বৃত্তান্ত বললেন। — বিবস্বানের (সূর্যের) পুত্র মনু রাজ্যলাভের পর বদরিকাশ্রমে গিয়ে দশ হাজার বৎসর কঠোর তপস্যা করেছিলেন। একদিন একটি ক্ষুদ্র মৎস্য চীরণী নদীর তীরে এসে মনুকে বললে, বলবান মৎস্যদের আক্রমণ থেকে আমাকে রক্ষা করুন। মনু সেই মৎস্যটিকে একটি জালার মধ্যে রাখলেন। ক্রমশ সে বড় হ’ল, তখন মনু তাকে একটি বিশাল পুষ্করিণীতে রাখলেন। কালক্রমে মৎস্য এত বড় হ’ল যে সেখানেও তার স্থান হ’ল না, তখন মনু তাকে গঙ্গায় ছেড়ে দিলেন। কিছুকাল পরে মৎস্য বললে, প্রভু, আমি অতি বৃহৎ হয়েছি, গঙ্গায় নড়তে পারছি না, আমাকে সমুদ্রে ছেড়ে দিন। মনু যখন তাকে সমুদ্রে ফেললেন তখন সে সহাস্যে বললে, ভগবান, আপনি আমাকে সর্বত্র রক্ষা করেছেন, এখন আপনার যা কর্তব্য তা শুনুন। — প্রলয়কাল আসন্ন, স্থাবর জঙ্গম সমস্তই জলমগ্ন হবে। আপনি রজ্জুযুক্ত একটি দৃঢ় নৌকা প্রস্তুত করিয়ে সপ্তর্ষিদের সঙ্গে তাতে উঠবেন, এবং পূর্বে ব্রাহ্মণগণ যে সকল বীজের কথা বলেছেন তাও তাতে রাখবেন। আপনি সেই নৌকায় থেকে আমার প্রতীক্ষা করবেন, আমি শৃঙ্গ ধারণ ক’রে আপনার কাছে আসব। মৎস্যের উপদেশ অনুসারে মনু মহাসমুদ্রে নৌকায় উঠলেন। তিনি স্মরণ করলে মৎস্য উপস্থিত হ’ল। মনু তার শৃঙ্গে রজ্জু বাঁধলেন, মৎস্য গর্জনমান ঊর্মিময় লবণাম্বুর উপর দিয়ে মহাবেগে নৌকা টেনে নিয়ে চলল। তখন পৃথিবী আকাশ ও সর্বদিক সমস্তই জলময়, কেবল সাতজন ঋষি, মনু আর মৎস্যকে দেখা যাচ্ছিল। বহু বর্ষ পরে হিমালয়ের নিকটে এসে মনু মৎস্যের উপদেশ অনুসারে পর্বতের মহাশৃঙ্গে নৌকা বাঁধলেন। সেই শৃঙ্গ এখনও 'নৌবন্ধন' নামে খ্যাত। তার পর মৎস্য ঋষিগণকে বললে, আমি প্রজাপতি ব্রহ্মা, আমার উপরে কেউ নেই, আমি মৎস্যরূপে তোমাদের ভয়মুক্ত করেছি। এই মনু দেবাসুর মানুষ প্রভৃতি সকল প্রজা ও স্থাবর জঙ্গম সৃষ্টি করবেন। এই ব’লে মৎস্য অন্তর্হিত হ’ল। তার পর মনু কঠোর তপস্যায় সিদ্ধিলাভ ক’রে সকল প্রজা সৃষ্টি করতে লাগলেন।

যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি পুরাকালের সমস্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার সম্বন্ধে কিছু শুনতে ইচ্ছা করি। মার্কণ্ডেয় বললেন, সত্যযুগের পরিমাণ চার হাজার বৎসর (১), তার সন্ধ্যা (২) চার শ, এবং সন্ধ্যাংশ (৩) ও চার শ বৎসর। ত্রেতাযুগ তিন হাজার বৎসর, তার সন্ধ্যা তিন শ বৎসর, যে সকল বীজের কথা বলেছেন তাও তাতে রাখবেন। আপনি সেই নৌকায় থেকে আমার প্রতীক্ষা করবেন, আমি শৃঙ্গ ধারণ ক’রে আপনার কাছে আসব। মৎস্যের উপদেশ অনুসারে মনু মহাসমুদ্রে নৌকায় উঠলেন। তিনি স্মরণ করলে মৎস্য উপস্থিত হ’ল। মনু তার শৃঙ্গে রজ্জু বাঁধলেন, মৎস্য গর্জনমান ঊর্মিময় লবণাম্বুর উপর দিয়ে মহাবেগে নৌকা টেনে নিয়ে চলল। তখন পৃথিবী আকাশ ও সর্বদিক সমস্তই জলময়, কেবল সাতজন ঋষি, মনু আর মৎস্যকে দেখা যাচ্ছিল। বহু বর্ষ পরে হিমালয়ের নিকটে এসে মনু মৎস্যের উপদেশ অনুসারে পর্বতের মহাশৃঙ্গে নৌকা বাঁধলেন। সেই শৃঙ্গ এখনও 'নৌবন্ধন' নামে খ্যাত। তার পর মৎস্য ঋষিগণকে বললে, আমি প্রজাপতি ব্রহ্মা, আমার উপরে কেউ নেই, আমি মৎস্যরূপে তোমাদের ভয়মুক্ত করেছি। এই মনু দেবাসুর মানুষ প্রভৃতি সকল প্রজা ও স্থাবর জঙ্গম সৃষ্টি করবেন। এই ব’লে মৎস্য অন্তর্হিত হ’ল। তার পর মনু কঠোর তপস্যায় সিদ্ধিলাভ ক’রে সকল প্রজা সৃষ্টি করতে লাগলেন।

