বনপর্ব: ৪২। অষ্টক, প্রতর্দ্দন, বসুমনা ও শিবি — ইন্দ্রদ্যুম্ন

মার্কণ্ডেয় ক্ষত্রিয়মাহাত্ম্য-বিষয়ক আরও উপাখ্যান বললেন। — বিশ্বামিত্রের পুত্র অষ্টক রাজা অশ্বমেধ যজ্ঞ সমাপ্ত ক'রে তাঁর ভ্রাতা (১) প্রতর্দ্দন, বসুমনা ও শিবির সঙ্গে রথারোহণে যাচ্ছিলেন এমন সময়ে দেবর্ষি নারদের সঙ্গে দেখা হ'ল। অষ্টক অভিবাদন ক'রে নারদকে রথে তুলে নিলেন। যেতে যেতে এক ভ্রাতা নারদকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা চারজনেই স্বর্গে যাব, কিন্তু নরলোকে কে আগে ফিরে আসবেন? নারদ বললেন, অষ্টক। যখন আমি তাঁর গৃহে বাস করছিলাম তখন একদিন তাঁর সঙ্গে রথে যেতে যেতে নানা বর্ণের বহু সহস্র গরু দেখতে পাই। আমি জিজ্ঞাসা করলে অষ্টক বললেন, আমিই এই সব গরু দান করেছি। এই আত্মশ্লাঘার জন্যই অষ্টকের আগে পতন হবে।

(১) বৈপিত্র ভ্রাতা। উদ্যোগপর্ব ১৫-পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।

আর এক ভ্রাতা প্রশ্ন করলেন, অষ্টকের পর কে অবতরণ করবেন? নারদ বললেন, প্রতর্দ্দন। একদিন তাঁর সঙ্গে আমি রথে যাচ্ছিলাম এমন সময়ে এক ব্রাহ্মণ এসে একটি অশ্ব চাইলেন। প্রতর্দ্দন বললেন, আমি ফিরে এসে দেব। ব্রাহ্মণ বললেন, এখনই দিন। প্রতর্দ্দন রথের দক্ষিণ পার্শ্বের একটি অশ্ব খুলে দান করলেন। তার পর আর এক ব্রাহ্মণের প্রার্থনায় তাঁকে বাম পার্শ্বের একটি অশ্ব দিলেন। তার পর আরও দুইজন ব্রাহ্মণের প্রার্থনায় অবশিষ্ট দুই অশ্ব দিয়ে স্বয়ং রথ টানতে টানতে বললেন, এখন আর ব্রাহ্মণদের চাইবার কিছু নেই। প্রতর্দ্দন দান ক'রে অসূয়াগ্রস্ত হয়েছিলেন সেজন্যই তাঁর পতন হবে।

তার পর একজন প্রশ্ন করলেন, দুজনের পর কে স্বর্গচ্যুত হবেন? নারদ বললেন, বসুমনা। একদিন আমি তাঁর গৃহে গিয়ে আশীর্বাদ করি — তোমার পুষ্পক রথ লাভ হউক। বসুমনা পুষ্পক রথ পেলে আমি তার প্রশংসা করলাম। তিনি বললেন, ভগবান, এ রথ আপনারই। তার পর দ্বিতীয়বার আমি তাঁর কাছে গিয়ে রথের প্রশংসা করলাম, তিনি আবার বললেন, রথ আপনারই। আমার রথের প্রয়োজন ছিল, তৃতীয় বার তাঁর কাছে গেলাম কিন্তু রথ না দিয়ে তিনি বললেন, আপনার আশীর্বাদ সত্য হয়েছে। এই কপট বাক্যের জন্যই বসুমনার পতন হবে।