(১) অনেকে বৎসরের অর্থ করেন দৈব বৎসর, অর্থাৎ মানুষের ৩৬০ বৎসর।
(২) যে কালে যুগলক্ষণ ক্ষীণ হয়।
(৩) যে কালে পরবর্তী যুগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।

যুধিষ্ঠির বললেন, আপনি পুরাকালের সমস্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার সম্বন্ধে কিছু শুনতে ইচ্ছা করি। মার্কণ্ডেয় বললেন, সত্যযুগের পরিমাণ চার হাজার বৎসর (১), তার সন্ধ্যা (২) চার শ, এবং সন্ধ্যাংশ (৩) ও চার শ বৎসর। ত্রেতাযুগ তিন হাজার বৎসর, তার সন্ধ্যা তিন শ বৎসর, সন্ধ্যাংশও তাই। দ্বাপরযুগ দু হাজার বৎসর, সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ দুইই দু শ বৎসর। কলিযুগ এক হাজার বৎসর, সন্ধ্যা ও সন্ধ্যাংশ এক-এক শ বৎসর। চার যুগে বার হাজার বৎসর; এক হাজার যুগে (এক হাজার চতুর্যুগে) ব্রহ্মার এক দিন। তার পর ব্রহ্মার রাত্রি প্রলয়কাল। একদা প্রলয়কালে আমি নিরাশ্রয় হয়ে সমুদ্রজলে ভাসছিলাম এমন সময়ে দেখলাম, এক বিশাল বটবৃক্ষের শাখার তলে দিব্য-আস্তরণযুক্ত পর্যঙ্কে একটি চন্দ্রবদন পদ্মলোচন বালক শুয়ে আছে, তার বর্ণ অতসী (৪) পুষ্পের ন্যায়, বক্ষে শ্রীবৎসচিহ্ন (৫)। সেই বালক বললেন, বৎস মার্কণ্ডেয়, তুমি পরিশ্রান্ত হয়েছ, আমার শরীরের ভিতরে বাস কর। এই ব’লে তিনি মুখব্যাদান করলেন। আমি তাঁর উদরে প্রবেশ ক’রে দেখলাম, নগর রাষ্ট্র পর্বত নদী সাগর আকাশ চন্দ্রসূর্য দেবগণ অসুরগণ প্রভৃতি সমেত সমগ্র জগৎ সেখানে রয়েছে। এক শত বৎসরের অধিক কাল তাঁহার দেহের মধ্যে বিচরণ করে কোথাও অন্ত পেলাম না, তখন আমি সেই বরেণ্য দেবের শরণ নিলাম এবং সহসা তাঁর বিবৃত মুখ থেকে বায়ুবেগে নির্গত হলাম। বাইরে এসে দেখলাম, সেই পীতবাস দ্যুতিমান বালক বটবৃক্ষের শাখায় বসে আছেন। তিনি সহাস্যে বললেন, মার্কণ্ডেয়, তুমি আমার শরীরে সুখে বাস করেছ তো? আমি নবদৃষ্টি লাভ ক'রে মোহমুক্ত হয়ে তাঁর সুন্দর কোমল আরক্ত চরণদ্বয় মস্তকে ধারণ করলাম। তার পর কৃতাঞ্জলি হয়ে বললাম, দেব, তোমাকে আর তোমার মায়াকে জানতে ইচ্ছা করি। সেই দেব বললেন, পুরাকালে আমি জলের নাম ‘নারা’ দিয়েছিলাম, প্রলয়কালে সেই জলই আমার অয়ন বা আশ্রয় সেজন্য আমি নারায়ণ। আমি তোমার উপর পরিতুষ্ট হয়ে ব্রহ্মার রূপ ধারণ করে অনেক বার তোমাকে বর দিয়েছি। লোকপিতামহ ব্রহ্মা আমার শরীরের অর্ধাংশ। যত কাল তিনি জাগরিত না হন তত কাল আমি শিশুরূপে এইখানে থাকি। প্রলয়ান্তে ব্রহ্মা জাগরিত হ’লে আমি তাঁর সঙ্গে একীভূত হয়ে আকাশ পৃথিবী স্থাবর জঙ্গম প্রভৃতি সৃষ্টি করব। তত কাল তুমি সুখে এখানে বাস কর। এই ব’লে তিনি অন্তর্হিত হলেন।

(১) অনেকে বৎসরের অর্থ করেন দৈব বৎসর, অর্থাৎ মানুষের ৩৬০ বৎসর।
(২) যে কালে যুগলক্ষণ ক্ষীণ হয়।
(৩) যে কালে পরবর্তী যুগের লক্ষণ প্রকাশ পায়।
(৪) অতসী বা তিসির ফুল নীলবর্ণ।
(৫) বিষ্ণুর বক্ষের রোমাবর্ত।

এই ইতিহাস শেষ ক’রে মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে বললেন, মহারাজ, সেই প্রলয়কালে আমি যে পদ্মলোচন আশ্চর্য দেবকে দেখেছিলাম তিনিই তোমার এই আত্মীয় জনার্দন। এ’র পরে আমার স্মৃতি নষ্ট হয় না, আমি দীর্ঘায়ু ইচ্ছামৃত্যু হয়েছি। এই অচিন্ত্যপ্রভাব মহাবাহু কৃষ্ণ যেন ক্রীড়ায় নিরত আছেন। তোমরা এ’র শরণ নাও। মার্কণ্ডেয় এইরূপে বললে পাণ্ডবগণ ও দ্রৌপদী জনার্দন কৃষ্ণকে নমস্কার করলেন।