তার পর একজন প্রশ্ন করলেন, বসমনার পর কে অবতরণ করবেন? নারদ বললেন, শিবি স্বর্গে থাকবেন, আমারই পতন হবে। আমি শিবির সমান নই। একদিন এক ব্রাহ্মণ শিবির কাছে এসে বলেছিলেন, আমি অন্নপ্রার্থী, তোমার পুত্র বৃহদগর্ভকে বধ কর, তার মাংস আর অন্ন পাক করে আমার প্রতীক্ষায় থাক। শিবি তাঁর পুত্রের পক্ব মাংস একটি পাত্রে রেখে তা মাথায় নিয়ে ব্রাহ্মণের খোঁজ করতে লাগলেন। একজন তাঁকে বললে, ব্রাহ্মণ ক্রুদ্ধ হয়ে আপনার গৃহ কোষাগার আয়ুধাগার অন্তঃপুর অশ্বশালা হস্তিশালা দগ্ধ করছেন। শিবি অবিকৃতমুখে ব্রাহ্মণের কাছে গিয়ে বললেন, ভগবান, আপনার অন্ন প্রস্তুত হয়েছে, ভোজন করুন। ব্রাহ্মণ বিস্ময়ে অধোমুখ হয়ে রইলেন। শিবি আবার অনুরোধ করলে ব্রাহ্মণ বললেন, তুমিই খাও। শিবি অব্যাকুলচিত্তে ব্রাহ্মণের আজ্ঞা পালন করতে উদ্যত হলেন। ব্রাহ্মণ তখন তাঁর হাত ধরে বললেন, তুমি জিতক্রোধ, ব্রাহ্মণের জন্য তুমি সবই ত্যাগ করতে পার। শিবি দেখলেন, দেবকুমারতুল্য পুণ্যগন্ধান্বিত অলঙ্কারধারী তাঁর পুত্র সম্মুখে রয়েছে। ব্রাহ্মণ অন্তর্হিত হলেন। তিনি স্বয়ং বিধাতা, রাজর্ষি শিবিকে পরীক্ষা করবার জন্য এসেছিলেন। অমাত্যগণ শিবিকে প্রশ্ন করলেন, কোন্ ফল লাভের জন্য আপনি এই কর্ম করলেন? শিবি উত্তর দিলেন, যশোলাভ বা ধনভোগের উদ্দেশ্যে করি নি, সজ্জনের যা প্রশস্ত আচরণ তাই আমি করেছি।

পাণ্ডবগণ মার্কণ্ডেয়কে প্রশ্ন করলেন, আপনার চেয়ে প্রাচীন কেউ আছেন কি? মার্কণ্ডেয় বললেন, পুণ্যক্ষয় হলে রাজর্ষি ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বর্গ থেকে চ্যুত হয়ে আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন, আমাকে চেনেন কি? আমি বললাম, আমি নিজ কার্যে ব্যস্ত থাকি সেজন্য সকলকে মনে রাখতে পারি না। হিমালয়ে প্রাবরকর্ণ নামে এক পেচক বাস করে, সে আমার চেয়ে প্রাচীন, হয়তো আপনাকে চেনে। ইন্দ্রদ্যুম্ন অশ্ব হয়ে আমাকে পেচকের কাছে বহন করে নিয়ে গেলেন। পেচক তাকে বললে, তোমাকে চিনি না; ইন্দ্রদ্যুম্ন সরোবরে নাড়ীজঙ্ঘ নামে এক বক আছে, সে আমার চেয়ে প্রাচীন, তাকে প্রশ্ন কর। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন আমাকে আর পেচককে নাড়ীজঙ্ঘের কাছে নিয়ে গেলেন। সে বললে, আমি এই রাজাকে চিনি না; এই সরোবরে আমার চেয়ে প্রাচীন অকৃপার নামে এক কচ্ছপ আছে, তাকে প্রশ্ন কর। বকের আহ্বানে কচ্ছপ সরোবর থেকে উঠে এল। আমাদের প্রশ্ন শুনে সে মূহুর্তকাল চিন্তা ক’রে অশ্রুপূর্ণনয়নে কম্পিতদেহে কৃতাঞ্জলি হয়ে বললে, একে জানব না কেন? ইনি এখানে সহস্র যজ্ঞ করে যূপকাষ্ঠ প্রোথিত করেছিলেন; ইনি দক্ষিণাস্বরূপ যে সকল ধেনু দান করেছিলেন তাদেরই বিচরণের ফলে এই সরোবর উৎপন্ন হয়েছে।

তখন স্বর্গ থেকে দেবরথ এল এবং ইন্দ্রদ্যুম্ন এই দৈববাণী শুনলেন — তোমার জন্য স্বর্গ প্রস্তুত, তুমি কীর্তিমান, তোমার যোগ্য স্থানে এস। দিবং স্পৃশতি ভূমিঞ্চ শব্দঃ পুণ্যস্য কর্মণঃ। যাবৎ স শব্দো ভবতি তাবৎ পুরুষ উচ্যতে॥ অকীৰ্তিঃ কীৰ্ততে লোকে যস্য ভূতস্য কস্যচিৎ। স পতত্যধমালোঁকান্ যাবচ্ছব্দঃ প্রকীৰ্ততে॥ — পুণ্যকর্মের শব্দ (প্রশংসাবাদ) স্বর্গ ও পৃথিবী স্পর্শ করে; যত কাল সেই শব্দ থাকে তত কালই লোকে পুরুষরূপে গণ্য হয় (১)। যত কাল কোনও লোকের অকীৰ্তি প্রচারিত হয় তত কাল সে নরকে পতিত থাকে।

(১) এই শ্লোক ৫৭-পরিচ্ছেদেও আছে।

তার পর ইন্দ্রদ্যুম্ন (২) আমাদের সকলকে নিজ নিজ স্থানে রেখে দেবরথে স্বর্গে প্রস্থান করলেন।

(২) ইনিই পুরীধামের জগন্নাথ-বিগ্রহের প্রতিষ্ঠাতা এই খ্যাতি আছে।